Latest News

‘নিজে রোজগারের সাধ কি থাকতে নেই!’ মাশরুম চাষেই বাজিমাৎ বাঁকুড়ার রূপালির

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

ছোট্ট মেয়েটা যখন সংসারে বিয়ে হয়ে এসেছিল, তখন সে কিশোরী। ভাল-মন্দ-চাওয়া-পাওয়া বুঝতে শেখার আগেই কোলজুড়ে এসেছিল প্রথম পুত্রসন্তান। তার পরে সে কিশোরী মেয়ে নিজেই যে কখন দায়িত্ববান মা হয়ে উঠল, কর্তব্যপরায়ণ বৌ হয়ে উঠল, তা যেন সে নিজেই বুঝে উঠতে পারেনি।

কিন্তু দায়িত্ব-কর্তব্য মানেই কি কেবল শ্বশুরবাড়ির লোকজন আর সন্তানকে নিয়ে সংসারের জন্য প্রাণপাত করা? নিজের প্রতি নিজের দায়িত্ব, নিজের ইচ্ছেকে গুরুত্ব দেওয়ার কর্তব্য—এগুলো কি জরুরি নয়?

এ প্রশ্ন যখন সেদিনের সেই কিশোরী বধূ বাঁকুড়ার ছোট সারেঙ্গা এলাকার বাসিন্দা রূপালিকে নাড়া দিল, তিনি তখন ২৬ বছরের তরুণী। তাঁর কোলজুড়ে ততদিনে এসেছে আরও এক সন্তান, তরতরিয়ে বড় হচ্ছে সে। স্বামী, পরিবার, দুই ছেলে—সবই ঠিক আছে, কেবল রূপালি যেন নিজেই হারিয়ে গেছেন নিজের কাছ থেকে।

এর পরে ঠিক দুটো বছর গেছে। আজ ২৮ বছরের রূপালি মল্ল নিজে, ট্রেনিং নিয়ে, একা হাতে, ঘরের ভিতরে মাশরুম চাষ করছেন দাপিয়ে। সে মাশরুম বাজারে বিক্রি করে উপার্জন করছেন অর্থ। সংসার চালানোর পাশাপাশি নিজের সাধ-আহ্লাদ পূরণ করছেন ইচ্ছেমতো। নিজের রোজগারে নিজে বাঁচছেন। গোটা এলাকার সাধারণ মানুষ তো বটেই, বাঁকুড়ার এগ্রিকালচারাল অফিসারদের কাছেও রীতিমতো দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছেন রূপালি।

কৃষি দফতরের তরফে স্থানীয় একটা ট্রেনিং নিয়ে রূপালি ঠিক করেছিলেন, নিজেই করবেন এই চাষ। কেমন হয়, দেখাই যাক না! নিজের হাতে ছোট্ট একচালা মাটির ঘর গড়েন প্রথমে। এই অন্ধকার, স্যাঁতস্যাঁতে ঘরটাই মাশরুম চাষের অন্যতম মূলধন।

এর পরে যেমন করে শিখেছেন, তেমন করে ‘সিলিন্ডার’ গড়তে লাগেন তিনি। খড় ছোট করে কুচিয়ে, তাকে ভিজিয়ে বা ভাপিয়ে নিয়ে, জল ঝরিয়ে নির্দিষ্ট মাপের প্যাকেটে চেপে চেপে ভরতে হয়। তাতেই নিয়ম মেনে মেশাতে হয় মাশরুমের বীজ। তার পরে সে প্যাকেটের মুখ বেঁধে, সেগুলির গায়ে ফুটো করে, নির্দিষ্ট ঘরটিতে ঝুলিয়ে দিলেই হল। এই এক একটি প্যাকেটকেই বলে সিলিন্ডার।


পরিশ্রম বলতে এতটুকু, এক একটি সিলিন্ডার-পিছু খরচ বলতে বড়জোর ৫০ টাকা। এর পরে নির্দিষ্ট সময় পার করে, মাশরুম বেরোতে শুরু করে প্যাকেটের গা দিয়ে। তখন তাতে স্প্রে করে দিতে হয় জল। পরিচর্যা বলতেও এইটুকুই। এক একটি সিলিন্ডার থেকে এভাবেই পাওয়া যায় দেড় থেকে দু’কেজি মাশরুম। সারেঙ্গার বাজারে কিলোপ্রতি মাশরুমের দাম একশো থেকে দেড়শো টাকা। যত বেশি সংখ্যায় সিলিন্ডার বানিয়ে ঝোলানো যাবে, তত লাভ।

প্রথমবারই ফসল উপচে পড়ে রূপালির ছোট্ট ঘরে। বাজার ঘুরে বিক্রিও করেন তা তিনি। ঘরের ভিতরে, কোনও রকম কীটনাশক বা রাসায়নিক ছাড়া, একেবারে জৈব উপায়ে চাষ করা এ মাশরুম যেমন সুস্বাদু, তেমনই উপাদেয়।

জনপ্রিয়তা ও পরিচিতি পেতে দেরি হয়নি রূপালির চাষের। এবছর শীতে ফের মাশরুম ফলান তিনি। এবার আরও অভিজ্ঞ ও দক্ষ হাতে মাশরুম ভরে ওঠে ঘরে।

কবে, কেন, কোন পরিস্থিতিতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন রূপালি, তা নিয়ে আজ আর বেশি ভাবতে চান না তিনি। তাঁর কথায়, “সকলেই তো চায় নিজের পায়ে দাঁড়াতে, কিছু করতে। আমিও তাই। নিজে রোজগার করার সাধ কি থাকতে নেই! তাই অনেকে ট্রেনিং নিলেও, নিজের হাতে কাজটা আমিই শুধু করেছি এই এলাকায়। সুযোগ পেলে আরও অনেক বড় করে করব, অন্য মানুষকেও কাজ দেব।”


এই প্রথম নয়, রূপালি এর আগও নানা কাজ করেছেন। একবার তো একশো দিনের কাজে পুকুরে মাটিও কেটেছেন। কম হলেও রোজগার করেছেন নিজে। সবসময়ই চেয়েছেন স্বনির্ভর হতে।

কপালের ফেরে হয়তো পড়াশোনা করে চাকরিবাকরি করা সম্ভব হয়নি, তাই বলে স্বপ্নেরা কখনওই ছুটি নেয়নি রূপালির চোখ থেকে। তাঁকে তাড়া করেছে, নিজের কিছু করার ইচ্ছে, উৎসাহ। সেই সঙ্গে যখনই হাত ধরেছে উদ্যোগ, তখনই শ্রমের গাছে উপার্জনের ফুল ধরেছে রূপালির ছোট্ট ঘরে।

দেখুন, রূপালির কাহিনি।

আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারীদিবসে তাই কুর্নিশ সারেঙ্গার ‘মাশরুম চাষি’ রূপালিকে। জীবন ও জীবিকার অনন্য এক মিশেলে তিনি হয়ে উঠেছেন অনুপ্রেরণার আর এক নাম।

You might also like