বাচ্চারা কি মিড ডে মিল খেল, পড়া ঠিক বুঝলো? এই চিন্তাতেই অবসরের পরেও রোজ স্কুলে লক্ষ্মী স্যর

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: স্কুলের গেট পেরিয়ে ছোট্ট উঠোনটাতে পা রাখতেই মনটা ভালো হয়ে যায় লক্ষ্মীকান্ত বাবুর। লক্ষ্মীকান্ত মণ্ডল। স্কুলেরই প্রধান শিক্ষক ছিলেন এক সময়। এখন প্রাক্তন। তবে এই ‘প্রাক্তন’ কথাটা শুধুমাত্র সরকারি খাতায়। স্কুলের দায়িত্ব আজও তাঁর কাঁধেই। অবসর নিয়েছেন এক বছর হলো। কিন্তু স্কুলে আসা ছাড়েননি। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে তাঁর যেন নাড়ির টান। শিক্ষক নয় তিনি যেন বাবা। স্নেহ দিয়ে আগলান আবার শাসনও করেন। আজ, শিক্ষক দিবসের দিনে পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত এলাকার এমনই এক স্যরের নাম উঠে এল খবরের শিরোনামে।

‘‘বাচ্চারা ঠিক মতো মিড ডে মিল খাচ্ছে তো? প্রার্থনা লাইনে দাঁড়িয়ে কে ঘুমিয়ে পড়ছে? ইংরাজি গ্রামার কে মুখস্থ করতে পারছে না?’’ কচিকাঁচাদের চিন্তাতেই দিন শুরু হয় এই শিক্ষকের। বাড়ি ফিরেও নিশ্চিন্ত নন। ‘‘বাচ্চারা ঠিকমতো পড়তে পারছে তো! আসলে গ্রামের স্কুল তো, বাড়িতে পড়া দেখিয়ে দেওয়ারও কেউ নেই,’’ কালো ফ্রেমের চশমার আড়ালে একজন শিক্ষক নয়, ঠিক যেন মমতামাখা বাবার মুখ ভেসে উঠল। চোখের কোণেও কি জল?

‘দ্য ওয়াল’কে লক্ষ্মীকান্ত বাবু বললেন, ‘‘চার বছর হলো স্ত্রী মারা গেছেন। আমি নিঃসন্তান। স্কুলের বাচ্চারাই আমার ছেলেমেয়ে। তাই ওদের কথাই ভাবি সারাক্ষণ। অবসর নেওয়ার পরেও বাড়িতে বসে থাকতে পারিনি। ছুটে গেছি স্কুলে।’’

পুরুলিয়ার আমডিহা এলাকার প্রাথমিক স্কুল। নাম শিশু শিক্ষা কেন্দ্র। পড়ুয়ার সংখ্যা তিনশোরও বেশি। আগে ঠিক এমনটা ছিল না, জানিয়েছেন লক্ষ্মীকান্ত বাবুর সহকর্মীরা। আগে বাচ্চারা আসত মিড ডে মিলের লোভে। এখন প্রিয় স্যরের ক্লাস করতেই স্কুলে ছুটে আসে ছেলেমেয়েরা। তাই পড়ুয়ার সংখ্যাও বেড়েছে অনেকটাই। শিক্ষক জনা দশ। তবে কেউ ছুটি নিলে তাঁরও ক্লাসও লক্ষ্মীকান্ত বাবুই করে দেন। তাঁর ছুটি নেই, অবসরের ভাবনাও নেই। পড়ানোটাই যেন তাঁর জীবনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে। তাঁর ভাবনা, স্বপ্ন, ভবিষ্যত চিন্তা সব কিছুই পড়ুয়াদের ঘিরে।

‘‘আমাদের প্রিয় লক্ষ্মী স্যর। বাচ্চারা বলে মাস্টারমশাই, উনিই সব দেখাশোনা করেন এখনও,’’ বলেছেন স্কুলেরই অন্য এক শিক্ষক। শিশু শিক্ষা কেন্দ্রের সঙ্গে লক্ষ্মীকান্ত বাবুর সম্পর্ক জোড়ে ১৯৮৩ সালে। স্কুল তখন আড়ে বহরে এতটা বাড়েনি। ১৯৯৯ সালে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই স্কুলের ভোল পাল্টে দিয়েছেন লক্ষ্মী স্যর। পড়ুয়ারা এখন আর ছন্নছাড়া নয়, বরং অনেক বেশি শৃঙ্খলাবদ্ধ। সকাল সাড়ে ১০টা বাজতেই স্কুলে চলে আসেন ‘মাস্টারমশাই।’ প্রার্থনা সঙ্গীত থেকে মিড ডে মিলের খাবার, সবদিকেই তাঁর কড়া নজর। খাবারের পাতে কী পড়ছে, সেটাও দেখার দায়িত্ব তাঁরই।

স্কুলের বর্তমান টিচার-ইন চার্জ রমা গুপ্ত বলেছেন, ‘‘আত্মকেন্দ্রিক জীবনে তিনি ব্যতিক্রমী। তাঁর মতো মানুষ খুবই কম দেখা যায়। স্কুলের ইট-কাঠ-পাথর তাঁর হাতের তালুর মতো চেনা। স্কুলই যেন তাঁর জীবন। মাস্টারমশাই আমাদের পুরুলিয়ার গর্ব।’’ আর কচিকাঁচাদের কাছে? মাস্টারমশাইকে তারা বলে ‘মুশকিল আসান।’ তাঁর কাছে নাকি যে কোনও সমস্যারই সমাধান থাকে। সে পড়ার বই হোক বা ব্যক্তিগত বিষয়।

লক্ষ্মীকান্ত বাবু মনে করেন তাঁদের ভিতর থেকে যে আবেগটা আসে, সেটাই তো স্বাভাবিক। সব শিক্ষকেরই এই আবেগ থাকাটা ভালো। তাঁর যতদিন শরীর দেয়, তিনি পড়িয়ে যাবেন। শিক্ষাদান করার মধ্যে যে আনন্দ, তার সবটুকুই তিনি প্রতি মুহূর্তে অনুভব করেন। তাই বয়সের গণ্ডি তাঁকে থামিয়ে দিতে পারেনি। আর কখনও পারবেও না।

আরও পড়ুন:

অবসরের পরেও স্কুলে আসা ছাড়েননি শিক্ষক

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More