Latest News

পড়শি দেশের আরশাদ ভাঙলেন জ্যাভলিনের সমস্ত রেকর্ড! রাজমিস্ত্রি বাবার ‘সোনার স্বপ্ন’ গড়লেন ছেলে

দ্য ওয়াল ব্যুরো: লড়াইয়ের মন্ত্র আসে জীবনের অধ্যায় থেকে। যাঁর জীবন যত কঠিন, তিনি তত উপরে ওঠেন, তাঁর চোয়াল শক্ত হয়। চোখের জলও মনকে শক্ত করে দেয়। তেমনই হয়তো জীবন পাকিস্তানের জ্যাভলিন থ্রোয়ার আরশাদ নাদিমের। দু’বেলা পেট ভরে খাবার ব্যবস্থা ছিল না, সেই ছেলের কথা গ্রামের সকলের মুখে মুখে ঘুরছে। আরশাদ বদলে দিয়েছেন তাঁর পৃথিবী, তাঁদের বাড়িতে পড়ছে সোনা-রোদ।

রবিবার বার্মিংহামে আয়োজিত কমনওয়েলথ গেমসে, পাকিস্তানের (Pakistan) আরশাদ নাদিম (Arshad Nadeem) জ্যাভলিন থ্রোতে (Javelin Throw) জিতে নিয়েছেন সোনা (Gold)। বিশ্বমানের খেলোয়াড় হিসাবে তাঁর নাম এখন স্বর্নাক্ষরে লেখা।  ৯০.১৮ মিটার জ্যাভলিন ছুঁড়ে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছেন তিনি। নীরজ চোপড়ার ৮৯.৯৪ মিটারের রেকর্ডকেও ভেঙে দিয়েছেন আরশাদ। সব থেকে অবাক করার বিষয় হচ্ছে, নীরজের বন্ধু এই পাক জ্যাভলিন থ্রোয়ার।

এমনকি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের স্বর্ণপদক বিজয়ী গ্রেনাডার অ্যান্ডারসন পিটার্সকেও ছাপিয়ে গিয়েছেন তিনি। ৮৮.৬৪ মিটার জ্যাভলিন ছুড়ে দ্বিতীয় স্থানে আছেন পিটার্স।

পাকিস্তানের পাঞ্জাবের মিয়া চান্নু শহরের ছেলে আরশাদ। তাঁর বাবা মহম্মদ আশরাফ, পেশায় একজন রাজমিস্ত্রি। রাত জেগে বসে ছিলেন ছেলের সাফল্য দেখবেন বলে। তাঁর স্বপ্ন সফল, আরশাদ পেরেছেন, বাবার কষ্ট আজ লাঘব হয়েছে।

পাকিস্তানের খুব জনপ্রিয় গ্রাম্য খেলা নেজাবাজি। এই খেলার প্রতি আরশাদের বাবার ভীষণ আগ্রহ।  এই খেলার সঙ্গে জ্যাভলিন থ্রোয়ের অনেকটা মিল আছে।  বাবার ইচ্ছাতেই আরশাদ এই খেলায় যোগ দেন। গ্রামে এই খেলার প্রশিক্ষণও দিতেন তিনি।

সারাদিন বাবার সঙ্গে হাড়ভাঙা খাটুনির পর আরশাদ নামতেন মাঠে, তাঁর ভালবাসার পৃথিবীতে। সবাই ভেবেছিলেন, খেলাধুলায় অত্যন্ত মেধাবী আরশাদ হয়ত ফুটবল বা ক্রিকেট খেলবেন। কিন্তু না, তা হল না। স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় কোচ রাশেদ আহমেদ সাকির আরশাদকে দিলেন বর্শা ছোঁড়ার প্রশিক্ষণ। তিনিই প্রথম আবিষ্কার করলেন এই ছেলের হাতের বর্শা ছুটবে সোনার পথে।

