Latest News

পরিবারতন্ত্র নয়, বাবা, ছেলে ও মেয়ের কাজই বিচার্য বেহালার তিন ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের কাছে

দ্য ওয়াল ব্যুরো : ‘পাশের ওয়ার্ডে বাবার কাজ দেখেই ছেলেকে ভোট দিয়েছি, আর বাবার মতই কাজ করছে’, মহাবীরতলার (Mahabirtala) দোকানে বসে বলছিলেন সৌরভ গুপ্তা। বাবা, ভাইয়ের পাশের ওয়ার্ডেরই দায়িত্বে আছেন মেয়ে। ‘দিদিকে নিয়ে কী বলব! ১৫ বছর এলাকার মানুষের পাশে আছেন, কাজ করেছেন।’ বললেন স্থানীয় গৃহবধূ পূর্ণিমা দাস।

কথা হচ্ছে ১১৬, ১১৭ ও ১১৮ নম্বর ওয়ার্ডের। তিন ওয়ার্ডের দায়িত্বেই সিং পরিবার। কৃষ্ণা সিং, অমিত সিং ও তারক সিং। দাপুটে নেতা তারক সিংয়ের প্রভাব যে কাজে, সেকথাই শোনা যায় ওয়ার্ডের আনাচেকানাচে।

একই পরিবারেরই তিনজন কাউন্সিলর কেন? অন্য কাউকে প্রার্থী করা যেত না? বেশিরভাগ জবাবেই উঠে এল এমন ভাবনা, এই নিয়ে মাথা ঘামাতে চান না এলাকাবাসী। কাজের নিরিখেই ভোট দিয়েছেন এবং দেবেন। পরিবার, পরিবারতন্ত্র নিয়ে যায় আসে না তাদের।

মহাবীরতলা থেকে বেহালার সিরিটি, বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে চোখে ভাসে উন্নয়ের ভিন্ন ছবি। এলাকাবাসীর কথায়, কাজ হয়েছে, ভোট দেব। দলের আগেও এই তিন ওয়ার্ডের তৃণমূলের প্রার্থীকেই পছন্দের তালিকার ওপরে রাখছেন এলাকার মানুষ।

সৌন্দর্যায়ন থেকে এলাকার খুঁটিনাটি কাজের দিকে সজাগ নজর সিং পরিবারের। কাজ দিয়েই মানুষের কাছে ভোট চাইতে চান তারক-কৃষ্ণা-অমিত। তিন ওয়ার্ডের ত্রয়ীর ওপর অগাধ বিশ্বাস বাসিন্দাদের।

১১৬ নম্বর ওয়ার্ডে ২০০৫ সাল থেকে কাউন্সিলরের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন কৃষ্ণা সিং। ধীরে ধীরে এলাকাবাসীর অভাব অভিযোগ মিটিয়ে চলেছেন তিনি। রাস্তা থেকে জল, আলো থেকে পার্ক, জঞ্জাল সাফাই থেকে রাস্তা পরিস্কার, সুবিধা অসুবিধা সবেতেই পাশে থেকেছেন। তাই ভোট বাক্সে উন্নয়নের বোতাম টিপে আবার কৃষ্ণাদেবীকেই ফিরিয়ে আনতে চান এলাকাবাসী।
তাঁদের কথায়, বিপদে আপদে যাঁকে পাশে পাই, তাঁর পাশেই তো দাঁড়াব। বাড়ি বাড়ি এসে গেছে জল, রাস্তাঘাটের চেহারা পাল্টেছে। হয়েছে চওড়া রাস্তা, অন্ধকার গলিতে বসেছে আলোক স্তম্ভ, এলাকায় তৈরি হয়েছে একাধিক স্কুল, পার্ক, বাচ্চাদের খেলার জন্য মাঠ। বহু ভাঙা বাড়ির মেরামতির কাজ হয়েছে তাঁর আমলে।

পাশের ওয়ার্ড ১১৭ নম্বরের চিত্রটাও একই রকম। প্রায় দু’বছর অভিভাবকহীন এই ওয়ার্ডের উন্নতিতে খামতি রাখেননি অমিত সিং। স্বাস্থ্যসাথী থেকে স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড, ভ্যাকসিন থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধ সব সুবিধাই এলাকাবাসীর কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন তিনি। পেরেছেন কি? এলাকাবাসীর কথায়, উন্নয়ন কথায় নয়, কাজে করে দেখিয়েছেন অমিতবাবু। দল নির্বিশেষে সবার পাশেই আছেন। তাই তাঁর বিকল্প ভাবতে নারাজ। বিরোধীদের ‘পরিবার’ তত্ত্ব নিয়ে এলাকাবাসীর বক্তব্য, কাজের নিরিখেই ভোট দেব, কে কোন পরিবারের সেই নিয়ে ভেবে কী লাভ আমাদের।

