Latest News

কত দূর এগলো দেশ, মানুষ, সমাজ? ৫০ বছরে বাংলাদেশের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি

বিনায়ক সেন

‘কতদূর এগোলো মানুষ’– এই পঙ্ক্তিটি লিখেছিলেন কবি আল মাহমুদ। আজ পঞ্চাশ বছর পরে আমরা এই প্রশ্ন করতে পারি যে, কতদূর এগলো দেশ, মানুষ, সমাজ?

সেটা বুঝতে গেলে নানা পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। আমরা পরিসংখ্যান বা সূচক দিয়ে সেই পথপরিক্রমার গল্পগাথা রচনা করতে পারি। আমরা ইচ্ছে করলে গাণিতিক মডেল দিয়ে সেই পথপরিক্রমার ন্যারেটিভ তৈরি করতে পারি। ইচ্ছে করলে অতিব্যক্তিক পর্যায়ে অতিতুচ্ছ মানুষের জীবনের পথপরিক্রমা দিয়েও রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক জীবনের পথপরিক্রমাকে বোঝার চেষ্টা করতে পারি। যেমন আমার মতো তুচ্ছাতিতুচ্ছ মানুষেরও জীবনের কিছু অভিজ্ঞতা আছে। সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক জীবনের পথপরিক্রমার বিভিন্ন পর্যায়কে মেলানো সম্ভব।

আমার জন্ম ১৯৫৮ সালে- যে বছর আইয়ুব খান ক্ষমতায় এলেন। ১৯৬৪ সালে যখন আমার ৬ বছর বয়স- আওয়ামী লীগ নতুন করে পুনরুজ্জীবিত হল এবং তার সাধারণ সম্পাদক হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জাতীয় জীবনের এই ইতিবাচক রাজনৈতিক ঘটনার পাশাপাশি দুটো নেতিবাচক ঘটনাও সে বছর ঘটেছিল। ১৯৬৪ সালেই ঘটে যায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। ‘বাংলাদেশ রুখিয়া দাঁড়াও’ শিরোনামে বঙ্গবন্ধু এবং আরও অনেক প্রগতিশীল রাজনৈতিক মানুষই তখন রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। এক অর্থে সেটিই ছিল ষাটের দশকে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলনের শুরুর পর্যায়।

সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ শব্দটি কে কখন প্রথম উচ্চারণ করেছিলেন জানা নেই, কিন্তু অসাম্প্রদায়িকতা বোধের আন্দোলন গভীরতর বিকাশ পায় ষাটের দশকের মধ্যভাগে। এই সময়েই আধুনিক বাংলা কবিতারও বিপুল প্রসার ঘটে। আমাদের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবন অনেক বেশি সেক্যুলার চেতনায় ঋদ্ধ হতে থাকে। ফলে ১৯৭০ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে যখন বঙ্গবন্ধু সরাসরিভাবে অসাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুর অধিকার রক্ষার পক্ষে উচ্চারণ করেন, তখন তা একেবারেই রাজনৈতিক অ্যাডভেঞ্চার মনে হয়নি। বরং মনে হয়েছে একটি ক্রমান্বয়ে পরিণতিপ্রাপ্ত অনুভূতির যৌক্তিক প্রতিষ্ঠা। এভাবেই আমাদের দেশের অসাম্প্রদায়িকতাবোধ এবং সেক্যুলার রাজনীতির প্রাথমিক ভিত্তিভূমি প্রতিষ্ঠা পায়। সত্তর সালের নির্বাচনী ইশতেহারে তার স্বাক্ষর আমরা পাই। সত্তরের নির্বাচনী ইশতেহারে এবং তারও আগের পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগের ইশতেহারে বঙ্গবন্ধু সমতাবাদী সমাজের আকাঙ্ক্ষা তথা সমাজতন্ত্রের কথাটা জোরের সঙ্গে, স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেন। আর গণতেন্ত্রের কথাতো পূর্বাপর দাবি হিসেবে ছিলই।

১৯৫৪ সালের যে নির্বাচন হয়েছিল, সেটি হয়েছিল ধর্মভিত্তিক পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থার ভিত্তিতে। কিন্তু ধর্ম নির্বিশেষে যে নির্বাচন প্রথা, সত্তরের নির্বাচনেই সেটি প্রথম বাস্তবায়িত হয়। সুতরাং, ধর্মনিরপেক্ষতার উদ্বোধন কিন্তু প্রথম ঘটে সত্তর সালের নির্বাচনী ইশতেহারে এবং সেই নির্বাচনের বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সেটি পরোক্ষ স্বীকৃতি লাভ করে।

মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন আমার বয়স তেরো। এই তেরো বছর বয়সে চিত্রপরিচালক তারকোভস্কির ‘ইভানভের শৈশবকালের’ মতন চোখ দিয়ে আমি দেখেছিলাম যুদ্ধের সন্ত্রাস, বিদ্রোহ, গ্লানি ও ভয়। এই সমস্ত অনুভূতি তখন আমাকে তাড়া করে ফিরেছিল। এরই মধ্যে আমার বড় ভাই যুদ্ধে গেলেন। আমার বাবা মুজিবনগর সরকারে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে উত্তর-পূর্ব সেক্টরের বিভিন্ন ক্যাম্পের দেখাশোনার কাজ করছেন। যুদ্ধের ভেতরে নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হতো ‘মুক্তিযুদ্ধ’, ‘জয়বাংলা’ ইত্যাদি পত্রিকা- যেখানে রণাঙ্গনের খবরাখবর থাকত। আমি সেগুলো নিয়মিত পাঠ করতাম। সেই সঙ্গে স্বাধীন বাংলা বেতারের কথা তো থাকতই।

আমার এবং আমার মতো অনেক মানুষের মনেই তখন একটা স্বাধীন উদারনৈতিক বাংলাদেশের রূপকল্প মনের মধ্যে জেগে ওঠে। ১৯৭২ সালে আমরা যে বাংলাদেশ পাই, তার প্রথম একটা মৌলিক উপাদান ছিল এই স্বাধীনতা এবং উদার নৈতিকতাসমৃদ্ধ বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা। দ্বিতীয় যে মৌলিক উপাদান আমরা দেখতে পাই তা হল, রাতারাতি যেন বদলে গিয়েছিল জনচৈতন্যের চেহারা। সেদিনের জনআকাঙ্ক্ষার কথাটি হয়তো আজকে গালভারী কথার মতো শোনায়।

কিন্তু জনআকাঙ্ক্ষার সত্যি সত্যি তখন একটা শিখরে পৌঁছে গিয়েছিল। সকল মানুষের চোখেই ১৯৭২ সালের সেই সময়ে দ্রুত বড় হয়ে ওঠার একটা আকাঙ্ক্ষা বা এক জীবনে এই অর্জনগুলো সম্ভব- সেই প্রত্যাশা ও প্রতিশ্রুতি যেন ঝিলিক দিয়ে উঠছিল। কিন্তু এই শুভবোধের পাশাপাশি উন্নয়নের জন্য যে জনআকাঙ্ক্ষার বিস্ফোরণের প্রয়োজন, তার পাশাপাশি তখন আমরা প্রাথমিক নৈরাজ্যেরও বিস্তার ঘটতে দেখি।

১৯৭৪ সালে আমি ঢাকা কলেজের ছাত্র। একদল ছাত্রের ধর্মঘটের কারণে সেই সময় অধিকাংশ দিনই কোনও ক্লাস হচ্ছে না। এমনকী প্রথম বর্ষ থেকে দ্বিতীয় বর্ষে ওঠার যে ক্লাস টেস্ট, সেটিও অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। তখনই আমরা জাসদ এবং এ জাতীয় সংগঠনের অভ্যুদয় দেখি এবং তাদের রাজনীতির প্রভাব সামগ্রিকভাবে আমাদের শিক্ষার্থীদের জীবনের ওপর একটা ঘোরতর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে বৈকি। তার মধ্যে হঠাৎ বিত্তের ঝলকানি, ব্রিফকেস ব্যবসায়ীর হঠাৎ বড়লোক হয়ে ওঠা বা অবাঙালি মালিকানাধীন পরিত্যক্ত সম্পত্তি দখল করে বসা ইত্যাদিও রয়েছে। একই সঙ্গে আমরা দেখতে পাই চরমপন্থী বিভিন্ন রাজনীতির বিকাশ, যার ফলে অনেক রকমের গুপ্ত হত্যার শিকার হচ্ছিল সাধারণ মানুষসহ অনেক রাজনীতিবিদ। একটা হিসাবে দেখা যায় যে ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার হাজার রাজনৈতিক ব্যক্তি বিশেষ করে আওয়ামী লীগের কর্মী গুপ্ত হত্যায় নিহত হয়েছিলেন।

চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ আমাদের আরেকটা দিক থেকে বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছিল। আমরা এর আগে কখনও চোখের সামনে দুর্ভিক্ষের মৃত্যু দেখতে পাইনি। গল্প-উপন্যাসে পড়েছি। ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’র জয়গুনের চরিত্রের মাধ্যমে আমরা জেনেছি, বা তারও আগে ‘অশনিসংকেত’ বা তারাশঙ্করের ‘মন্বন্তর’ উপন্যাসের মাধ্যমে। কিন্তু প্রত্যক্ষভাবে ঢাকার মত শহরে ঢাকা কলেজের সামনে সমগ্র জনকোলাহলের মধ্যে মানুষ মারা যাচ্ছে বা বস্ত্রহীন মানুষ হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে—এই দৃশ্য দেখা আমার সেবারই প্রথম। এখন বুঝতে পারি খাদ্য সাহায্যের ওপরে নির্ভরতা কী ভয়ানকভাবে একটি রাষ্ট্র বা জাতিকে পঙ্গু করে দেয়।

সেই সব দিনে আমেরিকা ও তাদের সহযোগী দেশের অসহযোগিতা পরিস্থিতিকে আরও মর্মান্তিক করে তোলে। তখন একাধিক বক্তৃতা, আলোচনা, সাক্ষাৎকারে এ নিয়ে বঙ্গবন্ধু তার অসহায়তার কথা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ভিক্ষুক জাতির কোনও মান-ইজ্জত থাকে না। আমি জায়গায় জায়গায় গিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করতে পারব না।

এইরকম একটি পরিস্থিতিতে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু সাময়িককালের জন্য মতান্তরে ৩ থেকে ৫ বছরের জন্য-বাকশাল ব্যবস্থার প্রবর্তন করলেন। এর প্রধান কারণ ছিল- অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক নয়। এ নিয়েও একটি ভ্রান্ত প্রচারণা দেশে চালু আছে। কেননা তখন ১৯৭৩ সালের নির্বাচন অনুযায়ী পার্লামেন্টে আওয়ামী লীগের ছিল দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। কোনো রাজনৈতিক প্রস্তাব বা আইন পাস করার জন্য তার জরুরি অবস্থা বা বাকশাল জাতীয় ব্যবস্থা বা অন্য কোনো অথরিটিরিয়ান ব্যবস্থার প্রবর্তন করার প্রয়োজনীয়তা ছিল না। কারণ, সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমেই তা অর্জন করা সম্ভব ছিল। সুতরাং এর তাগিদটা রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার কারণে উদ্ভূত হয়নি। মূলত উদ্ভূত হয়েছে অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে দেশকে সাময়িক সময়ের জন্য কড়া শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে মাটি থেকে তুলে দাঁড় করানোর জন্য; কক্ষচ্যুত রেলগাড়িকে রেললাইনের ওপরে তোলার জন্য।

আমাদের সংবিধানে যে চার মূলনীতি গৃহীত হয়েছে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা, তার বিশদ মূল্যায়ন করার চেষ্টা বাকশালের কর্মসূচিতে ছিল। ১৯৭৩ সালের শেষের দিকে ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এসে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, পোল্যান্ডসহ বহু দেশের অর্থনীতিবিদেরা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যান। প্রতিনিধি দলের নেতা অষ্টিন রবিনসনকে প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমাদের সমাজতন্ত্র হল বাংলাদেশ সমাজতন্ত্র, বাংলাদেশের মতো করে সমাজতন্ত্র। এর বেশি অতিরিক্ত কোনো সংজ্ঞার দরকার নেই।’

সব সময় আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে, আমরা কোনও উন্নত আধুনিক পুঁজিবাদী দেশের বা কোনও সমাজতান্ত্রিক দেশের বা কোনও দেশেরই মডেল অনুকরণ করে বড় হতে পারব না। তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে কিছু না কিছু শেখার আছে। সেদিক থেকে আমি মনে করি বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ অনেকটা দেং শিয়াও পিং-এর বাংলাদেশ। সেখানে মূল জোরটা দেওয়া হবে কাজটা সফল হলো কিনা তার ওপরে। বেড়াল সাদা না কালো সেই আলোচনাটা অত গুরুত্বপূর্ণ নয়, তার চাইতে বড় গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বেড়ালটি ইঁদুর মারতে পারে কিনা।

