Latest News

রেল প্রকল্পের পর বন্দর নিয়েও অনড় বিজয়ন, কেরলে ক্রমেই চওড়া সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের ছায়া

দ্য ওয়াল ব্যুরো: কেরলে একটি রেল প্রকল্প (railway project) নিয়ে বাংলার সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনের ছায়া আগেই দীর্ঘায়িত হয়েছে। এবার তাতে যুক্ত হয়েছে একটি বন্দর প্রকল্প ( port project)। দুটি প্রকল্প নিয়েই কেরলের (Kerala) সিপিএম পরিচালিত সরকার অনড় মনোভাব নেওয়ায় প্রতিবাদও ক্রমে দানা বাঁধছে।

নয়া বিতর্কের সূত্রপাত ভিজহিনজাম গভীর সমুদ্র বন্দরের বিরুদ্ধে মৎস্যজীবীদের আন্দোলনে রাজনীতির লোকদের তুলনায় নাগরিক সমাজ এবং খ্রিস্টানদের নানা গোষ্ঠীর যোগদান ঘিরে। সিলভার লাইন রেল প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্যে বন্দরের বিরোধিতা ঘিরে সরাসরি সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে মৎস্যজীবীদের স্থানীয় থানায় হামলার ঘটনায় পরিস্থিতি তপ্ত হয়ে আছে। কেরল সরকার তিন হাজার মৎজ্যজীবীর বিরুদ্ধে এফআইআর করেছে।

যদিও দুটি প্রকল্পের মধ্যে মৌলিক ফারাক হল, গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আগের কংগ্রেস সরকার। ২০১৫ সালে প্রকল্পটির শিলান্যাস করেন তৎকালীন কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী ওমেন চণ্ডী। আদানি পোর্ট লিমিটেডের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বন্দরটি তৈরি হচ্ছে।

বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী তথা সিপিএম পলিটব্যুরোর সদস্য পিনারাই বিজয়ন গতকাল তিরুবনন্তপুরমে এক সরকারি অনুষ্ঠানে বলেন, ‘২০১৬-তে আমরা ক্ষমতায় আসার সময় বন্দরের প্রকল্পের কাজ অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিল। কংগ্রেস সরকারের সঙ্গে আমাদের নীতির ফারাক আছে। কিন্তু সরকার বদল হলেই যদি প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে রাজ্যের অগ্রগতি থমকে যাবে। আমরা তাই বন্দর নির্মাণ প্রকল্প বন্ধ করিনি।’

বিজয়ন বিস্ময়ের সঙ্গে বলেন, ‘এত বছর পর প্রকল্পের বিরোধিতা শুরু হয়েছে। মৎস্যজীবীদের ছয়টি দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। এবার প্রকল্প চলতে দেওয়া হোক।’ তাঁর সাফ কথা, ‘প্রকল্প গোটানোর প্রশ্ন ওঠে না। সরকার বন্দর নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাবে।

গভীর সমুদ্র বন্দর আগের কংগ্রেস সরকারের নেওয়া প্রকল্প হলেও এখন পরিস্থিতির চাপে হাত-শিবির সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছে। তা নিয়ে চড়েছে রাজনৈতিক বিরোধের পারা।

প্রস্তাবিত রেল প্রকল্পটির নাম ‘সিলভার লাইন রেল’। ৫২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথটি তৈরি হওয়ার কথা তিরুবমন্তপুরম থেকে কাসারগড় জেলা পর্যন্ত। আধুনিক এই রেল চলবে ঘণ্টায় দুশো কিলোমিটার গতিতে।

প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৬৩ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। যদিও ২০২৫-’২৬ আর্থিক বছরে প্রকল্প শেষের সময় খরচ প্রায় এক লাখ কোটি দাঁড়াবে বলে মনে করছে নীতি আয়োগ।

এই রেল প্রকল্পের সঙ্গে ভারতীয় রেলের সরাসরি কোনও সম্পর্ক নেই। নীতি আয়োগ প্রাথমিক পরিকল্পনা তৈরিতে সাহায্য করেছে মাত্র। কেরল সরকার ভারতীয় রেলের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ‘কে-রেল’ নামে একটি কোম্পানি গড়ে তুলেছে। সেই কোম্পানিকে সিলভার লাইন নামের রেল প্রকল্পটির বরাত দেওয়া হলেও খরচের সিংহভাগই বহন করার কথা জাপানি সংস্থা জাইকা।

