‘অ্যারোমান্টিক!’ প্রেম আছে কিন্তু অনুভূতি নেই, মনের এক বিচিত্র অবস্থায় ভুগছে মানুষ

রোমান্টিসিজম ভাষায় নয় ভাবনায় ফুটিয়ে তোলারই নাম। কিন্তু এই ভাবনাই যদি না থাকে! কবির ভাষায় মনের মাঝে প্রেমের রসের ধারাই যদি ঝরে না পড়ে তাহলে আর রোমান্টিসিজম কোথায়। প্রেম আছে অথচ এই অনুভূতি নেই, মনের এমনই এক বিচিত্র অবস্থা নিয়েই এখন ভুগছেন বহু মানুষ।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: মোর ভাবনারে কী হাওয়ায় মাতালো, দোলে মন দোলে অকারণ হরষে/ হৃদয়গগনে সজল ঘন নবীন মেঘে রসের ধারা বরষে ’…প্রেমের অনুভূতির হৃদয়চেরা ভাবনা লিখে গিয়েছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রেমে যদি মনে দোলাই না লাগে তাহলে সে প্রেম ব্যর্থ। রোমান্টিসিজম ভাষায় নয় ভাবনায় ফুটিয়ে তোলারই নাম। কিন্তু এই ভাবনাই যদি না থাকে! কবির ভাষায় মনের মাঝে প্রেমের রসের ধারাই যদি ঝরে না পড়ে তাহলে আর রোমান্টিসিজম কোথায়। প্রেম আছে অথচ এই অনুভূতি নেই, মনের এমনই এক বিচিত্র অবস্থা নিয়েই এখন ভুগছেন বহু মানুষ। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন অ্যারোমান্টিক।

    বয়স তখন বছর দশ। জোশি প্রথম অনুভব করেছিল সে বাকিদের থেকে অনেকটাই আলাদা। তার মনের অনুভূতিগুলো একটু ভিন্ন পথে দৌড়য়। তার মানে, ভালবাসা, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না নেই তা নয়। সবই আছে। কিন্তু ওই যে একটু আলাদা। এই আলাদাটা যে কী, সেটা বছর দশেকের মেয়ে বুঝতে পারেনি। এই অন্যরকম অনুভূতির সঙ্গে পরিচয় হয় যখন জোশি তরুণী। প্রেম আসে তাঁর জীবনে। সম্পর্ক তৈরি হয়। কিন্তু সেই যে ফুলের মতো নরম ভালবাসা, আপনজনকে জড়িয়ে আঁকড়ে ধরে সেই যে শিরশিরানি অনুভূতি, ভালবাসার ছোঁয়ায় ভেতর থেকে উঠে আসা মৃদু কম্পন, দুরন্ত হাওয়ায় ভেসে যাওয়ার বাসনা, সে সব কোথায়? সবই যেন যান্ত্রিক, গতানুগতিকতায় এগিয়ে চলা একটা শীতল সম্পর্ক। তাতে প্রাণ আছে কিন্তু উদ্দাম জোয়ার নেই।

    বয়স যখন ৪৬ বছর, মনোবিজ্ঞানীর কাছে গিয়ে জোশি জানতে পারেন তিনি অ্যারোমান্টিক (Aromantic) । অর্থাৎ যাঁর মধ্যে রোমান্টিসিজমই নেই। তার মানে জোশি যে কঠিন, নিষ্ঠুর একটা মানুষ তেমনটা নয়। তিনি ভালবাসতে জানেন। কিন্তু সঙ্গীর প্রতি যে রোমান্টিক অনুভূতি, সেই যে প্রেমের দোলা, তেমনটা অনুভব করতে পারেননা কিছুতেই। প্রেম থাকলেও তাকে মনে, আত্মায়, শিরায়-উপশিরায় মেখে নিয়ে তার গন্ধ বোঝার ক্ষমতা নেই জোশির। তাই তিনি অ্যারোমান্টিক।

    রোমান্টিক শব্দটা আমাদের আপন। রোমান্স মানেই একটা চনমনে মন, দুষ্টুমিষ্টি অনুভূতি। কিছুটা খোলা আয়নার মতো, বাকিটা গোপনে নিষিদ্ধ ভাবনার পাতায় লিখে রাখা কিছু অস্পষ্ট শব্দের মতো। যার ভাষা একমাত্র প্রেমিক মনই বোঝে। কিন্তু এই অ্যারোমান্টিক শব্দটা আমরা নিছকই কৌতুক করে ব্যবহার করি। যার প্রেমের প্রকাশ তেমন নেই, রূপকথার মতো করে অনুভূতির দরজা খুলে দিতে পারে না, তাদেরই অ্যারোমান্টিক বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ব্যাপারটা মোটেও তা নয়। এই অ্যারোমান্টিক হল মনের এমন এক বিচিত্র অবস্থা যেখানে ভাবনাগুলো বিভিন্ন কুঠুরিতে আলাদা আলাদা করে বন্দি। বাবা,মা, ভাই-বোন, বন্ধু, আত্মীয়দের প্রতি ভালবাসা আছে। আবেগও আছে কিন্তু ওই  রোমান্টিক ভাবনাটাই নেই। যৌন আকর্ষণ যে নেই সেটা জোর দিয়ে বলা যায়। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অ্যারোমান্টিকরা যৌন সম্পর্ক উপভোগ করেন কিন্তু যান্ত্রিকভাবেই। আবার অনেকের সেই অনুভূতিও থাকে না। সঙ্গীর ছোঁয়ায় কোনও শিহরণ জাগে না।

