মঙ্গলবার, জুন ২৫

ককপিটে মহিলা! প্রেজুডিস ভেঙে, আকাশ দাপিয়ে, উড়ানের ডাক মেয়েদের

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

—“এত লাফাচ্ছে কেন প্লেনটা!”
—“দেখলেন না মহিলা পাইলট! নিশ্চয় চালাতে পারছে না ঠিক করে।”

কয়েক দিন আগেই পরিচিত এক ভদ্রলোক এই কথোপকথনের সাক্ষী ছিলেন বিমানযাত্রার সময়ে।

এর উল্টোটাও আছে। এ বছরেই এপ্রিল মাসে দক্ষিণ-পশ্চিম এশীয় একটি বিমান মাঝআকাশে আটকে পড়েও খুব দক্ষতার সঙ্গে জরুরি অবতরণ করে। বেঁচে যায় ১৫০ প্রাণ। ককপিট থেকে পাইলট বেরিয়ে এসে পরিচয় দেওয়ার পরে, পাইলটকে দেখেই সকলে বলে উঠেছিলেন, “আরে বাহ্! একটি মেয়ে এত সুন্দর অবতরণ করল!”

দু’টো ঘটনা দু’রকম হলেও, আসলে একই মানসিকতার পরিচয় দেয়। এখনও একটা বড় অংশের মানুষের ধারণা, মেয়েদের পক্ষে ভাল বিমান চালানো হয়তো একটু কঠিন। একটু ‘বিশেষ’ ব্যাপার। যেন বিমান চালানোর প্রয়োজনীয় দক্ষতা শুধু পুরুষদেরই একচেটিয়া। আর মহিলাদের জায়গা ককপিটের ভেতরে নয়, বাইরেই। খাবারের ট্রলি পরিচালনা করায় বা যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলায়।

ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন জানাচ্ছে, এই মুহূর্তে সারা বিশ্বে পাইলটের সংখ্যায় বেশ খামতি রয়েছে। কিন্তু এই অবস্থায়, এই পেশায় যোগ দেওয়ার জন্য মেয়েদের তেমন অগ্রণী ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। যত মহিলা এয়ারহোস্টেস হতে চান, তার কিছু অংশও যদি পাইলট হিসেবে কাজ করতে চাইতেন, তা হলে সমস্যার সমাধান হতো খানিকটা।

বস্তুত, গলদ গোড়াতেই। এভিয়েশন সংক্রান্ত যত ছবি, বিজ্ঞাপন, পোস্টার দেখা যায় সারা বিশ্বে— তার বেশির ভাগেই পাইলটের ভূমিকায় থাকেন কোনও না কোনও সুদর্শন পুরুষ চরিত্র, আর সুদর্শনা মহিলাদের ব্যবহার করা হয় বিমানকর্মী বা বিমানসেবিকার ভূমিকায় দেখানোর জন্য। যেন স্পষ্ট বার্তা দিয়ে দেওয়া হয়, মহিলাদের এভিয়েশনে কাজ করা মানেই সেবিকা অথবা কর্মীর ভূমিকায়। ক্যাপ্টেনের ভূমিকায় নয়। ওটি পুরুষদেরই কাজ। তথ্য বলছে, এখন সারা পৃথিবীতে মোট যত সংখ্যক পাইলট আছেন, তার মাত্র তিন শতাংশ মহিলা।

অস্ট্রেলীয় এয়ারলাইন্সের বিজ্ঞাপন। মহিলাদের ভূমিকা সেবিকা হিসেবেই।

তবে অবস্থার বদল আসে চাহিদার নিয়ম মেনেই। বিশ্ব জুড়ে পাইলট-সমস্যা মেটাতে কিছু এয়ারলাইন্স উদ্যোগী হয়েছে, মহিলা পাইলট নিয়োগ করায়। আর তা রীতিমতো নিয়ম মেনে। যেমন ইউরোপের বৃহত্তম এয়ারলাইন্স ইজ়িজেট ঘোষণা করেছে, যে তারা উদ্যোগ নিয়েছে, ২০২০ সালের মধ্যে তাদের যত সংখ্যক পাইলট রয়েছেন, তার ২০ শতাংশই হবেন মহিলা। এখন থেকেই শুরু হয়েছে প্রশিক্ষণ, নিয়োগ।

পরিসংখ্যান বলছে, এখন সারা বিশ্বের যা যাত্রীসংখ্যা, তা আগামী ২০ বছরে বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যাবে। হিসেব মতো আরও ছ’লক্ষ ২০ হাজার জন পাইলট নিয়োগ করতে হবে। শুধু পুরুষদের মধ্যে এই পেশায় যোগ দেওয়ার প্রবণতা আটকে থাকলে, এই বিপুল চাহিদা কখনওই সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না।