 আরশাদরা আট ভাইবোন, আরশাদ তৃতীয়। গরীব বাবা তাঁর খেলোয়াড় ছেলের মুখে পুষ্টিকর খাবার তুলে দিতে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে যেতেন। তিনি কখনই চাননি তাঁর ছেলে তাঁর মত রাজমিস্ত্রির কাজ করুক।

 আরশাদ যখন বর্শা নিক্ষেপকে তাঁর জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে নিয়েছেন তখন একটি সরকারি চাকরির খোঁজে পাকিস্তান ওয়াটার অ্যান্ড পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (ওয়াপডা) -এর স্পোর্টস কোটার ট্রায়ালে অংশগ্রহণ করেছিলেন।  সেখানে তার ৫৫ মিটার বর্শা নিক্ষেপে পাঁচবার পাকিস্তান জাতীয় চ্যাম্পিয়ন জিতে নেন তিনি। তাতেই প্রাক্তন এশিয়ান পদকজয়ী জ্যাভলিন নিক্ষেপকারী সৈয়দ হোসেন বুখারির নজরে পড়ে যান আরশাদ।

বুখারি ডেকে পাঠান আরশাদকে। তাঁকে স্পোর্টস কোটায় চাকরি দেওয়ার জন্য ওয়াপডা-র ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানান বুখারি। তিনি এ ও বলেন, এই ছেলে কিছুদিনের মধ্যেই ৬০ মিটারের গন্ডি ছাড়িয়ে ছুঁড়বে বর্শা।

বুখারি বলেছেন, “এত অল্প বয়সে আরশাদের শক্তিশালী হাত দেখে প্রথমেই মুগ্ধ হয়েছিলাম। অর মধ্যে একটা স্ফুলিঙ্গ দেখেছিলাম আমি। যদিও ও ট্রায়ালে ৫৫ মিটার বর্শা ছুঁড়েছিল। কিন্তু আমি নিশ্চিত ছিলাম, যদি একটি সঠিক সেট আপে কোচিং করানো হয় তবে আরশাদ উন্নতি করবেই।  হোস্টেলে আসার পর পুষ্টিকর খাবার, প্রশিক্ষণ দুই-ই পেয়েছে সে। হস্টেলে আসার দুই মাসের মধ্যে ৬০ মিটার এবং চার মাস পরে,২০১৫ সালে, ১৮ বছর বয়সে, পাকিস্তান জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ৭০.৪৬ মিটার বর্শা ছোড়ে আরশাদ।”

 ২০১৫ সালে ৭০ মিটার অতিক্রম করার তিন বছর পর, আরশাদ ২০১৮ সালে জাকার্তায় এশিয়ান গেমসে ৮০.৭৫ মিটার থ্রো করে ৮০ মিটারও পার করে যান। গত চার বছরে আরশাদকে ৪ বার ৮৫ মিটার অতিক্রম করতে দেখা গেছে।  গত বছর ইরানে ইমাম রেজা কাপে ৮৬.৩৮ মিটার থ্রো করেছেন তিনি।

 ২০১৬ সালে এশিয়ান গেমসে নীরজ এবং আরশাদ একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। যেখানে নীরজ সোনা জিতেছিলেন এবং আরশাদ ব্রোঞ্জ।  পরে, ২০১৭ সালে ভুবনেশ্বরে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে তাঁরা একসঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

বুখারির ইচ্ছা আরশাদ এবং নীরজকে একই মাঠে খেলতে দেখার। তিনি বলেছেন, নীরজও আমাদের ছেলের মতো।আমি একজন পাকিস্তানি হিসাবে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে নীরজ যদি জিতে যায়, আমরা তাকে সেই ভালবাসাই দেব যা আমরা মিলখা সিংকে দিয়েছিলাম”। .

প্রসঙ্গত, ১৯৬০ সালে লাহোরে আব্দুল খালিকের বিরুদ্ধে জিতেছিলেন মিলখা সিং।

টেবল টেনিসে সিঙ্গলসে সোনা কমলের, ১৬ বছর পরে কমনওয়েলথে শাপমুক্তি

You might also like