বুধবার, নভেম্বর ১৩

‘রাবণ কেটেই তো পেট ভরে আমাদের!’ রাঢ় বাংলার ‘দশেরা’ হারিয়ে যাওয়া লোকশিল্পীদের পার্বণ

দ্য ওয়াল ব্যুরো: আনাজপাতির ঠেলাটা আজ আর বার করেনি রঞ্জিত গড়াই। সকাল থেকে কালো মুখোশটা ভালো করে ঝেড়েঝুড়ে রেখেছে। জাম্বুবান সাজতে হবে। আজই যে দ্বাদশী! রাবণ বধের দিন। অশুভের বিনাশে শুভ শক্তির আলো ছড়িয়ে পড়বে ছোট গঞ্জটায়। তাতে অবশ্য তার অবস্থা ফিরবে কি না, সেটা ঠিক জানে না রঞ্জিত। এটুকু জানে, আজ তার নাচ, লম্ফঝম্প দেখে বাচ্চাগুলোর মুখে হাসি ফুটবে। অনেকেই এবার পুজোয় নতুন জামা পায়নি। ভালোমন্দ খাবারও জোটেনি কপালে। নাচ-গান দেখে শুকনো মুখগুলোতে যদি একটু তৃপ্তির হাসি ফোটে। সেই তো শুভ। সেই তো শক্তি। রাঢ় বাংলার ‘রাবণ কাটা’ উৎসবের সার্থকতা। লোক সংস্কারের সঙ্গে মনের আনন্দের মিলমিশ— বাংলার পার্বণের সার্থকতা তো এখানেই।

বাংলার উৎসবের ইতি হয় না। উমার আগমনীতে একরকম, আবার বিসর্জনের পরে আরেক রকম। মল্লরাজধানীতে বিসর্জনের ঢাকে বিদায়ের সুর বাজে না, বরং অতীত ভুলে নতুনকে সৃজন করার উদ্যোম জাগে। দশমী থেকে দ্বাদশীর বিষ্ণুপুর তাই বাংলার পার্বণের এক অন্য রূপ দেখায়। ভিন্ রাজ্যে যা দশেরা, রাঢ় বাংলায় তাই ‘রাবণ কাটা।’ একসময় নাম ছিল ‘রাবণ দহন’, এখন স্থানীয় ভাষায় মিশে ‘রাবণ কাটা’ হয়ে গেছে। অনুষ্ঠানের ভিত লোকনৃত্য। নাচের পটভূমিকা রাবণ বধের পরে জয়ের উল্লাস। কেউ হনুমান, কেউ সুগ্রীব, কেউ জাম্বুবান আবার কেউ বিভীষণ সেজে বাজনার তালে তালে, ছন্দে ছন্দে নেচে চলে। পায়ে বীর রসের ছন্দ। সঙ্গে নাকাড়া, টিকারা, কাঁশি বা ঝাঁঝের বাজনা। নাচের বিরাম নেই। আনন্দেরও অবসর নেই।


দশমীতে কুম্ভকর্ণ বধ, একাদশীর সন্ধ্যায় ইন্দ্রজিৎ বধ, আর দ্বাদশীর রাতে ‘রাবণ কাটা’

দশমী থেকেই হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায় রঞ্জিত গড়াই, সুকুমার অধিকারীদের। পুরনো মুখোশ রোদে দিয়ে তাজা করে বিসর্জনের সন্ধ্যা থেকেই শুরু হবে নাচ। দূরদূরান্ত থেকে আসবেন লোকশিল্পীরা, বাজনদারেরা। বাঁকুড়ার কাটানধারে রামভক্ত বৈষ্ণব অর্থাৎ রামায়েৎ বৈষ্ণবদের রঘুনাথজিউর মন্দিরে দশমীর সন্ধ্যায় কুম্ভকর্ণ বধ করে উৎসবের সূচনা হয়। মন্দির প্রাঙ্গন থেকে বিশাল শোভাযাত্রা বার হয়। তার মূল আকর্ষণ স্থানীয় লোকশিল্পীদের ‘রাবণ কাটা’ নাচ। হনুমান, জাম্বুবান, রাক্ষস-খোক্কসদের মুখোশ পরে, লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে ডঙ্কা বাজিয়ে শহরের অলিগলি পরিভ্রমণ। একাদশীতে সন্ধ্যায় ইন্দ্রজিৎ বধ ও দ্বাদশীর রাতে ওই মন্দির প্রাঙ্গনেই বহু প্রতিক্ষিত ও জনপ্রিয় রাবণ কাটা উৎসবের মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি হয়।

এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মল্ল রাজাদের স্মৃতি। শহরের ইতিহাসবিদ চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্ত জানিয়েছেন, সপ্তদশ শতকে মল্লরাজাদের তৈরি রঘুনাথজিউ মন্দিরে এই নাচ হত। প্রায় তিনশো বছরের পুরনো এই ‘রাবণ কাটা’ উৎসব। একসময় যেটা ছিল শুধুই পার্বণের রীতি, এখন সেটাই পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় লোকশিল্পীদের।

‘‘মল্ল রাজ বীর হাম্বিরের আমল থেকেই এই প্রথা চলে আসছে। রামচন্দ্রের অকালবোধনের পর তাঁর হাতে রাবণের মৃত্যু হলে, জয় ঘোষণা করে হনুমান, জাম্বুবানরা যে নৃত্য করেছিল, আমরাও সেই নৃত্য করি,’’ বলেছেন দলের প্রধান নৃত্যশিল্পী এবং উৎসব পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সুকুমার অধিকারী।


জাম্বুবানের ভালুকের মুখ,
গামারকাঠের তৈরি রাক্ষসের মুখোশ, নাকাড়ার তালে নাচেন আইসক্রিম বিক্রেতা সুকুমার

‘‘উৎসব-পার্বণ এলেই সম্মানটা বাড়ে। লোকে শিল্বী বলে মান্যিগন্যি করে। না হলে বছর ভর তো আইসক্রিমের গাড়ি ঠেলে এ দরজা, ও দরজায় ঘুরে বেড়াই,’’ নৃত্যশিল্পী সুকুমার অধিকারীর মুখ বিষন্ন। শিল্পী তকমাটা এই অনুষ্ঠানের তিনদিনের আটকা। বছরের অন্য সময়ে দু’একটা পালার বায়না জোটে, তবে উপার্জন বেশি নয়। সুকুমার জানালেন, দলের বাকিদের কেউ আনাজ বিক্রেতা, কেউ রাজমিস্ত্রী, কেউ লোহার কাজ করেন। বছরের সঞ্চয় ওঠে এই ‘রাবণ কাটা’ নাচ থেকেই।

‘‘জাম্বুবানের বড় বড় কালো লোম আর ভালুকের মুখ দেখে বাচ্চারা কেউ ভয় পায়, কেউ খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। মায়েরা বলে, ওই যে রাবণকাটা আসছে, দুষ্টুমি করলেই কামড়ে দেবে। তখন কী যে আনন্দ হয়,’’ রঞ্জিতের চোখে জল, মুখে তৃপ্তির হাসি।

লাল, সাদা, কালো রঙে ছাপানো পাটের উলোঝুলো পোশাকেই হনুমান, জাম্বুবান, সুগ্রীব সাজেন লোকশিল্পীরা। মুখোশ তৈরি হয় গামারকাঠের। মাথার দিকে ৫০টি ফুটো করে তার ভিতরে শন পরিয়ে শক্ত করে বেঁধে মাথার চুল তৈরি হয়। মুখোশের দাঁতের ফাঁকা জায়গাগুলো দিয়েই দেখার কাজ সারেন শিল্পীরা। পোশাকের রঙ বাছতে হয় পুরাণের বর্ণনা মিলিয়ে। হনুমানের ঘিয়ে রঙের লোম বসানো ফুলহাতা জামা, জাম্বুবানের আবার কালো পোশাক, ভালুকের মুখ। বিভীষণের লাল জামা, গায়ে টকটকে লাল রঙ। মাথায় পাগড়ি আর কপালে সাদা ত্রিশূল। সুগ্রীবের আবার বানরের আদলে মুখোশ। মাথার চুল শনের।

