বৃহস্পতিবার, মার্চ ২১

দুই সুব্রতর কিসসা: একজন গেলেন, একজন এলেন

শঙ্খদীপ দাস

আজ নয়, ২০১৭ সালের পুজোর পর থেকেই সুব্রত বক্সীর মাথায় নতুন জেদ চেপেছিল। নাহ, আর লোকভায় প্রার্থী হতে চান না তিনি। দক্ষিণ কলকাতা লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ ছিলেন তিনি। দিদির ঘরের আসন। তাই কদরই আলাদা। তবু তৃণমূল রাজ্য সভাপতি তখন থেকেই দিদি-র কানে কানে জানিয়ে দিয়েছিলেন, আর আমাকে জোর করবে না কিন্তু। সেখানেই থামেননি ‘বক্সীদা’। দলের দিদির যাঁরা ঘনিষ্ঠ বৃত্তে রয়েছেন, তাঁদেরও তাঁর ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। যাতে ঘুরে ফিরে দিদির কানে যায়।

শেষ পর্যন্ত সেই জেদই বজায় রাখলেন তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি। এবং দলের কোনও নেতার জেদের কাছে এই প্রথম হয়তো পরাজয় স্বীকার করে নিতে হল দিদিকেও। কারণ, মাঝে এক আধ বার জোরাজুরি করার চেষ্টা হতেই গলা খাঁকারি দিয়ে নাকি বক্সীবাবু জানিয়ে দিয়েছিলেন, তা হলে রাজনীতিই ছেড়ে দেব কিন্তু। ফলে বাধ্য হয়েই দক্ষিণ কলকাতা লোকসভা কেন্দ্রে সুব্রত বক্সীর পরিবর্তে নতুন প্রার্থীর সন্ধানে নামতে হয় মমতাকে। তার পর অনেক বাছ বিচারের পর কলকাতা পুরসভার চেয়ারম্যান মালা রায়কে বেছে নেন দিদি। তবে তৃণমূল শীর্ষ সূত্রের খবর, মানস ভুঁইয়ার জায়গায় রাজ্যসভায় যাবেন বক্সী। কারণ তৃণমূল জানিয়ে দিয়েছে, লোকসভা ভোটে মেদিনীপুর আসনে প্রার্থী হবেন মানস ভুঁইয়া।

এক সুব্রত যখন এ ভাবেই লোকসভা থেকে বিদায় নিলেন, তখন লোকসভা ভোটে তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় ঢুকে পড়লেন আরেক সুব্রত। তিনি পঞ্চায়েত ও জল সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায়। এবং তাঁর ব্যাপারটাও অদ্ভুত। চাইলে সংসদীয় রাজনীতিতে অনেক আগেই পা রাখতেন পারতেন একদা কংগ্রেসের দোর্দণ্ড প্রতাপ এই নেতা। কিন্তু সুব্রতবাবু বরাবরই মনে করতেন, বিধায়ক হিসাবে মানুষের জন্য যা কাজ করার সুযোগ রয়েছে, তা সাংসদ হিসাবে নেই। গতকালও এই প্রতিবেদককে ফোনে এ কথা জানিয়েছেন সুব্রতবাবু। তবে তিনি বাঁকুড়া থেকে প্রার্থী হচ্ছেন কি না প্রশ্ন করা হলে, বেমালুম অস্বীকার করে বলেছিলেন, “বিশ্বাস করুন আমি তো শুনেই আকাশ থেকে পড়ছি। অফিসিয়ালি, আন অফিসিয়ালি আমাকে কেউই বলেনি। না মমতা, না অভিষেক”।

সুব্রত বক্সী যে প্রার্থী হবে না, এ কথা ভাবেননি দলের দক্ষিণ কলকাতার কর্মীরাও। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করার ঘণ্টা খানেক আগেই কিছু অত্যুৎসাহী সমর্থক বেহালায় দেওয়ালে লিখে দেন বক্সীদার নামে। পরে অবশ্য সেই নামেই চুনকাম করতে হয়।

