শনিবার, নভেম্বর ১৬

যমদূতের মতো খাঁড়া ঝুলিয়ে রেখেছে জলবায়ু পরিবর্তন, তাও আমাদের ব্রেনে কেন ঢুকছে না? জানালেন বিজ্ঞানীরা

চৈতালী চক্রবর্তী

২০১৮ সাল। হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে সুইডিশ পার্লামেন্টের বাইরে দাঁড়িয়ে বছর পনেরোর এক কিশোরী। গ্রেটা থুনবার্গ। প্ল্যাকার্ডে লেখা ‘বোল্ড ক্লাইমেট অ্যাকশন।’ গোটা বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আন্দোলনের পথে একা কিশোরী। ধীরে ধীরে সঙ্গী জুটল। সুইডেন থেকে রাষ্ট্রপুঞ্জের জলবায়ু সামিটেও একই ভাবে প্ল্যাকার্ড হাতে প্রতিবাদের মুখ হয়ে উঠলেন কিশোরী। তখন বয়স ১৬। ফুটফুটে কিশোরীর প্রতিবাদের ভাষা দেখে মুগ্ধ হলেন বিশ্বের তাবড় আবহবিদ, পরিবেশপ্রেমী থেকে রাজনীতিকরা। আলোচনা-সমালোচনা হলো বিস্তর। তবুও গ্রেটার নাম উঠল নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য। এখন প্রশ্ন হলো এই প্রতিবাদ, সমাজের ভ্রান্ত ধারণাগুলোকে পাল্টে নতুন বিপ্লব আনার চেষ্টা। গ্রেটা পেরেছে, একাকী। সবাই নয় কেন! জলবায়ু বদল এবং তার ভয়ঙ্কর পরিণতি যে বিশ্ববাসীর মাথার উপর যমদূতের মতো খাঁড়া ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেটা কেন বুঝতে পারছেন না অধিকাংশ মানুষ! পরিবেশবিদ থেকে মনোবিজ্ঞানী, এর কারণ ব্যাখ্যা করলেন নিজেদের মতো করে।

সমালোচকরা বলেছিলেন গ্রেটা থুনবার্গ অসুস্থ। মেনেও নিয়েছিলেন গ্রেটা। অটিজমের মতোই অ্যাসপারগার সিন্ড্রোম’ ছিল তার। এই রোগে সামাজিক যোগাযোগ স্থাপনে সমস্যা হয়। যেমন, কথা বলতে অসুবিধা, উল্টো দিকে থাকা মানুষের অভিব্যক্তি বুঝতে সমস্যা হয়।  নিজের দুর্বলতার দিকগুলোকেই ‘সুপারপাওয়ার’ করে নিয়েছিল গ্রেটা।

গ্রেটা থুনবার্গ

কূটনীতি দিয়ে নয়, বিশ্বকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাবার অঙ্গীকার নিয়েছিল সম্পূর্ণ মন থেকে, বিশ্বাসে ভর করে। দীর্ঘদিনের কোনও ধারণা বা বিশ্বাসকে আমুল বদলে দেওয়ার জন্য যে মনের জোর বা কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হয়, বর্তমান মোবাইল-ল্যাপটপ-ট্যাব চর্চিত মানুষজনের সেই লড়াই করার মানসিকতাই নেই। এই প্রসঙ্গে আমেরিকার গেম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট অব ফিউচারের ডিরেক্টর জেন ম্যাকগোনিগাল বলেছেন, ‘‘মানুষ নিজের চারপাশে একটা পাঁচিল তুলে দিয়েছে। নিজেকে নিয়েই বাঁচতে ভালোবাসে। মস্তিষ্কের গঠন পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে অন্যের ব্যাপারে ভাবার সময় মস্তিষ্কের স্নায়বিক ক্রিয়া অনেক কম অ্যাকটিভ থাকে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো মানুষ যদি নিজের বিপদ নিয়ে ভাবে, ভবিষ্যৎ চিন্তা করে তাহলে মস্তিষ্ক অনেক বেশি সচল থাকে।’’

জলবায়ুর বদল নিয়ে সচেতনতা এত কম কেন? কারণ কি চিন্তার বিবর্তন?

বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষের মস্তিষ্কের অ্যানাটমি বিশ্লেষণ করে এর কিছুটা আন্দাজ পাওয়া গেছে। ‘ফাংশনাল ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স’ (FMRIপ্রযুক্তিতে মস্তিষ্কের রক্ত সঞ্চালন ও স্নায়বিক ক্রিয়া পরীক্ষা করে দেখা গেছে, বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে মানুষের চিন্তাভাবনার একটা আশ্চর্যরকম বদল আসে। এই এফএমআরআই পদ্ধতিতে চৌম্বক ক্ষেত্রে ও বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহের তারতম্য তুলনা করা হয়। ইমেজে দেখা যায় ব্রেনের কোন অংশ বেশি সক্রিয় আর কোন অংশ কম। মস্তিষ্কের জেনেটিক ও নিউর‌্যাল বিন্যাসও জানা যায়। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, খুব কম মানুষ ছাড়া অধিকাংশেরই মেডিয়াল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’ (MPFC) (ব্রেনের একটা বিশেষ অংশ) শুধুমাত্র নিজের কথাই ভাবতে পছন্দ করে। যদি তার পরিবারের কথা বলা হয়, তাহলে এমপিএফসি সক্রিয় হয়ে ওঠে। আবার যদি বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপে বা মলদ্বীপে বিশ্ব উষ্ণায়ণের ফলে সমুদ্রের জলস্তর বাড়ছে, তাহলে এমপিএফসি কোনও সিগন্যালই পাঠাবে না।


জ্বলছে আমাজন

সমাজবিজ্ঞানী ওয়েন্ডেল বেল বলেছেন, ‘‘স্বার্থত্যাগ এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য ভাবনাচিন্তা মস্তিষ্কের একটা নির্দিষ্ট পথ ধরে চলে। সেই পথে কেউ পা বাড়ায়, কেউ বাড়ায় না। চিন্তার স্বচ্ছতা সকলের সমান হয় না। কেই আর পাঁচজনকে দেখে এগিয়ে আসে, আবার কেউ পুরোপুরি মুখ ঘুরিয়ে নিজের কাজে মন দেয়।’’ মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এটাই বর্তমান যুগে মানুষের চিন্তার বিবর্তন। ডিজিটাল-প্রিয় সভ্যতা একটা ধরাবাঁধা গতে চলতে বা ভাবতেই পছন্দ করে। গতানুগতিকতার বাইরে বেরিয়ে বিপ্লব ঘটানোর মানসিকতা তৈরিই হয়না। তার জন্য পরিবার, প্রতিপালন বা পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিও অনেকটাই দায়ী।

জলবায়ুর বদল হচ্ছে দ্রুত, মানুষ বুঝতেই পারছে না সতর্ক হওয়া উচিত..

এই প্রসঙ্গে হার্ভার্ডের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড্যানিয়েল গিলবার্ট বলেছেন, মানুষ যখন প্রথম পৃথিবীতে আসে তার নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে অনেকটাই সময় লেগেছিল। বিবর্তনের ইতিহাসও তাই বেশ লম্বা। তাই হঠাৎ করেই যদি তাকে বলা হয় পৃথিবী ধ্বংসের মুখে, ওঠো! জাগো! সচেতন হও! তাহলে এই পরিস্থিতির সঙ্গে যুঝতে তার অনেকটাই সময় লাগবে।

 গলছে হিমবাহ

আমেরিকার মনোবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদ ড্যানিয়েল কাহনেম্যান (নোবেল মেমোরিয়াল পুরস্কারপ্রাপ্ত) তাঁর ‘Thinking, Fast and Slow’ বইতে জানিয়েছেন, দ্রুত ঘটে চলা কোনও ঘটনা মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলতে অনেকটাই সময় নেয়। প্রসঙ্গত যদি বলা হয়, ভয়াল তাপপ্রবাহ ক্রমেই এগোচ্ছে গ্রিনল্যান্ডের দিকে। সে ক্ষেত্রে তীব্র গরমে বিপজ্জনক ভাবে গলতে শুরু করবে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম হিমবাহ। জলে ডুববে স্থলভাগ, সচেতন না হলে ২০৫০ সাল নাগাদ মানবজাতির ৯০ শতাংশই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে, তাহলেও অধিকাংশই ভাববেন এগুলো শুধুমাত্র খবরের জন্য। ২০ শতাংশ হয়তো আগ্রহ দেখাবেন সচেতনতার পথে এগোনোর। ড্যানিয়েল আরও জানিয়েছেন, বেশিরভাগেরই জলবায়ুর বদল সম্পর্কে জানার পরিধি অনেক কম।, জানার আগ্রহও কম। তাদের বসবাসের সীমিত গণ্ডিতে যদি কোনও বিপদ না ঘনায়, তাহলে তারা মাথা ঘামাতে রাজি নয়।