কিন্তু আন্দোলনের চাপে ভারতীয় রেল বোর্ড কে রেলের সঙ্গে আর কোনও ধরনের বোঝাপড়ায় যেতে অস্বীকার করেছে। বিজয়ন এই ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সহযোগিতা চাইতে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু রেল বোর্ড এখনও সাড়া দেয়নি।

প্রকল্পটি নিয়ে আপত্তির কারণ কী?
মূলত তিনটি কারণ। এক. কেরলের আর্থিক পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। করোনাকালে আরও খারাপ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বহু মানুষ কাজ হারিয়ে রাজ্যে ফেরৎ আসায়। এই অবস্থায় প্রায় এক লাখ কোটি টাকা চড়া সুদে ধার নিয়ে এই প্রকল্পে ঢাললে কল্যাণ প্রকল্পগুলিতে অর্থের টানাটানি হবে।

দুই. অভিযোগ, বিপন্ন হবে পরিবেশ। অন্যান্য রেলের তুলনায় এই প্রকল্পে জমি বেশি লাগবে। কারণ, রেল পথের দু-পাশে থাকবে উঁচু ফেন্সিং। যাতে কেউ রেলপথে ঢুকে পড়তে না পারে। তাছাড়া প্রায় অর্ধেক রেলপথ হবে এলিভেটেড করিডোর। সেই কারণেও বাড়তি জমি দরকার।

প্রাথমিক হিসাবে প্রায় সাড়ে তিন হাজার একর জমি নেওয়া হবে। সবচেয়ে ঘন বসতিপূর্ণ রাজ্য হওয়ার কারণে কেরলে ফাঁকা জমি কম। সেখানে একটি প্রকল্পের জন্য এত বিপুল পরিমান জমি নেওয়ার সিদ্ধান্তে অনেকেই বিস্মিত।

কারণ, প্রস্তাবিত রেল পথের মধ্যে চাষের জমি, বনাঞ্চল, জলাজমি, জনবসতি, হাট-বাজার এমনকী বড় বাজার-হাটও পড়েছে। বিস্তীর্ণ রেল পথ বসবে পশ্চিমঘাট পর্বতমালার পাদদেশে। ফলে পরিবেশের বিপুল ক্ষতির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তিন. কয়েক হাজার পরিবারকে উচ্ছেদ করা হবে। নীতি আয়োগের হিসাব অনুযায়ী, জমির জন্য খরচ হবে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, ঘনবসতিপূর্ণ রাজ্যে এত পরিবারের পুনর্বাসনের জায়গা মিলবে কীভাবে?

মুখ্যমন্ত্রীর চ্যালেঞ্জের জবাবে কংগ্রেস ঘোষণা করেছে সরকার পিছু না হঠলে জমি অধিগ্রহণের জন্য পোঁতা পিলার তারা উপড়ে ফেলার ডাক দেবে। সরকার ও বিরোধীদের এই সংঘাত ঘিরে কেরলের ওই প্রকল্পে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের আন্দোলনের ছায়াই ক্রমশ দীর্ঘায়িত হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই যেন বাংলায় সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বের বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।

শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ এবং সিঙ্গুরে টাটার ন্যানো কারখানা, নন্দীগ্রামে সালিমদের কেমিক্যালস হাব নিয়ে জেদ ধরেছিলেন বুদ্ধদেব। শিল্পায়নের হাত ধরে নতুন বাংলা গড়ার স্বপ্নপূরণে বুদ্ধদেববাবুর জেদি অবস্থানের সঙ্গে হুবহু মিল পাওয়া যাচ্ছে কেরলের সিপিএম মুখ্যমন্ত্রী বিজয়নের কথাবার্তায়। বুদ্ধদেববাবুর মতো পিনারাইও দ্বিতীয়বার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন।

বন্দর প্রকল্প নিয়েও মূলত পরিবেশ বিপন্নতা এবং মৎস্যজীবীদের কাজ হারানোর আশঙ্কা প্রকাশ করে আন্দোলন শুরু হয়েছে। রেল এবং বন্দর, দুই প্রকল্পেই আন্দোলনকারীদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন মেধা পাটকরের মতো অধিকার আন্দোলনের প্রথমসারির মুখ।

ফের দুর্ঘটনা বন্দে ভারতে! মোদীর রাজ্যে চলছে ভোট, তার মধ্যেই গরুকে ধাক্কা এই ট্রেনের

You might also like