বস্তুত, সুব্রত বক্সী যে প্রার্থী হতে চাইছেন না এবং সুব্রত মুখোপাধ্যায় যে বিধানসভা ছেড়ে লোকসভায় যেতে চাইছেন, তা একমাত্র দ্য ওয়াল সবার আগে জানিয়েছিল। দু’টি প্রতিবেদনই ছিল ওয়ালের এক্সক্লুসিভ খবর।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, যে সুব্রতবাবু মনে করতেন সাংসদদের তুলনায় বিধায়কই মানুষের জন্য বেশি কাজ করতে পারেন, তিনি কেন লোকসভায় প্রার্থী হতে রাজি হলেন?

এর উত্তর সন্ধান করতে গেলে ফিরে যেতে হবে কয়েক মাস আগে। যখন মন্ত্রিসভার রদবদল করে সুব্রতবাবুকে জন স্বাস্থ্য ও কারিগরী দফতর থেকে সরিয়ে দেন মমতা। পঞ্চায়েত দফতর তাঁর কাছেই রেখে দেওয়া হয়, সঙ্গে তাঁকে দেওয়া হয় জল সম্পদ উন্নয়ন দফতর। তখন থেকেই মন্ত্রিসভার কাজে এক প্রকার মন উঠে যায় সুব্রতবাবুর। তা ছাড়া ঘনিষ্ঠ মহলে তিনি বলেন, বিধানসভায় তাঁর চলতি মেয়াদ শেষ হলেও সংসদীয় রাজনীতিতে পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হবে না। এক বছর কম থাকবে। কিন্তু এ বার লোকসভা ভোটে প্রার্থী হলে ২০২৪ সালের মধ্যে সংসদীয় রাজনীতিতে পঞ্চাশ পূর্ণ হয়ে যাবে। তার পর রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে নেবেন তিনি।

এই সাত পাঁচ অঙ্ক কষে সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকেই গোড়ায় বার্তা দেওয়া হয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। বাঁকুড়া লোকসভা কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন সুব্রতবাবু। কারণ, জনস্বাস্থ্য কারিগরী দফতরের মন্ত্রী হিসাবে বাঁকুড়ায় জলপ্রকল্প শুরু করার ব্যাপারে গত কয়েক বছরে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। অভিষেক বাঁকুড়ার পর্যবেক্ষক। তাই বার্তা যায় তাঁর কাছেও। কিন্তু জানুয়ারি মাসে হঠাৎ কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়েন সুব্রতবাবু। তাই তখন প্ল্যান কিছুটা ধাক্কা খায়। কিন্তু তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় অভিষেকের তরফে। যুব তৃণমূল সভাপতির বাড়িতে তাঁর সঙ্গে প্রায় দেড় ঘণ্টা বৈঠক করেন সুব্রতবাবু। তার পর তাঁকে প্রার্থী করার ব্যাপারে দিদিকে রাজি করান অভিষেকই।

ঘটনা হল, বাঁকুড়া লোকসভা কেন্দ্রে গত ভোটে যখন মুনমুন সেনকে প্রার্থী করেছিলেন মমতা, তখন মুনমুনকে হাত ধরে ওই নির্বাচন কেন্দ্র চিনিয়ে দিয়েছিলেন সুব্রতবাবু। দূরদর্শনে ‘চৌধুরী ফার্মাসিউটিক্যালস’ সিরিয়ালে মুনমুনের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়। বাঁকুড়ায় মুনমুনের ইনিংস শেষ হয়েছে, সুব্রতবাবু ভোটে জিতে ইনিংস শুরু করতে পারেন কি না এখন সেটাই দেখার।

আরও পড়ুন:

চ্যালেঞ্জের ভোটে কোনও ঝুঁকি নয়, প্রায় অর্ধেক আসনেই প্রার্থী বদলালেন নেত্রী

Shares

Comments are closed.