বাংলাদেশ যে আজকে এত দূর এগিয়েছে তার একটা বড় কারণ হল—বাংলাদেশের যারা রাজনৈতিক নেতৃত্ব, তারা কাণ্ডজ্ঞানের পরিচয় দিয়েছিলেন। তারা একপেশে, শুধু বাজারমুখী অর্থনীতি বা শুধু রাষ্ট্রনির্ভর অর্থনীতির পেছনে ছোটেননি। এটা বিশেষভাবে নব্বইয়ের দশক থেকে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে দেখা যাচ্ছে।

একাত্তরে স্বাধীনতা যদি বাংলাদেশের প্রথম মৌলিক অর্জন হয়, বাঙালি জাতির পক্ষে দ্বিতীয় মৌলিক অর্জন হচ্ছে ১৯৯০ সালের অভ্যুত্থান, যার মাধ্যমে মিলিটারি স্বৈরতন্ত্রের পতন ঘটে। নব্বই সালে আমার বয়স ৩২ বছর। তখন এই বয়সের আশপাশে যাদের বয়স তারা প্রায় সকলেই সেদিন ঢাকার রাস্তায় ছিলেন। এবং তারা সকলেই সেদিন দ্বিতীয়বারের স্বাধীনতা অর্জনকে উপলব্ধি করেছিলেন। আমাদের আজকের যে অর্থনৈতিক অর্জন তার সূচনাটা হয় মূলত নব্বই দশক থেকেই।

এখন পরিসংখ্যানের প্রশ্নে আসি। আমরা যদি নব্বই সাল থেকে আন্তদেশ শুমারির একটা বিচার-বিশ্লেষণ করি, তাহলে আমরা দেখতে পাব, যে সমস্ত খাতে অর্থনৈতিক সামাজিক সাফল্য আমাদের এসেছে- তার সূচনা নব্বই দশক থেকে হাঁটিহাঁটি করে শুরু হলেও মূলত এই সাফল্যের মূল অভিঘাত এসে পড়েছে দু’হাজার দশের দশকে। সেটা আমরা শিশুমৃত্যুর ক্ষেত্রে বলি, গড় আয়ুষ্কালের ক্ষেত্রে বলি, মাতৃস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বলি, নারী শ্রমের অংশগ্রহণ হারের ক্ষেত্রে বলি, জিডিপি গ্রোথের উল্লম্ফনের ক্ষেত্রে বলি, দারিদ্র্য নিরসনের ক্ষেত্রে বলি, জিডিপিতে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের বিস্তারের ক্ষেত্রে বলি এই সমস্ত ক্ষেত্রেই আমরা এক সময় যে দেশের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম সেই পাকিস্তানের থেকে এগিয়ে আছি। এমনকি পাশের বৃহৎ দেশ ভারত তার তুলনায় আমরা অনেক সামাজিক সূচকে এগিয়ে আছি, যার সঙ্গে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রশ্নটি জড়িত। এমনকি অর্থনৈতিক সূচকেও ভারতের সঙ্গে যে ব্যবধান আমাদের ছিল, ধরা যাক মাথাপিছু জিডিপির ক্ষেত্রে ব্যবধান- সেটিও আমরা লক্ষণীয় মাত্রায় কমিয়ে আনতে পেরেছি।

আমি বাহাত্তর সালের কথা বলে শুরু করেছিলাম। জনগণের আকাঙ্ক্ষার এই ফ্যাক্টর আর সমস্ত ক্ষেত্রকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। দ্বিতীয় ফ্যাক্টর কৃষিক্ষেত্রে অগ্রগতি। উচ্চ আকাঙ্ক্ষার কারণে জনগণ আর নিজেকে প্রথাগত পেশায় আবদ্ধ রাখতে চাইছে না। সে আর মান্ধাতা আমলের কৃষিতে বিশ্বাসী নয়। সে চাইছে নতুন প্রযুক্তিকে গ্রহণ করতে এবং এরই ফলে আমরা দেখতে পাই যে, কৃষিখাতে একটা বিরাট প্রযুক্তিগত বিকাশ ঘটে গেছে। যে কৃষিক্ষেত্রে আগে লাঙল ছাড়া চাষ করা যেত না, সেখানে প্রায় সর্বত্রই এখন পাওয়ার টিলারের ব্যবহার। যেখানে আমরা গবাদি পশুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিলাম না, সেখানে এখন আমরা পোলট্রি, লাইস্টক এমনকি গো-পালন সেক্টরেও অভাবিত উন্নতি করেছি গত পাঁচ-সাত বছরে। মৎস্য উৎপাদন এবং মাথাপিছু মাছের ভোগের পরিমাণেও আমরা এগিয়ে আছি। এই সবটাই ঘটেছে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের নীরব বিপ্লবের মাধ্যমে। মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা না থাকলে, তার বদ্ধ অবস্থা থেকে বেরিয়ে যাবার আকাঙ্ক্ষা না থাকলে এত দ্রুত এটা সম্ভব হতো না।

