রবিবার, নভেম্বর ১৭

অন্ধকার থেকে আলোর অভিযান! রাজস্থানের ঘরে ঘরে সূর্যের আলো পৌঁছে দিচ্ছেন সৌর-বান্ধবীরা

চৈতালী চক্রবর্তী

কমবে অনাবশ্যক বিদ্যুতের খরচ। সৌর আলো জ্বলবে প্রত্যন্ত গ্রামের ঘরে ঘরে। সৌরশক্তিতে চলবে নিত্যদিনের যাবতীয় গৃহস্থালির কাজ। সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন করে রাজস্থানের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছে ফ্রন্টিয়ার মার্কেটস। মরু রাজ্যে সৌর বিদ্যুতের প্রচার ও প্রসারে সংস্থার হাতিয়ার নারী-শক্তি। গ্রামের মহিলাদের হাত ধরেই রাজস্থানের প্রায় প্রতিটি ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে সূর্যের আলো।

পরিবেশ দূষণ এড়াতে অপ্রচলিত শক্তির ব্যবহার বাড়াতে বলছেন পরিবেশবিদেরা। পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও অপ্রচলিত শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এক নতুন দিশা দেখিয়েছে ফ্রন্টিয়ার মার্কেটস। এ ক্ষেত্রে তাদের প্রজেক্ট সৌরশক্তি। অন্ধকারে ডুবে রয়েছে যে ঘর, সেখানে যত্ন করে আলো পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন সৌর-বান্ধবীরা। ফ্রন্টিয়ার মার্কেটসের এই প্রকল্পের নামও তাই ‘সোলার-সহেলিস’ (Solar Friends)। সৌরশক্তি চালিত রান্নার উপকরণ থেকে নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গ্রামের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছেন মহিলারা। একদিকে সৌরশক্তির বিকাশ, অন্যদিকে মহিলাদের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন দিশা দেখানো হচ্ছে এই প্রকল্পের হাত ধরেই।

ফ্রন্টিয়ার মার্কেটস সিইও অজৈতা শাহ বলেছেন, প্রত্যন্ত গ্রামের হাজারের বেশি মহিলাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সৌরশক্তির খুঁটিনাটি তাঁদের নখদর্পণে। হাঁড়ি-কড়া-খুন্তিতেই বন্দি ছিল যাঁদের জীবন, তাঁরা এখন প্রযুক্তি, মার্কেটিং-এর প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন। প্রতিটি ঘরে গিয়ে সেখানকার মানুষজনকে সৌরশক্তির প্রয়োজনীয়তা বোঝানোর দায়িত্ব তাঁদের। পাশাপাশি, সৌরশক্তি চালিত রান্নার উপকরণ থেকে পাখা, লাইট, বাল্ব, ল্যাম্ব, টিভি ইত্যাদি খুব কম দামে বেচার গুরুদায়িত্বও এই সৌর-সহেলিদের। রাজস্থানের মহিলাদের দিয়ে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। তাঁদের তৈরি করা প্রোডাক্ট গোটা দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। অজৈতার কথায়, ‘‘আমাদের এই প্রকল্পের ৭০ শতাংশ কর্মীই মহিলা। কারণ আমরা দেখেছি, গ্রামের ঘরে ঘরে গিয়ে সেখানকার মানুষজনকে বোঝাতে পারেন মহিলারাই। কথাবার্তা চালাতেও তাঁরা পটু। মহিলারাই তাই আমাদের এই প্রকল্পের মূল্যবান সম্পদ বলা যায়।’’

ফ্রন্টিয়ার মার্কেটসের কর্ণধার অজৈতা শাহ।

নিউ ইয়র্কে জন্ম অজৈতার। শাহরুখ খানের অভিনীত ‘স্বদেশ’ ছবির প্রসঙ্গ টেনে এনে বলেছেন, “আমি মনে করি না আমাদের দেশ এখনই বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে উন্নত ও প্রগতিশীল দেশ। কিন্তু, আমাদের দেশের মানুষদের এই ক্ষমতা রয়েছে যে তারা এই দেশকে উন্নতির সর্বোচ্চ সীমায় নিয়ে যাবে। স্বদেশ ছবির মোহন নাসার চাকরি ছেড়ে দেশের প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষদের জন্য কাজ করতেন। সে রকমই কিছু করার চেষ্টা চালাচ্ছি।”

২০১১ সালে ফ্রন্টিয়ার মার্কেটস তৈরি করেন অজৈতা। দেশের প্রত্যন্ত গ্রামগুলির সার্বিক উন্নয়নের জন্য কাজ করে এই সংস্থা। নানা রকম প্রকল্প রয়েছে তাদের। এর মধ্যে অন্যতম এই ‘সোলার-সহেলিস।’ আইএফসি (IFC-International Finance Corporation)-র তত্ত্বাবধানে রাজস্থানের ‘লাইটিং এশিয়া/ইন্ডিয়া’ প্রকল্পের সোলার-ডিস্ট্রিবিউটার পার্টনার অজৈতা। ‘সোলার-সহেলিস’ প্রকল্পে ফ্রন্টিয়ার মার্কেটসকে সাহায্য করে আইএফসি।