১১৬ ও ১১৭ এর মতোই ঝাঁ চকচকে ওয়ার্ড ১১৮। ২০১০ সাল থেকে এই ওয়ার্ডের পৌরপিতা তারক সিং। বিভেদ নয়, সবাই সমান এই নীতিতেই কাজের গতি বাড়ানো তারক সিংয়ের পক্ষে সওয়াল করছেন এলাকাবাসী। তাই এলাকায় কী কাজ হয়েছে প্রশ্ন করলে হাসিমুখে তারক সিংয়ের জবাব, ‘আমি কী বলব, এলাকার মানুষ বলবে আমি কী কাজ করেছি।’

আর এলাকার মানুষের কথায় ‘ফুল মার্কস’-এ পাশ করছেন তারকবাবু। এলাকার বাজার এসেছে এক ছাদের নিচে, জল নিকাশি ব্যবস্থা নিয়ে দ্বিমত নেই এলাকাবাসীর। ‘বৃষ্টি হলে জল জমবে, কিন্তু তারপরেও কত তাড়াতাড়ি জল নেমে যায় সেটাই দেখার, সেই দুর্ভোগ পোয়াতে হয় না আমাদের’, মত স্থানীয়দের।

তিন ওয়ার্ডের মানুষ যেমন পরিবারতন্ত্র নিয়ে মাথা ঘামাতে নারাজ, তেমনই এই তত্ত্বে আমল দিতে চান না তারক-কৃষ্ণা-অমিতরাও। প্ৰশ্ন শুনে ঠোঁটের ফাঁকে হাল্কা হাসির রেখা খেলে যায় তারকের। সেই রেশ টেনেই বলেন, ‘আমি এই ব্যাপারে গুরুত্ব দিই না। আমার দল আমাকে প্রার্থী করেছে। বিরোধীরা আগেও এই প্রসঙ্গ টেনেছিল, তারপরেও অমিত ওই ওয়ার্ড থেকে বিপুল ভোটে জিতে কাউন্সিলর হয়। দিলীপ ঘোষ থেকে সিপিএম সকলেই বলেছিল পরিবারতন্ত্র উৎখাত করব, কিন্তু তারপরও মানুষ ভোট দিয়েছে। বেসিক্যালি বাংলার মানুষ এইসব ব্যাপারে গুরুত্ব দেন না।’

বাবার কথায় সুর মিলিয়ে অমিতবাবু বলেন, ‘দল যাঁকে যোগ্য মনে করেছে তাঁকেই প্রার্থী করেছে। আমাদের পরিবার সবসময় মানুষের পাশে থাকে। আর ভোট হয় কাজের নিরিখে। মানুষ যদি মনে করেন আমরা কাজ করিনি তাহলে মানুষই তার জবাব দেবেন।’

কৃষ্ণাদেবী জানান, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কাজ দেখে প্রার্থী করেন। মনে করেছেন আমি যোগ্য। তাই আবার প্রার্থী করেছেন। তাঁর কথায়, বাবাকে দেখে রাজনীতিতে এসেছি। ১১৬ নম্বর যখন মহিলা সংরক্ষিত হল তখন দিদি সুযোগ দিলেন। এতদিন সেই সুযোগেই কাজ করছি, আগামীতে মানুষ যদি আবার সুযোগ দেন তাহলে একইভাবে কাজ করব।’

বিরোধীদের অভিযোগ পুরসভায় ভোট লুঠ হতে পারে। কিন্তু সেই অভিযোগেও আমল দিতে চায় না সিং পরিবার। তারকবাবু বলেন, ‘পঞ্চায়েত ভোটে যে ঘটনা ঘটেছে সেজন্য আমরা মানুষের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। অতীতের ভুল থেকেই শিক্ষা নিয়েছি। অমন ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না হয় সেটাই দেখার।’

বিরোধীদের এই অভিযোগ নিয়েও মাথা ঘামাতে চান না এলাকাবাসী। তাদের মুখে একই কথার পুনরাবৃত্তি, ‘কাজ দেখেই ভোট দেব, নিজের ভোট নিজে দেব’।

You might also like