Latest News

খালেদার মুক্তি, বিদেশে চিকিৎসা ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের দাবি ঘিরে ক্রমশ উত্তপ্ত বাংলাদেশ

দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে নিঃশর্ত মুক্তি ও বিদেশে চিকিৎসা করাতে যাওয়ার অনুমতি প্রদান এবং স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে বাংলাদেশের ঘরোয়া রাজনীতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। করোনা পরিস্থিতির মধ্যে প্রায় রোজই দেশটির কোথাও না কোথাও রাজনৈতিক অশান্তির ঘটনা ঘটছে। বিরোধী দল বিএনপির দাবি তাদের নেত্রী খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসা করাতে যেতে দিতে হবে। সরকার অনুমতি না দিয়ে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

এরই মধ্যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করা নিয়ে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হবে আগামী মাসে। ফলে নতুন কমিশন গঠন করতে হবে এ মাসেই।

 

রাষ্ট্রপতির সেই উদ্যোগে এখনও শামিল হয়নি বিএনপি। খালেদা জিয়ার দলের বক্তব্য, এই আলোচনা অর্থহীন। রাষ্ট্রপতির কোনও ক্ষমতা নেই। তাছাড়া বর্তমান রাষ্ট্রপতি হামিদ শাসক দল আওয়ামি লিগের অত্যন্ত অনুগত মানুষ। যে কারণে তাঁকে দু-দফায় রাষ্ট্রপতি করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফলে তিনি শাসক দলকে চটিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেবেন না। স্বাধীন, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন তাই সোনার পাথরবাটি ছাড়া কিছু নয়। নিরপেক্ষ জাতীয় সরকারের নেতৃত্বে ভোট করার পুরনো দাবিও ফের উঠতে শুরু করেছে।

দেশটির প্রধান বিরোধী দল বিগত কয়েক মাস যাবৎ তাদের নেত্রীর বিদেশে চিকিৎসার দাবি নিয়ে আন্দোলনকেই পাখির চোখ করেছে। দুর্নীতির অভিযোগে জেলে থাকা খালেদাকে অসুস্থতার কারণে সরকার জামিনের ব্যবস্থা করেছে। সরকারের বক্তব্য, দেশে তাঁর সুচিকিৎসা হচ্ছে। খাতায় কলমে তিনি একজন আসামী। তাঁকে বিদেশে চিকিৎসা করতে পাঠানোর মতো কোনও আইনি সংস্থান সরকারের নেই।

অন্যদিকে, বিএনপির বক্তব্য, সরকারের হাতেই চূড়ান্ত ক্ষমতা আছে। সরকার মনে করলে যে কোনও বন্দিকে মুক্তিও দিতে পারে। সেখানে খালেদা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিরোধী দলের নেত্রী। তাঁকে মানবিক কারণে বিদেশে যেতে দিতে সরকারের সামনে কোনও আইনি সমস্যা নেই।

শাসক দল আওয়ামি লিগের একাংশের বক্তব্য, খালেদা বিদেশে চিকিৎসা করাতে যাওয়ার দাবির পিছনে রয়েছে গভীর ষড়যন্ত্র। তিনি সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার হরণ নিয়ে সরব হবেন। দিন কয়েক আগে জাতীর উদ্দেশে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্টের চেষ্টা চলছে। চেষ্টা চলছে, যাতে দেশ বিদেশি সাহায্য না পায়।

আগামী বছর বাংলাদেশের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন। বিগত কয়েক বছরের মতো সাধারণ নির্বাচনের আগে নতুন নির্বাচন কমিশন কার্যভার গ্রহণ করে। সে দেশে রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদ, ইউনিয়ন পরিষদ, সিটি কর্পোরেশন ইত্যাদি নির্বাচনের জন্য পৃথক আইন থাকলেও ভারতের মতো জনপ্রতিনিধিত্ব আইন নেই, যেখানে নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া, তাদের ক্ষমতা ইত্যাদি বলা আছে। বস্তুত দেশটিতে নির্বাচন কমিশন গঠন সংক্রান্ত কোনও আইনই নেই। ফলে প্রতিবারই ভোটের আগে রাষ্ট্রপতি ৩৯টি নথিভুক্ত রাজনৈতিক দলের বক্তব্য শুনে একটি সার্চ কমিটি গঠন করেন। সেই কমিটির সুপারিশ সরকার গ্রহণ করতে পারে, নাও পারে। তবে বিগত নির্বাচনগুলিতে কারচুপির অভিযোগের প্রেক্ষিতে আওয়ামি লিগ সরকার এবার অত্যন্ত সচেতন বলে ওয়াকিবহাল মহলের অভিমত।