বৈষ্ণবপাড়ার ‘রাবণদা’কে এক ডাকে চেনে বিষ্ণুপুর

বৈষ্ণবপাড়ার নারায়ণকে লোক ভুলে গিয়েছে। রাবণদা নামেই পরিচিতি বেশি। রাবণ বধ পালার মূল দায়িত্ব তাঁরই। রাবণ গড়েন নারায়ণ। করেন। খড়ের উপর শ্যামবাঁধ, গাঁতাস বাঁধের মাটি দিয়ে রাবণের শরীর তৈরি করেন যত্ন করে। গরান কাঠের মুখ তৈরি হয়। দ্বাদশীর দিনে এই রাবণই বধ করবে হনুমান। নারায়ণ জানান, শিল্প নয় নিষ্ঠাও রয়েছে এই পার্বণের। ক’দিন নিরামিষ খেয়ে, শুদ্ধ চিত্তে রাবণের কাঠামো বানাতে হয়। রঞ্জিত, মিঠুন, সুকুমাররা সারা বছরের রসদ জোগাড় করেন এই পার্বণ থেকেই। আমাদের বেঁচে থাকার একটা উপায়ও তো বটে, অবজ্ঞা করি কী করে বলুন তো!

চার নৃত্যশিল্পী ও চার বাজনদারকে নিয়ে রাবণকাটার দল। দ্বাদশীর রাতেই রাবণ বধের শুভক্ষণ। রাস্তার উপর উত্তরদিকে মুখ করে বসিয়ে দেওয়া হয় রাবণের মূর্তি। রাত বাড়লে নাচতে নাচতে হনুমানের দল পৌঁছয় সেখানে। গানের কলিতে শোনা যায়, ‘রাবণ রাখব না, রাবণ কাটব।’ জাম্বুবানের নির্দেশে এরপর হনুমান রঘুনাথজিউয়ের মন্দিরে রাখা তরোয়াল দিয়ে এক কোপে কেটে ফেলে রাবণের মাথা। নাকাড়া, কাঁসিতে বিজয়ের বোল ওঠে। আলোর রোশনাইতে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। আঁধার, ঘুপচি ঘরগুলোতে শাঁখ বেজে ওঠে। অভাবী মুখগুলোতে হাসি ফোটে— এই তো অন্ধকার কাটছে, অশুভের বিনাশ হলেই সুদিন ফিরবে তাঁদের। দু’বেলা পেট ভরবে।

দ্বাদশীর রাত পেরোলেই রঙচঙে মুখোশ ফের মুখ লুকোয়ে বাক্স-প্য়াঁটরা মধ্যে। তিন রাতে যিনি ছিলেন সেরা নৃত্যশিল্পী, ভোরের আলো ফুটলেই তাঁকে দেখা যায় আনাজের ঠেলা সাজিয়ে অলিগলিতে হাঁক পাড়তে। জাম্বুবানের মুখোশে স্নেহের হাত বুলিয়ে তুলে রাখতে রাখতে রঞ্জিত বলেন, ‘‘বাচ্চাগুলোকে আনন্দ দিয়েই তো আমরা আনন্দ পাই গো। কত লোক আসে ভিন জেলা, ভিন রাজ্য় থেকে আমাদের নাচ দেখতে। এই তিনদিনেই তো আমরা রাজা, আমাদের এই রাজার রাজত্বে!’’

আরও পড়ুন:

মহিষাসুরের পুজো করে ওরা, দুর্গাপুজোয় হয় শোকপালন, আগমনীর সুরে আজও বিষাদ নামে অসুর-গ্রামে

Comments are closed.