সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৩

দিদি দেখুন: মাথায় সাইকেল, পরনে গামছা, বছরের পর বছর ঝুঁকির পারাপার অজয়ে, পাকা সেতু হবে কবে?

দ্য ওয়াল ব্যুরো: এ পারে বর্ধমান। ও পাড়ে বীরভূম। মাঝখান দিয়ে বয়ে গিয়েছে অজয় নদ।

পারাপারের ভরসা আগে ছিল একফালি কাঁকুরে জমি। ভরা বর্ষায় নদের জল সেটা ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। অগত্যা উপায় জল ডিঙিয়ে এ পার থেকে ও পাড়। লজ্জার মাথা খেয়ে শাড়ি-কাপড় গুটিয়ে বা গামছা পরেই চলে পারাপার। বর্ষায় ফুলে ফেঁপে ওঠা অজয়ের জলে তলিয়ে গিয়ে কত যে দুর্ঘটনা ঘটে, তার আর হিসেব রাখতে পারেননি দুই জেলার বাসিন্দারাই। দশকের পর দশক যায়। প্রতি বারই অস্থায়ী রাস্তা তৈরি হয়। আর প্রতি বছর বর্ষাতেই তা ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যায়।

পশ্চিম বর্ধমানে জামুড়িয়া থানার দরবারডাঙ্গা, বীর কুলটি, সিদ্ধপুর অজয় নদের এক পাড়ে। অন্য পাড়ে, সিউড়ি, খয়রাশোল। দু’পাড়ের বাসিন্দাদের অভিযোগ, অজয়ের উপর পাকা সেতু তৈরির জন্য দুই প্রশাসনের সব স্তরেই বার বার আর্জি জানানো হয়েছে। তবে লাভ হয়নি। এ দিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-সহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক নানা ক্ষেত্রেই দুই জেলা একে অপরের নির্ভরশীল। সমস্যা তাই একেবারে নাকের ডগায় বসে রয়েছে। বছরের পর বছর প্রাণ হাতে করেই নদী পেরোতে হচ্ছে পশ্চিম বর্ধমান এবং বীরভূম জেলার হাজার হাজার মানুষকে। বাদ যাচ্ছে না মহিলা ও শিশুরাও।

“পেটের টান বড় টান। রোজ কাজের জন্য বীরভূমে যেতে হয়। বর্ষাকালে নদী পার হতে ভয় লাগে। কাজে যেতে পারিনা সবদিন। দেখুন না, গামছা পরে নদী পার হতে হচ্ছে,” জামুড়িয়ার এক বাসিন্দা জানালেন, ফি দিন একই ভাবে নদী পার হতে হচ্ছে। মহিলাদের কষ্ট আরও বেশি। কখনও বাঁশের ভেলায় তুলে দেওয়া হয় মহিলা ও শিশুদের। তবে নদের জল সব জায়গায় সমান নয়। কোথাও গলা জল, তো কোথাও জল হাঁটুর নীচে। তাই নৌকা বা ভেলা চালানো সম্ভব হয় না সব জায়গায়। “আমাদের অফিস, স্কুল সবই বর্ধমানে। রোজকার খাবার ব্যবস্থাও সেখানে। স্বাস্থ্য কেন্দ্র, হাসপাতালের জন্য আসানসোল মহকুমার রানীগঞ্জ দুর্গাপুরে যেতে হয়। পেটের টানেই প্রাণের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে,”অভিযোগ বীরভূমের বাসিন্দাদের।

বীরভূমের খয়রাশোলে চাষাবাদ ভালোই হয়। তাই ওই পাড়ে আনাজপাতি নিয়ে যেতে পারলে, দু’পয়সা বেশি লাভের মুখ দেখতে পান পশ্চিম বর্ধমানের চাষিরা। আনাজের বড় বড় ঝুড়ি মাথায় রোজ এতটা জল পার হওয়া কি সম্ভব হয়?  চাষিদের কথায়, কেউ সাইকেল ঘাড়ে তুলে, কেউ বস্তা পিঠে চাপিয়ে যাতায়াত করে। স্থায়ী সেতু হলে দুই পাড়েই আনাজ ও চালের দাম অনেকটা কমবে। সুবিধা হবে বীরভূমের চাষিদেরও। সে ক্ষেত্রে তাঁরা জামুড়িয়া, আসানসোল-সহ পশ্চিম বর্ধমানের বড় বাজারগুলিতে সহজেই আসতে পারবেন।

অজয় নদের উপর স্থায়ী সেতুর দাবি বহু বছরের। ভোট আসে, ভোট যায়, প্রতিশ্রুতির পাহাড় জমে, কিন্তু লাভের খাতায় আঁচড় পড়ে না। দুই জেলারই অভিযোগ, বর্ষাকালে চার মাস বাদে অজয় নদে জলস্তর কমলে হিউম-পাইপ, মোরাম-বোল্ডার দিয়ে তার উপর অস্থায়ী রাস্তা তৈরি করা হয়। কিন্তু বর্ষার শুরুতেই ওই রাস্তা ভেসে যায়। তখন  যাতায়াতের একমাত্র ভরসা নৌকা। কিন্তু বর্ষায় অজয়ের ভয়াল রূপ উপেক্ষা করে কখনও কখনও নৌকা চালানোও সম্ভব হয় না। এ বারও লাগাতার বৃষ্টিতে টইটম্বুর অজয়ে নৌকা চালানো সম্ভব হয়নি। আবার জল অনেকটা কমে গেলেও নৌকা চালানো যায় না। দুর্ভোগ হয় তখনও।

পাকা সেতুর অভাব ছাপ ফেলেছে উৎসব-অনুষ্ঠানেও। জয়দেব কেঁদুলি মেলার সময় বর্ধমান থেকে হাজার হাজার লোককে বীরভূমে আসতে হয়। দুর্ভোগ একটাই, পেরতে হয় অজয়। বাসিন্দাদের দাবি, সেতু তৈরি হলে বর্ধমান ও বীরভূম তো বটেই— পুরুলিয়া, বাঁকুড়ার একাংশের মানুষও উপকৃত হবেন। দিদি যদি একটু দেখেন!

Comments are closed.