Latest News

‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ মন্ত্রে দুর্গোৎসবে বাংলাদেশ, এবছর পুজো বেড়েছে দু’হাজার

বিপ্লব কুমার পাল

বাংলার নানা মহল্লায় এখন নাড়ুর গন্ধ। বাড়িতে বাড়িতে গুড়ে খই ফেলে পাক দিচ্ছেন মায়েরা। সাধ্যমতো ছোট ছেলে মেয়েরা পরেছে নতুন জামা। এ এক দারুণ অনুভূতি। কারণ ঘরে যে উমা এসেছেন। বাংলাদেশে (Bangladesh) তাই উৎসবের আমেজ। বাঙালি হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপুজো (Durga Puja) আড়ম্বর উৎসবের সূচনা হয়েছিল বাংলা থেকেই। তাই তো দেশ ভাগ হলেও দুই বাংলা শরতের এই লগ্নে দেবী দুর্গার আরাধানা চলে পাঁচদিন ধরে।

ষোড়শ শতাব্দীর শেষ ভাগে রাজা কংস নারায়ণ সাড়ে আট লাখ টাকা ব্যয়ে আধুনিক শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রবর্তন করলেন। উৎসবটি হয়েছিল বারনই নদের পূর্ব তীরে রামরামা গ্রামের দুর্গামন্দিরে। আজও বাঙালির সর্বজনীন দুর্গোৎসবে সেই পদ্ধতিই অনুসরণ করা হচ্ছে। তবে কংস নারায়ণের পরবর্তী চতুর্থ পুরুষ লক্ষ্মী নারায়ণের সময় সম্রাট ঔরঙ্গজেবের ছোট ভাই বাংলার সুবেদার শাহ সুজা বারনই নদের পূর্ব তীরে অবস্থিত রাজা কংসের প্রাসাদ ধ্বংস করে দিয়ে যান। পরে অবশ্য লক্ষ্মী নারায়ণ ঔরঙ্গজেবের অনুকম্পায় নদীর পশ্চিম তীরে একটি পরগনা লাভ করেন। সেখানেই রাজবাড়ি নির্মাণ করে রাজত্ব করেন। ১৮৬২ সালে রাজা বীরেশ্বর রায়ের স্ত্রী রানী জয় সুন্দরী রাজবাড়ির সঙ্গে একটি দুর্গামন্দির নির্মাণ করেন। রাজবংশের শেষ রাজা ছিলেন শিবশেখরেশ্বর। তাঁর বাবা শশী শেখরেশ্বরের সময় থেকে রাজারা কলকাতায় গিয়ে থাকতেন। শুধু পুজোর সময় আসতেন। ১৯২৭ সালে শেষবারের মতো তিনি তাহেরপুরে এসেছিলেন।

তাহেরপুর রাজশাহীর পুজো

একপর্যায়ে রাজবাড়ির এই মন্দিরটি প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে যায়। ১৯৬৭ সালে রাজবাড়িতে কলেজ করা হয়। রাজবাড়ির ভেতর থেকে মন্দিরে যাওয়ার ফটকটিও একসময় বন্ধ করে দেওয়া হয়। মন্দিরটি জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে যায়। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের চেষ্টায় মন্দরটি ফিরে পায় তাহেরপুর মন্দির কমিটি। গত আট বছর থেকে নতুন করে এই মন্দিরটিতে দুর্গাপুজো শুরু হয়েছে। জরাজীর্ণ মন্দিরটিও সংস্কার হয়েছে। ভারত থেকে আনা হয়েছে অষ্টধাতুর প্রতিমা।

শরৎকালের দুর্গাপূজায় দীর্ঘ ছুটি থাকায় হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে অধিকাংশ মানুষ শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে চলে আসতেন। এতে পারস্পরিক যোগাযোগ আরও বাড়ে। ইংরেজ আমলের শেষ দিকে জমিদারিত্বও বিলোপ হয়। তখন থেকে বারোয়ারি দুর্গাপূজার আয়োজন চলে। ‘বারোয়ারি’ শব্দটি ‘বার ইয়ারি’ শব্দদ্বয় থেকে এসেছে বলে মনে করা হয়। ‘বার’অর্থ দ্বাদশ কিন্তু এখানে বহু আর ‘ইয়ারি’ অর্থ বন্ধুর। অর্থাৎ বহু বন্ধুজনের মিলনে যা করা হয় তাই ‘বারোয়ারি। দুর্গাপুজোও অবশেষে বারোয়ারিতে স্থান পায়।

এই বারোয়ারি পুজোতে রাজা বা জমিদারের তুলনায় অনেক বেশি মানুষের সম্পৃক্ততা ঘটে, আর এতে সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ়তর হয়। এখানে দেখা যায়, অন্য ধর্মাবলম্বীরাও আয়োজক ব্যক্তি হিসেবে অংশ নিচ্ছেন।

শারদীয় দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলেও এটি এখন বাংলাদেশের অন্যতম জাতীয় উৎসব। বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে সর্বজনীন শারদীয় দুর্গোৎসব। বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের কাছে এ পুজো চিরায়ত ঐতিহ্য ও ধর্মীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধনে এক অনুপম প্রীতিময় আনন্দ উৎসব।

বাংলাদেশে এবার ৩২ হাজার ১১৮টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপুজো হচ্ছে। রাজধানী ঢাকা মহানগরে পুজো হচ্ছে ২৩৮টি। ২০১৯ সালে সারা দেশে ৩১ হাজার ৩৯৮টি ও ২০২০ সালে ৩০ হাজার ২১৩টি মণ্ডপে দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয়। গত বছরের চেয়ে এবার পুজোর সংখ্যা বেড়েছে এক হাজার ৯০৫টি। এ বছর দুর্গাপুজো উপলক্ষ্যে সরকার তিন কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে, যা গতবারের চেয়ে এক কোটি টাকা বেশি।

দুর্গোৎসব উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁদের বাণীতে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক বাণীতে বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এখানে সব ধর্মের মানুষ সমভাবে উন্নয়নের সুফল উপভোগ করছে। ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’- এ মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে বাংলাদেশে আমরা সব ধর্মীয় উৎসব একসঙ্গে পালন করি।’ তিনি বলেন, আমাদের সংবিধানে সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের সমান অধিকার সুনিশ্চিত করা হয়েছে।’

করোনা ভাইরাস মহামারির মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আরতি প্রতিযোগিতা ও মেলার হচ্ছে না। ভক্ত-দর্শনার্থী ও মন্দির কর্তৃপক্ষ সবাইকে বাধ্যতামূলক মাস্ক পরিধান করতে হচ্ছে। মন্দিরের গেটে সবার জন্য হাত ধোয়া ও স্যানিটাইজেশনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রতিটি পুজো মণ্ডপে প্রবেশের আগে প্রত্যেক ভক্ত-দর্শনার্থীর শরীরের তাপমাত্রা মাপার ব্যবস্থা করা হয়েছে বাংলাদেশের প্রতিটি পুজো মণ্ডপের নিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশ, আনসার, র‍্যাব ও বিডিআর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া পুলিশ ও র‍্যাবের পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি মণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী দায়িত্ব পালন করছে। ঢাকেশ্বরী মন্দির মেলাঙ্গণে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে।

 

লেখক: বার্তা সম্পাদক, একাত্তর টেলিভিশন, ঢাকা, বাংলাদেশ এবং ‘সম্প্রীতি বাংলাদেশ’-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য।

ইমেইল: [email protected]

You might also like