আরও যে বিষয়টি এই পরিবর্তনের পেছনে কাজ করেছে, সেটি আমাদের নারী শ্রমশক্তির বিকাশ। আমাদের শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণের হার সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ৩৬ শতাংশ। সেটি ভারতের ৩০ শতাংশের চেয়ে অনেক বেশি। এবং পাকিস্তানের চাইতে তো অনেক বেশিই। এটি এমনকী সাম্প্রতিককালে শ্রীলঙ্কাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

একজন সমাজবিজ্ঞানী সম্প্রতি বলেছেন যে, বাংলাদেশের উন্নয়ন কি মূলত নারীনির্ভর উন্নয়ন? এই কথাটির মধ্যে অতিশয়োক্তি থাকতে পারে। কিন্তু এর মধ্যে সত্যতা অনেকখানি। একে আরও সবল এবং সফল করতে হবে এবং এটা হতে পেরেছে দুই-তিনটা পাশ্ব ফ্যাক্টরের কারণে। তার মধ্যে একটা অবশ্যই রপ্তানিমুখীন শিল্পের বিকাশ- যেটিকে আমরা গার্মেন্ট শিল্প হিসেবে দেখি। যদিও এখন অন্যান্য শিল্পের ক্ষেত্রেও এটি ঘটছে। এর পেছনে কিছুটা গ্রামপর্যায়ে ঋণের সরবরাহ বৃদ্ধিও অবদান রেখেছে। অনেক ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা নারীর ক্ষেত্রে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সরবরাহ বেড়েছে এবং তারা নানা ধরনের উদ্যোক্তা হিসেবে কাজে নিয়োজিত হতে পেরেছেন।

গত পঞ্চাশ বছরে অনেক বঞ্চনা নিরাশার মধ্য দিয়ে আমাদের পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। আমাদের কৃষি নিয়ে নৈরাশ্য ছিল; কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি করা যাচ্ছে না, কারণ কৃষির উৎপাদন সম্পর্ক হচ্ছে আধা সামন্ততান্ত্রিক। শিল্প খাত নিয়ে নৈরাশ্য ছিল যে, বলা হত, বাঙালিরা প্রথম প্রজেক্টের শিল্পোদ্যোক্তা। তারা আধুনিক শিল্প-কলকারখানা চালাতে জানে না। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নিয়েও নৈরাশ্য ছিল। কেননা আমাদের দেশ এমনিতেই সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। এখানে রক্ষণশীল মনোভাবের কারণে নারীরা জন্ম নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে আসতে পারবে না। আমাদের নৈরাশ্য ছিল প্রবৃদ্ধি নিয়ে, কেননা এখানে প্রায় প্রতি বছরই কোনও না কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়ে থাকে। এর ফলে শুধু যে ফসলহানি হয় তাই নয়, কোনও আধুনিক শিল্পোদ্যোক্তাও এখানে বিনিয়োগ করতে চাইবেন না। বন্যায় তার ব্যবসা ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

