শুক্রবার, জুলাই ১৯

বেচা মান্না এসে ধান রুইয়ে গেল, দিদি এসে দেখে যান সিঙ্গুরে কেমন চাষ হচ্ছে!

দ্য ওয়াল ব্যুরো:  সিঙ্গুর নিয়ে বিধানসভায় কৃষিমন্ত্রী আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, ওই জমিতে ধান, গম, আলু, কলা, ভুট্টা চাষ হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সমর্থনে বললেন, একটু কমেছে চাষের পরিমাণ ঠিকই, তবে চাষ হচ্ছে। জমি চাষযোগ্য করে দেওয়া হয়েছে। এই সব দাবিদাওয়া বুধবারের।

বেশি-কম তো দূরের কথা, সিঙ্গুরের বাস্তব ছবিটা তো একেবারে উল্টো। কৃষিমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর এমনতর দাবি শুনে, বৃহস্পতিবার সকালে দ্য ওয়াল-এর ক্যামেরার সামনে ক্ষোভের জ্বালামুখ খুলে দিয়েছেন সিঙ্গুরের কৃষকরা। কী বলছেন তাঁরা আসুন দেখে ও শুনে নেওয়া যাক —

সিঙ্গুরের ওই জমিতে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে চার-পাঁচজন কৃষক হাতে তুলে নিলেন পাথরের চাঁই। আর বললেন, “এই জমিতে চাষ হয়? উনি জানেন চাষ করতে গেলে কেমন জমি লাগে?

তারপর এক এক করে নিজেদের কথা জানালেন তাঁরা। ভাষায় সামান্য ফারাক থাকলেও বক্তব্য হুবহু এক। সিঙ্গুর আন্দোলনের সময়ে এঁদের কেউ ছিলেন ‘ইচ্ছুক’, কেউ বা ‘অনিচ্ছুক’। এখন অবশ্য ইচ্ছুক-অনিচ্ছুক মিলেমিশে একাকার। এবং বেকার। কারখানা হওয়ার সময়ে কাজ পেয়েছিলেন যাঁরা, সব চুকেবুকে যেতে এখন তাঁরা ফ্যা ফ্যা করে ঘুরছেন।

রামপদ সাহানা- দিদি যে এ সব বুলি আওড়াচ্ছেন, সব ভাঁওতা। মাটি থেকে পাথর বেরোচ্ছে, বালি বেরোচ্ছে। এখানে কি চাষ করা যায়? বলছেন চাষযোগ্য করে দিয়েছেন। এটা চাষযোগ্য জমি? আগে তো জমি বন্টন করতে হবে। তারপর তো চাষিরা চাষ করবে। শিল্পের জন্য জমি দিয়েছিলাম। আর যারা জমি দেয়নি, তারা ১৬ কিলো করে চাল পাচ্ছে, দু’হাজার করে টাকা পাচ্ছে। এগুলো কার টাকা? এ তো জনগণের টাকা। দিদি কি পকেট থেকে দিচ্ছেন নাকি?

চিত্তরঞ্জন সামন্ত- টাটা কারখানা তৈরি করতে যা খরচ হয়েছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার তার থেকে কয়েক গুণ টাকা বেশি খরচ করে ফেলেছে। তবু জমি চাষযোগ্য হয়নি। আমরা চাই টাটা আসুক। না হলে অন্য কেউ শিল্প করুক। যাতে আমার ছেলে-নাতিরা করে খেতে পারে।

সুকুমার আদক- ১০০ দিনের কাজে উলুবন পরিষ্কার হচ্ছে, আবার ঘাস গজিয়ে যাচ্ছে। বড় বড় কথা বললে হবে! এসে দেখে যাক। ওখানে এসে সর্ষে ছড়িয়ে গেল, বেচা মান্না এসে লুঙ্গি তুলে ধান রুইয়ে গেল। কোথায় কী? আমরা চাই শিল্প হোক।

ভুবন বাগুই- নবান্ন থেকে বা তৃণমূল ভবন থেকে বলে দিয়ে ডিএম-কে দিয়ে কমিটি গড়লে হবে না। স্থানীয় লোককে নিয়ে কমিটি গড়তে হবে। না হলে তিন বছর কেন, তিরিশ বছর কেটে গেলেও এ জমিকে চাষ যোগ্য করা যাবে না।

অরিজিৎ মণ্ডল- বিধানসভায় বসে রাজার মাকে ডাইনি বললে হবে না। এসে দেখে যাক মুখ্যমন্ত্রী। ভোটের সময়ে সিঙ্গুরে আসার হিম্মত হল না? আমাদের সবাই বোকা বানায়। ভবিষ্যতেও বানাবে। তবে যে দল শিল্প করবে আমি সেই দলের পিছনেই ছুটব। আমার কাজ দরকার কাজ।

বিফল বাঙাল- টাটা কারখানার জমি চাষ করার মতো পরিস্থিতি নেই। কেউ কোনও দিন করতেও পারবে না। এখন সবাই চায় এখানে শিল্প হোক। কিছুটা অংশে চাষ করে ওটাকেই বারবার দেখানো হচ্ছে। কিন্তু আমরা যে পরচা পেয়েছি, সেখানে চাষ অসম্ভব।

২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল, বামফ্রন্ট সরকারের জমি অধিগ্রহণে প্রক্রিয়াগত গলদ ছিল। তাই জমি ফিরিয়ে দিতে হবে। বিজয়োল্লাসে মেতেছিল সিঙ্গুর। সবুজ আবির আর ব্যান্ডপার্টির আওয়াজে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে মিছিল করেছিলেন বেচারাম মান্না, শিউলি মান্নারা। তারপর জমি ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু করে সরকার। ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয় ন্যানো কারখানার শেড। শুরু হয় জমি চাষযোগ্য করার কর্মযজ্ঞ।

তখনই প্রশ্ন উঠেছিল, এই জমিতে কি আদৌ চাষ করা সম্ভব? বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, মাটির যতটা গভীরে কংক্রিটের ঢালাই করে কারখানা গড়ে উঠেছিল, তা উপড়ে কখনওই চাষ করা সম্ভব নয়। তবু সিঙ্গুরের আশা ছিল, হয়তো হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গিয়ে সর্ষে বীজ ছড়িয়েছিলেন।

কিন্তু সময় এগিয়েছে আর শাসকদলের প্রতি বিরাগ বেড়েছে সিঙ্গুরের। ২০০৮-এর পঞ্চায়েত থেকে ১৮-র পঞ্চায়েত, এক দশক ধরে সিঙ্গুর হাত উপুড় করে ভোট দিয়েছিল তৃণমূলকে। কিন্তু ১৯-এর লোকসভাতেই উল্টে যায় ঘুঁটি। ব্যাপক ভোটে লিড পায় বিজেপি।

আর আজ সেই সিঙ্গুরেরই বহু মানুষ বলছেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি ভগবান? যে পাথরে ফুল ফোটাবেন?”

Comments are closed.