    মানুষের মন বড় বিচিত্র। বড়ই জটিল। তার গভীরতা মাপা প্রায় অসম্ভব। তাই রোমান্টিক ও অ্যারোমান্টিক মানুষদের মধ্যে ফারাক করা যায়না অনেক সময়েই। এমনকি অ্যারোমান্টিকরা নিজেরাও বুঝতে পারেন না তাঁরা মনের কোনও অবস্থার মধ্যে রয়েছেন। স্বাভাবিক, ব্যস্ত জীবনে, সেডেন্টারি লাইফস্টাইলের কারণে রোমান্টিক অনুভূতি হারিয়ে যাচ্ছে নাকি শুরু থেকে তাঁরা এমনই ছিলেন। ভাবনার বিকাশটা এতদিন পরে হয়েছে।

    এবার আসা যাক বিজ্ঞানের তথ্যে। প্রেম কতটা এবং ঠিক কেমন তাকে রোমান্টিক ওরিয়েন্টেশন (Romantic Orientation) দিয়ে ব্যাখ্যা করে থাকেন গবেষকরা। একে অ্যাফেকশনাল ওরিয়েন্টেশন (Affectional Oriention) বলে। রোমান্টিসিজমের উপর নির্ভর করে মানুষের মনের মতিগতি বোঝা হয় এই রোমান্টিক ওরিয়েন্টেশন দিয়ে। অর্থাৎ লিঙ্গভেদে মানুষের আচরণ কেমন, কোন লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ জন্মাচ্ছে, যৌন আকর্ষণ রয়েছে কিনা, সেটা আবার সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়।

    বিজ্ঞান বলছে, রোমান্টিসিজমের অনেক ভাগ। অ্যারোমান্টিক অর্থাৎ যাদের সঙ্গীর প্রতি বিশেষ আকর্ষণই নেই। যৌন ইচ্ছা থাকতেও পারে আবার নাও থাকতে পারে। সেটা নির্ভর করে। হেটারো-রোমান্টিক (Heteroromantic) যাদের রোমান্টিক ভাবনা বা আকর্ষণ থাকে বিপরীত লিঙ্গের প্রতিই। হোমো-রোমান্টিকরা (Homoromantic) একই লিঙ্গে আকর্ষণ অনুভব করেন। আবার এর বিপরীত বাইরোমান্টিক (Biromantic) যাঁরা উভয় লিঙ্কের প্রতিই আকর্ষণ অনুভূ করেন। এই বাইরোমান্টিকদেরই একটা ভাগ হল প্যানরোমান্টিক (Panromantic) যাঁরা যে কোনও কারও উপরেই আকর্ষণ অনুভব করতে পারেন, নারী বা পুরুষ বলে আলাদা লিঙ্গ ভাগ করেন না।

    মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অ্যারোমান্টিকরা যে জীবনে অখুশী হন তেমনটা নয়। অনেককেই দেখা গেছে সুখী সম্পর্কে রয়েছেন। অথচ তাঁরা নিজেরা বলেন যে, রোমান্সের বিশেষ মুহূর্তেও কোনও আলাদা অনুভূতি আসে না তাঁদের। ভালবাসায় টান পড়ে না তাতে, তবে প্রেমের সময় মন যে রূপকথার নেশায় ভাসতে চায় সেই অনুভূতিটা শুধু থাকে না। এই অ্যারোমান্টিকরা আবার কিছু ক্ষেত্রে রোমান্টিক হয়ে উঠতে পারেন। সেটাও মনের একটা বিচিত্র অবস্থা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অনুভূতিটা দেখা গেছে ডেমিরোমান্টিক (Demiromantic) বা গ্রেরোমান্টিকদের (Greyromantic) ক্ষেত্রে। ডেমিরোমান্টিকরা তখনই রোমান্টিক হতে পারেন যখন তাঁরা সম্পর্কে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন। অথবা সঙ্গীর সঙ্গে মনের টান তৈরি হয়। নিরাপত্তাহীনতা থাকে না। গ্রেরোমান্টিকরা আবার কোনও বিশেষ মুহূর্তেই রোমান্টিক হতে পারেন। সেটা পরিবেশ, পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে। এই ভাবনাটা তাঁদের হঠাৎ করেই আসে আবার আচমকাই চলে যায়।

    অ্যারোমান্টিক মানেই যে অ্যাসেক্সুয়াল হবে তেমনটা নাও হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মনের অনুভূতির বিকাশ না হলেও সুস্থ, যৌন সম্পর্কে থাকতে পারেন অ্যারোমান্টিকরা। সেক্ষেত্রে তাঁদের শরীরের চাহিদা থাকে, কিন্তু মনের টান থাকে না।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More