দেশের নানা প্রান্তের স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলির সঙ্গে হাত মিলিয়ে শুরু হয়েছে এই প্রকল্পের কাজ। নিয়োগ করা হয়েছে গ্রামের মহিলাদের। এখনও পর্যন্ত ২৫০০ মহিলা কাজ করছেন এই প্রকল্পের আওতায়। তাঁদের মাধ্যমেই বিক্রি করা হচ্ছে অপ্রচলিত শক্তি উৎপাদনের কাঁচামালও। বাড়ি বাড়ি গিয়ে এই কাজ করছেন ‘সহেলি’ বা সৌর-বান্ধবীরা। এক একজন ‘সহেলি’র দায়িত্বে থাকে গ্রামের ১০০টি করে বাড়ি। ফ্রন্টিয়ার মার্কেটসের তত্ত্বাবধানে তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার দায়িত্বে থাকেন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মীরা।

সৌর-বান্ধবীদের সঙ্গে অজৈতা।

অজৈতা জানিয়েছেন, এখনও পর্যন্ত এই প্রকল্পে ২০ লক্ষ টাকা আয় হয়েছে সংস্থার। আড়াই লক্ষ বাড়িতে পৌঁছেছে সৌরশক্তি। রিনিউয়েবল এনার্জি প্রোডাক্ট বিক্রি হয়েছে প্রায় ৩ লক্ষের কাছাকাছি। মোট ১৭ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছেছে সৌরশক্তি চালিত নানা রকমের প্রোডাক্ট।

ঢোলপুরে সৌর-বান্ধবীদের সঙ্গে বসুন্ধরা রাজে।

‘‘আগে বাড়ির বাইরে পা রাখতে পারতাম না। এখন গ্রামে গ্রামে ঘুরে কাজ করি। মানুষজনকে সৌরশক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা বোঝাই,’’ বলেছেন রাজস্থানের এক ‘সহেলি।’ খুব ছোটবেলায় বিয়ে হয়েছিল কমলেশের। জানিয়েছেন, “মেয়ে বলে পরিবারে আমার কোনও সম্মান ছিল না। এখন শাশুড়ি থেকে দেওর, সকলেই সম্ভ্রমের চোখে আমাকে দেখে। সংসারও অনেকটাই আমার উপর নির্ভরশীল।” আর এক সৌর-বান্ধবী গুড্ডি বলেছেন, ‘‘পড়াশোনা শিখেছি। কী ভাবে মানুষজনের সঙ্গে কথা বলতে হয়, কেমন ভাবে আচরণ করতে হয় সবটা শেখানো হয় আমাদের। অন্ধকার থেকে এক নতুন জীবন পেয়েছি।’’

অজৈতার কথায়, এই প্রকল্পে নিযুক্ত অধিকাংশের বয়স ৩০ বছরের কাছাকাছি। তাদের শেখানো হয় কী ভাবে সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস ব্যবহার করা যায়। নতুন নতুন প্রোডাক্ট তৈরির ভাবনাও তাঁরা দেন। নিজের হাতে তৈরি করেন নানা রকমের প্রোডাক্ট। সেগুলো বিক্রির দায়িত্বও থাকে তাঁদের। শিক্ষার পাশাপাশি এই প্রকল্প তাঁদের রোজগারেরও মাধ্যম।

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে বিগত কয়েক বছরে নানা রকমের প্রস্তাবের কথা বলা হয়েছে। ৩৩১ গিগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা নিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশ্বে প্রথম সারিতে ভারত। কিন্তু মাথা পিছু ব্যবহার বিশ্বের গড়ের মাত্র ৩৩%। সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়িয়ে এই ফাঁকই ভরতে চায় কেন্দ্র।

২০২২ সালের মধ্যে খরচ কমিয়ে গ্রিড-সংযুক্ত ২০ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে কেন্দ্র। ২০১৪ সাল থেকে গত ৯ বছরে দেশে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের চাহিদা প্রায় ৮ গুণ বেড়েছে।  পাশাপাশি, গত ১০ বছরে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাও দ্বিগুণ হয়েছে। ১০ বছর আগে যা ছিল ১,১২,৭০০ মেগাওয়াট। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২.৩৪ লক্ষ মেগাওয়াটে। পরিকাঠামো এবং ইস্পাত, সিমেন্ট ইত্যাদি শিল্পে নিজস্ব বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির উৎপাদন ক্ষমতা আরও বাড়ানো গিয়েছে বলে দাবি করেছে কেন্দ্র।

গ্রামে গ্রামে কর্মশালা করে সৌরশক্তির প্রয়োজনীয়তা বোঝাচ্ছেন সৌর-বান্ধবীরা।

বিকল্প শক্তির উৎপাদন বাড়াতে বাংলার বিভিন্ন জেলায় মোট ১২০ মেগাওয়াটের নতুন সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে রাজ্য। আগামী অর্থবর্ষ (২০১৯-২০) থেকে প্রকল্পগুলি বাস্তবায়নের পদ্ধতিগত কাজ শুরু হবে।

Comments are closed.