এমন অনেক নৈরাশ্যকে আমাদের দেখতে হয়েছে আমাদেরই জীবদ্দশায় গত পঞ্চাশ বছরে। এবং সত্তর-আশি-নব্বই দশকে এই নৈরাশ্যবাদগুলো ছিল খুবই প্রবল, যার চিত্র আমরা খুঁজে পাই তৎকালীন সমসাময়িক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সাহিত্যে। এখন অবশ্য একটা উল্টো সুর বইছে। এখন আমরা সর্বত্র আশাবাদের কথা শুনছি। ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা শুনছি। এখন অনেকেই আছেন যারা ইতিবাচকতার কথা শুনে হতাশ হয়ে পড়েন। তারা বলতে চান যে, সব পরিবর্তনতো ইতিবাচক হয়নি। এখনও তো অনেক পরিবর্তন বাকি এবং সেটা হওয়া সম্ভব নয়, কেননা বিভিন্ন সমস্যা আমাদের জর্জরিত করছে। এর মধ্যে সমস্যা রয়েছে সুশাসন নিয়ে, গণতন্ত্র নিয়ে, উন্নত মানের শিক্ষা নিয়ে, স্বাস্থ্যসেবার পরিধি নিয়ে, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ নিয়ে আছে এক ধরনের ব্যর্থতাবোধ।

আমার কথা হচ্ছে- এই ধরনের আশা এবং নিরাশার মধ্য দিয়েই আমাদের আগামী ২০ বছর চলতে হবে। আশার দিকটিকেও আমাদের সংহত করতে হবে, নিরাশার দিকটিকেও আমাদের যথাসম্ভব উপায়ে মোকাবিলা করতে হবে। কোনো জাতির বিকাশ সহসা এবং অতিদ্রুত করা যায় না। দক্ষিণ কোরিয়া বা সিঙ্গাপুরের অধিবাসীদের যখন এই প্রশ্ন করা হয় যে, তারা কীভাবে উন্নয়ন করল- তখন তারা বলে, ‘আমাদের এই যে উন্নয়ন আপনারা দেখছেন, সেটা করতে গিয়ে আমাদের বাবা-মা, পিতামহ-পিতামহীদের পিঠ ভেঙে গেছে। তারা উদয়াস্ত পরিশ্রম করে গেছেন। এবং এই অমানুষিক খাটুনিতে তারা জীবনে আর কোনো কিছু পাননি। স্বপ্ন দেখেছেন, কষ্ট করেছেন কিন্তু বাস্তব জীবনে নিজেরা আর কোনো কিছু ভোগ করে যেতে পারেননি। তারা সব কিছু করেছেন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য।’ অর্থাৎ সেখানে একটা-দুইটা প্রজন্ম এমন অমানুষিক পরিশ্রম করেছে। যখন আমরা অতিদ্রুত কোনো কিছু অর্জন করতে চাই বা পারি না বলে হতাশা বোধ করি- তখন আমাদেরও মনে রাখতে হবে যে, আমাদের উন্নতির একমাত্র চাবিকাঠি হচ্ছে পরিশ্রম, পরিশ্রম এবং পরিশ্রম। আমি মনে করি যে, একটা জাতির মধ্যে সেই ধৈর্য ও স্থৈর্য থাকা প্রয়োজন।

আমি আমার জীবদ্দশায় অনেক সফলতা দেখতে চেয়েছিলাম- যার কিছু কিছু দেখতে পেয়েছি। কখনও ভাবিনি নেলসন ম্যান্ডেলা কারাগার থেকে মুক্তি পাবেন এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্য শাসনের অবসান হবে। আমি ভেবেছিলাম হয়তো সারাজীবন ধরেই দেখব দক্ষিণ আফ্রিকায় সাদা এবং কালোদের এই বিভাজন চলছে। কিন্তু সেই বিভাজন টেকেনি। আমি আমার জীবদ্দশায় কখনও ভাবিনি যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং প্রথাগত সমাজতন্ত্রের দেশগুলো এক-দুই বছরের মধ্যেই অভ্যন্তরীণ বিপর্যয়ে বিলীন হয়ে যাবে। সেটাও দেখেছি। সুতরাং কিছু কিছু ভালো যা আমরা ভাবিনি কিন্তু ঘটেছে, কিছু কিছু অভাবনীয় ঘটনা যা ভাবিনি সেগুলোও ঘটেছে। আমাদের কিছু পাওয়া এবং কিছু না পাওয়াটাকে মেনে নিতে হবে। এবং অপেক্ষা করতে হবে আরও ভালো দিনের জন্য; আর তার জন্য পরিশ্রম করে যেতে হবে। সেটা আমার জীবদ্দশায় হোক বা না হোক।

লেখকঃ অর্থনৈতিক চিন্তক, ঢাকার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ  ডেভলপমেন্ট স্টাডিজের ডিরেক্টর জেনারেল এবং দারিদ্র দূরীকরণ, মানবোন্নয়ন ও জন প্রশাসন বিশেষজ্ঞ।

You might also like