কিন্তু গোল বেঁধেছে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার প্রশ্ন ঘিরে। ভারতের মতো বাংলাদেশেও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সবই সরকারের ইচ্ছাধীন। যদিও ভারতের রাষ্ট্রপতি সরকারের কোনও সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য মন্ত্রিসভার কাছে ফেরৎ পাঠাতে পারেন। বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির সেই ক্ষমতাও নেই। তিনি নিজে কোনও বিষয় সরকারের বিবেচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠাতে পারেন। প্রধানমন্ত্রীই ঠিক করবেন তিনি রাষ্ট্রপতির আর্জি শুনবেন কি না। স্বভাবতই বিরোধী দলগুলির একাংশের বক্তব্য, রাষ্ট্রপতির মনোনীত সার্চ কমিটি সরকার গ্রহণ করবে, এর কোনও গ্যারান্টি নেই। অন্তত, আগের দু’বার তা হয়নি। সরকারের অন্ধ অনুগতরা নির্বাচন কমিশনে স্থান পেয়েছেন। ফলে বাস্তবে কোনও নির্বাচনই হয়নি।

এই সূত্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিয়েও দেশটিতে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। সে দেশের সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অভিমত, ক্ষমতাহীন ব্যক্তিরও নিজের অভিমত জানাতে কোনও বাধা নেই। আগের রাষ্ট্রপতি প্রয়াত জিল্লুর রহমান রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে আলোচনার পর সার্চ কমিটি তৈরি করে সরকারের কাছে পাঠানোর পাশাপাশি প্রকাশ্যে বিবৃতি জারি করে দেশবাসীকে তা জানিয়ে দিয়েছিলেন। পরে দেখা যায়, সরকার তাঁর মতামত পুরোটা শোনেনি। ফলে দেশবাসী জানতে পারে, সরকার রাষ্ট্রপতির অভিমতকেও অগ্রাহ্য করেছে। বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সেই পথে হাঁটবেন বলে বিরোধীরা প্রত্যাশা করছে না।

রাষ্ট্রপতির আলোচনা প্রক্রিয়া নিয়ে শুধু রাজনৈতিক দলগুলিই নয়, সক্রিয় হয়েছে সে দেশের নাগরিক সমাজও। এখনও পর্যন্ত বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলই রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে নিজেদের অভিমত জানিয়েছে। হালে নাগরিক সমাজের একাংশের পক্ষ থেকে আলোচনার আরও কয়েকটি বিষয় অর্ন্তভুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আইনজীবী আমির-উল ইসলাম, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান, সাবেক বিচারপতি আবদুল মতিন, সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন, মানবাধিকারকর্মী হামিদা হোসেন, বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ, মন্ত্রিপরিষদের সাবেক সচিব আলি ইমাম মজুমদার প্রমুখ বিবৃতিতে বলেন, ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নের বেশ কিছু মাপকাঠিতে দেশের প্রশংসনীয় সাফল্য এসেছে। তবে মুদ্রার অপর পিঠ; অর্থাৎ নির্বাচন, জবাবদিহি, আইনের সমপ্রয়োগ, বাক্‌স্বাধীনতা, সভা-সমিতির অধিকার, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও নির্যাতন এবং আনুষঙ্গিক অনেক মাপকাঠিতে আমরা ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছি। বৈষম্যের হারও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানের ক্রমাবনতি এখন অনস্বীকার্য।’

You might also like