রাজনৈতিক চাপ ভাবনার অন্তরায়

২০১৫-র প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে ১৫০ দেশ গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমণ কমানোর জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তার কোনও প্রতিফলন নেই। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রনেতারা জলবায়ু তথা পরিবেশের এই ভয়ানক বিপদের কথা বুঝতেই পারেন না বলেও দাবি বিজ্ঞানীদের। তার অন্যতম উদাহরণ, বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমণকারী দেশ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পই প্যারিস চুক্তি থেকে তাঁদের দেশকে সরিয়ে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। জলবায়ুর পরিবর্তন নিয়ে কাজ করা সংস্থা ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড ফান্ডের অন্যতম মুখ্য বিজ্ঞানী ক্রিস ওয়েবার যেমন রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পর বলেছেন, ‘‘সম্ভব ও অসম্ভব নির্ভর করে রাজনৈতিক সদিচ্ছার উপর।’’

প্যারিস জলবায়ু সম্মেলন। ২০১৫ সাল

ট্রাম্প জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিকে উড়িয়ে দিয়েছিলেন কখনও স্রেফ ধোঁকা, কখনও বিজ্ঞানীর ছদ্মবেশে থাকা কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ষড়যন্ত্র বলে। স্পষ্ট বলেছিলেন যে ওবামার জলবায়ু সংক্রান্ত নীতি পাল্টে দেবেন, প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে আমেরিকার অংশগ্রহণ বাতিল করবেন ও উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে একটি ডলারও দেবেন না। এখন ট্রাম্প প্রশাসনের হর্তাকর্তারা এই পথেই অগ্রণী। পৃথিবীব্যাপী কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণে আমেরিকা এখন চিনের ঠিক পরে, মাথাপিছু নিঃসরণের হিসেবে ইউনাইটেড আরব এমিরেটস-এর পরে পরেই, আর ঐতিহাসিক নিঃসরণের কথা ধরলে সবার ওপরে। এমন দেশকে বাদ দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের সমাধান খোঁজাও অসম্ভব। ভয়ও আছে, ট্রাম্পের সঙ্গেই যদি চিন্তাশীল ব্যক্তিত্বরাও জলবায়ু চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়।

মানুষ নিজে থেকে উদ্দীপিত না হলে সচেতনতা সম্ভব নয়— ‘ডেথ অ্যান্ড দ্য আফটারলাইফ’-এ বলেছিলেন নিউ ইয়র্কের এথিসিস্ট স্যামুয়েল স্কেফলার..

স্যামুয়েল একটা ভালো উদাহরণ দিয়েছিলেন, ‘‘যদি বল হয় আগামী ৩০ বছরের মধ্যে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মানবজাতি ধ্বংস হবে, মুক্তির উপায় খোঁজা দরকার, তাহলে দেখবেন বেশিরভাগই আগ্রহী নয়। কারণ মানুষ বর্তমানে তার বেঁচে থাকাটাকে প্রাধান্য দেয়, আগামী দিনে কী ঘটতে চলেছে সেই ব্যাপারে তার উৎসাহ কম।’’

খরা কবলিত মহারাষ্ট্রের বিদর্ভ

রাষ্ট্রসংঘ নিয়োজিত ‘ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’ (আইপিসিসি)-এর বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিশ্ব উষ্ণায়ন ছিল শুধুই বিপদের আগাম পূর্বাভাস। এবার সরাসরি তার ফল ভুগতে শুরু করেছে মানবগ্রহ। বাদ নেই ভারতও। ইতিমধ্যেই দাবানলের আঁচে পুড়ে ছাই উত্তর সাইবেরিয়া, উত্তর স্ক্যান্ডিনেভিয়া, আলাস্কা, গ্রিনল্যান্ড, মেরুপ্রদেশের একটা বিশাল অংশ। গোটা জুলাইয়ে গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা লন্ডন-প্যারিসের। একে দাবানল, তার মধ্যে ব্রিটেন, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, জার্মানিকে পুড়িয়ে তাপপ্রবাহ এগিয়ে চলেছে মেরুপ্রদেশের দিকে। আবহবিদেরা বলছেন, শীঘ্রই এ গরমের আঁচ টের পাবেন নরওয়ে, সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের বাসিন্দারা। ৩ ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধি মানেই সমুদ্রের জলস্তর আধ মিটার উঁচু হবে, মেরুপ্রদেশের বরফ গলে নির্গত হবে মিথেন। বরফ না-থাকায় সূর্যের তাপ আর রশ্মি শুষে নেওয়ার উপায় থাকবে না। সুতরাং ধ্বংসের প্রাথমিক লীলা শুরু হয়ে গেছে। মানুষ সচেতন হবে কবে?

Comments are closed.