যদিও বিশ্বের নানা প্রান্তে মহিলাদের ককপিট দাপানোর নানা উদাহরণ রয়েছে। মাঝে মাঝেই দক্ষতার পরিচয় দিয়ে, সপ্রতিভ উড়ান সম্পূর্ণ করে সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে এসেছেন তাঁরা। কিন্তু এই রীতি শুধু ‘উদাহরণ’ হয়েই থেকে গিয়েছে, অভ্যাস হয়ে ওঠেনি। স্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি।

নেপাল এয়ারলাইন্সের ছবি।

অবসরপ্রাপ্ত মহিলা পাইলট, ক্যাপ্টেন ক্যাথি ম্যাকুলোর কথায়, “মহিলা পাইলটদের উপরে স্পটলাইট গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু স্পটলাইটের পরিধি বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। মেয়েদের সফল উড়ানের ঘটনাগুলো আরও বেশি বেশি করে সামনে আসতে থাকলে, এক সময় আর সেটা বিচ্ছিন্ন বিস্ময় থাকবে না। নিয়মিত অভ্যাস হয়ে যাবে। মেয়েদের ককপিটের গল্প যত দিন সংবাদ মাধ্যমের ‘হেডিং’ হিসেবে থাকবে, তত দিন ধরে নেওয়া যায়, পাইলট হিসেবে মেয়েদের দায়িত্ব নেওয়ার ধারাটি মোটেই পরিবাহিত হচ্ছে না সঠিক ভাবে। সেটি কোথাও একটা আটকে রয়েছে।”

ডাচ এয়ারলাইন্স ট্রানস্যাভিয়ার মহিলা পাইলট, ৫৫ বছরের ক্লার্ক জানাচ্ছেন, তিনি চেষ্টা করেন প্রতিটা উড়ানের শেষে ককপিট থেকে বেরিয়ে এসে যাত্রীদের বিদায় জানাতে। কিন্তু প্রায় সকলেই তাঁকে বিমানকর্মী ভেবে বসেন প্রথমেই। পরিচয় দেওয়ার পরে, অনেক যাত্রীই পাইলটের ভূমিকায় মহিলা ছিলেন জানতে পেরে বিস্ময়ে হাত নাড়তেই ভুলে যান।

কেউ কেউ তো প্রকাশই করে ফেলেন, “বাপ রে! বেঁচে গিয়েছি খুব জোর!” খুব মজা করা গিয়েছে ভেবে বললেও, এটা আসলে মজা নয়, অপমান। মহিলা মাত্রেই প্লেন চালানোয় ত্রুটি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে— এই অপমানজনক দৃষ্টিভঙ্গিটাই বদলাতে হবে বলে মনে করছেন তিনি। ককপিটে মহিলা চালক মানেই তাতে আলাদা করে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কারণ এক জন পুরুষের মতোই একই প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনের পরে ককপিটে প্রবেশ করেছেন মহিলা চালকও। এই ভরসাটুকু রাখতেই হবে। আর তার পরেও কোনও ভাবে সত্যিই বিপদে পড়লে, পুরুষ-মহিলা সমান।

ক্লার্কের কথার সূত্র ধরেই ফরাসি মহিলা পাইলট সফি কপিন বলেন, “আমরা মেয়েরা, যারা পাইলট হতে চাই, তারা আগে থেকেই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির বাধায় আটকে থাকি। তার উপর, আমাদের সামনে রোল মডেল হিসেবে কাউকেই প্রায় পাওয়া যায় না। কোথাও যেন অসচেতন ভাবেই এভিয়েশন এবং মহিলা—এই দু’টি বিষয় পরস্পরবিধর্মী হয়ে উঠেছে। তবে আশার কথা, পরিস্থিতি বদলাচ্ছে।”

প্রথম পেশাদার মহিলা পাইলট, ট্যামি জো শাল্টস।

৫৬ বছরের ট্যামি জো শাল্টস, এভিয়েশনের ইতিহাসে প্রথম মহিলা পাইলট বলে পরিচিত। এই মার্কিন মহিলা জানাচ্ছেন, তিনি যখন এই পেশায় আসতে চেয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন সারা ক্লাসে একাই ছাত্রী ছিলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হতো, “এত ছেলের মাঝে অসুবিধা হচ্ছে, বিচ্ছিন্ন লাগছে?” শাল্টস বলেন, “আমি একটাই উত্তর দিতাম, আমি উড়তে চাই। বাকি কিছুই জরুরি নয়। আমার ইচ্ছের সামনে কোনও সমস্যাই বড় নয়।” তার পরে ক্লাস করতেন ঠিকই, কিন্তু বারবারই তাঁকে মনে করিয়ে দেওয়া হতো, আজ অবধি কোনও মহিলা এই পেশায় আসেননি।

তাতে অবশ্য কিছুই থেমে থাকেনি। পৃথিবীর সব ক্ষেত্রেই কেউ না কেউ ‘প্রথম’ হন, পথ দেখান। এখানেও তা-ই হয়েছিল। এবং সেই পথ যাতে আরও প্রশস্ত হয়, তা নিশ্চিত করার যাত্রা শুরু হবে সময়ের দাবিতেই।

Leave A Reply