শনিবার, আগস্ট ২৪

কাঠের ফ্রেমে উমা, থিম পুজোয় আফ্রিকার পুতুল, বিশ্ববাংলার জন্য মূর্তি গড়ছেন কাটোয়ার কাঠ শিল্পী অক্ষয়

দ্য ওয়াল ব্যুরো: হাতে সময় গোনা গুনতি। কাটোয়ার অগ্রদ্বীপের কাঠ শিল্পী অক্ষয় ভাস্করের বাড়িতে কান পাতলেই এখন শোনা যাবে কাঠের ঠকাঠক শব্দ। কাঠের টুকরোর উপর বাটালি দিয়ে খোদাই করে কখনও ফুটিয়ে তুলছেন লক্ষ্মীর পেঁচা, কখনও একই ফ্রেমে নিখুঁত গড়নে সপরিবার দুর্গা। থিম পুজোর জন্য আবার রয়েছে কাঠের তৈরি আফ্রিকার পুতুল। সময় যে বড় অল্প! পুজোর দিন সাতেক আগেই বিশ্ববাংলার হাতে তুলে দিতে হবে নয় নয় করেও ৬০টি কাঠের দুর্গা।

কাটোয়ার অগ্রদ্বীপের স্টেশনের কাছেই অক্ষয় ভাস্করের স্টুডিও। সেখানে এ বার কাঠ খোদাই করে তৈরি হচ্ছে দুর্গা প্রতিমা। প্রতিবারই হয়। তবে এ বারের ব্যস্ততা অনেক বেশি। কাঠের প্রতিমা বানানোর বরাত দিয়েছে খোদ রাজ্য সরকারের বিশ্ববাংলা। প্রস্তুতির তাই অন্ত নেই। শিল্পীর কথায়, “রাজ্য সরকারের বিশ্ববাংলা বিপণির জন্য আমার ভাগ্য খুলে গেছে। কাজের খুব একটা অভাব নেই আর। এতগুলো অর্ডার শেষ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।”

ভাগ্যের চাবি খোলে কলকাতায় এসে। সরকারি উদ্যোগে হস্তশিল্প মেলায় অক্ষয় ভাস্করের কাঠের পুতুল দেখে মন মজে সরকারি কর্তাদের। তার পরেই নম্বর জোগাড় করে ফোন। শিল্পী জানিয়েছেন, প্রথমে বুঝতে পারেননি। পরে বিশ্ববাংলার তরফ থেকে ফোন করা হয়েছে শুনে প্রায় অজ্ঞানই হয়ে যাচ্ছিলেন। বলেছেন, ফোনে আমাকে বলা হয় কাঠের দুর্গা কিনতে চায় রাজ্য সরকার। ৬০ পিস তৈরি করে পাঠিয়ে দিতে হবে। বাকিটা বিস্তারিত ইমেল করা হয়।“  তিন ফুট চওড়া ও দেড় ফুট উচ্চতার প্রতিটি প্রতিমা ওজনে প্রায় সাত কিলোগ্রাম। তাই দামও দেওয়া হবে খাসা। প্রতিটি মূর্তির জন্য সাত হাজার টাকা। তার মানে ৬০টি মূর্তির দাম.. আর ভাবতে চান না অক্ষয় ভাস্কর। সময় খুব কম।

‘পুতুল নেবে গো পুতুল’! বছর কুড়ি আগেও এই গান গেয়ে গ্রামে কাঠের পুতুল বিক্রি করতেন কাটোয়ার অগ্রদ্বীপ ও তার পাশে নতুনগ্রামের শিল্পীরা। গ্রামীণ মেলায়ও তাঁদের দেখা মিলত। পুতুল বলতে পেঁচা, খুব বেশি হলে গৌরাঙ্গ। দুর্গাপুজো তখন কাঠশিল্পীদের কাছে আনন্দের বদলে বিষাদের বার্তাই বয়ে আনত। নব্বই দশকের শেষের দিক থেকে কলকাতার পুজোয় এল ‘পরিবর্তন’। জায়গা করে নিল ‘থিম পুজো’। পুজোকর্তারা নতুন নতুন ভাবনা নিয়ে সামঞ্জস্যপূর্ণ মণ্ডপ তৈরি করাতে শুরু করলেন। আর এই থিম পুজোর হাত ধরেই চাহিদা বাড়তে থাকল কাঠের পুতুল তৈরির কারিগরদেরও।

আফ্রিকার পুতুল

কাঠ শিল্পীদের মধ্যে অক্ষয় ভাস্করকে এক ডাকে চেনেন এলাকাবাসী। বলেছেন, ইন্টারনেট ঘেঁটে নানা নকশা, নানা গড়ন, ভঙ্গিমার পুতুল গড়েন তিনি। একই ফ্রেমে দুর্গা প্রতিমার সাজসজ্জাতেও থাকে বৈচিত্র্য। তাই তাঁর হাতের পুতুল বরাবরই ব্যতিক্রমী।

বছর তিনেক আগেও কলকাতা ঘুরে অর্ডার নিয়ে আসতেন বিভিন্ন দোকান থেকে। তারপর সারা মাসে সেই অর্ডারের কাজ শেষ করে দোকানে দোকানে পৌঁছে দিতেন। তাতে সংসার চললেও সঞ্চয় তেমন হত না। রাজ্য সরকারের বিশ্ব বাংলার দৌলতে তাঁর হাতে কাজ যেমন বেড়েছে, তেমনই বেড়েছে আয়ও। রাজ্য সরকারের ডাক পড়ার পর থেকে তাঁর সম্মান ও কদর অনেকটাই বেড়েছে। এখন নানা জায়গায় প্রতিমা গড়ার ডাক পড়ছে তাঁর। আপ্লুত অক্ষয়ের কথায়, “ভাগ্যিস সে দিন আফ্রিকার পুতুল বানিয়ে মেলায় নিয়ে গিয়েছিলাম। না হলে আমার শিল্প প্রতিভা বিশ্ববাংলার কাছে তুলে ধরতে পারতাম না।”

Comments are closed.