আমার একটা বটগাছ আছে, রাখার জায়গা নেই, আপনারা কেউ নেবেন?

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘গাছ নেবে গো, গাছ!’

প্রাচীন বট নয়, নেহাতই শিশু বট।

ছাদের কিনারায় দেওয়ালের গা ঘেঁষে ছোট্ট গাছের চারাটা অনেকদিন ধরেই খেয়াল করেছিলেন কুন্তল। একদিন ভালো করে পরখ করে দেখলেন সেটি বটের চারা। হাওয়াতে দিব্যি তার ছোট ছোট শাখা আর কচি পাতাগুলো মেলে দিয়ে তিরতির করে কাঁপছে। রোদের ঝাপটা লাগলে বেশ খুশিও হয় সেই গাছ। একরত্তি সেই প্রাণ মন কেড়ে নিয়েছিল কুন্তলের। প্রতিদিনই ছাদে উঠলে স্নেহের হাত রাখতেন গাছের গায়ে। একটু একটু করে জল দিয়ে বলার চেষ্টা করতেন, ‘তুমি একা নও, দেখো আমিও আছি তোমার পাশে।’

বটের এই চারাটিকে সযত্নে লালন করছেন কুন্তল-পিয়ালী

পাশে থাকার এই আশ্বাসেই সেই গাছ উপড়ে ফেলতে মন চায়নি কুন্তলের। যদিও তিনি জানতেন, বটের সেই চারা আড়েবহরে বেড়ে ফাটল ধরিয়ে দিতে পারে তাঁর বাড়ির দেওয়ালেই।  গাছ তুলেছেন বটে কুন্তল, তবে যত্ন করে মাটি ভরে সেটি রেখে দিয়েছেন নিজের কাছেই। গাছ-প্রেমী কোনও মানুষ পেলে সেটি তাঁর হাতে দিয়ে নিশ্চিন্ত হবেন তিনি। অনেকটা কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার মতোই, গাছের উপযুক্ত সমঝদার খুঁজে চলেছেন কুন্তল।

এই কুন্তলকে আপনারা চেনেন। জলপাইগুড়ির উত্তর বামুন পাড়ায় চড়াইদের ‘সুখের ঘর’ বানিয়ে দিয়েছিলেন এই কুন্তল ঘোষ ও তাঁর স্ত্রী পিয়ালী দেবনাথ ঘোষ। ফেলে দেওয়া ঠাণ্ডা পানীয়ের বোতল, ভাঁড়ার ঘরের বাতিল মালসা বা নারকেলের মালা, একেবারে ঘরোয়া উপকরণ দিয়েই চড়াইদের ঘর বেঁধে দিয়েছেন এই দম্পতি। কুন্তলের বানানো ‘বার্ড ফিডার’-এর কথা জলপাইগুড়ির লোকের মুখে মুখে ফেরে। তাঁদের বাড়ির নামও তাই ‘Sparrow House’।  ২০ মার্চ ‘বিশ্ব চড়াই দিবস’-এ কুন্তল-পিয়ালীর আদরের ‘Sparrow House’ ভরে উঠেছিল সাংবাদিক ও উৎসাহী মানুষের ভিড়ে।

কুন্তল এবং পিয়ালী ঘোষ

বামুন পাড়ায় কুন্তলের মেলা নামডাক। তাদের চড়াই-বাড়িতে ভোর হতেই ঘুঘু, ফিঙে, শালিক, কাঠঠোকরা, দোয়েলের কিচিরমিচির শুরু হয়ে যায়। যত্ন করে পাত পেড়ে রাখা চাল খায়, পাখিদের জন্য মাঝে সাঝে বিশেষ ভোজের ব্যবস্থাও করেন কুন্তল-পিয়ালী। জলপাইগুড়িতে একটি সফটওয়্যার কোম্পানিতে চাকরি করেন কুন্তল। পরিবেশকর্মী হিসেবেও তাঁর নাম রয়েছে। জলপাইগুড়ি জেলা সায়েন্স অ্যান্ড নেচার ক্লাবের সক্রিয় সদস্যও তিনি। জানিয়েছেন, পাখি, গাছ, পরিবেশের প্রতি এক আত্মীয়তার টান অনুভব করেন। যেখানেই পরিবেশ রক্ষার স্লোগান ওঠে, পৌঁছে যান কুন্তল। জেলার নানা জায়গায় ক্যাম্প করে পাখিদের জন্য ‘বার্ড ফিডার’ তৈরির কৌশলও শেখান তিনি। এলাকার লোকজনকে বাড়িতে বার্ড ফিডার বানানোর পরামর্শ দেন তাঁরা। কী ভাবে বানাতে হবে তাঁর উপায়ও বাতলে দেন।

কুন্তলের বাড়িতে বার্ড ফিডারে বাসা বেঁধেছে চড়াই


কুন্তল-পিয়ালীর চড়াই-বাড়িতে ছানা নিয়ে মা  দোয়েলের সংসার

‘‘আমাদের ছাদে একটি বটের চারা জন্মেছিল। গাছটাকে উপড়ে ফেলে না দিয়ে আমিই তার দেখভালের দায়িত্ব নিই। তবে আমার বাড়িতে মাটিতে গাছ লাগানোর কোনও জায়গা নেই। কোনও সহৃদয় ব্যক্তি যদি সেই গাছ নিয়ে নিজের বাড়িতে বা কোথাও রোপণের ব্যবস্থা করেন, তাহলে বিশেষ উপকার হয়,’’ নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দীর্ঘ বিবৃতি দিয়ে গাছ-প্রেমীর খোঁজ করছেন কুন্তল। তাঁর কথায়, ‘‘একটা পূর্ণবয়স্ক বট গাছ সবথেকে বেশি অক্সিজেন দেয়। ভালোবেসে কেউ যদি এই গাছকে বড় করে তোলেন তাহলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম বাঁচার রসদ পাবে।’’

পরিবেশবিদরা বলেন, বিশ্ব উষ্ণায়নকে রুখতে বড় বড় পরিকল্পনার পাশাপাশি জীবনচর্যায় ছোট ছোট চেষ্টাও জরুরি। সবুজায়নের লক্ষ্যে যে কোনও পদক্ষেপকেই স্বাগত জানাবে বিশ্ব। ‘ইন্টার-গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’ (আইপিসিসি)-এর রিপোর্ট বলছে, পৃথিবীর গড় উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গিয়েছে। এই হারে তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে আগামী ১২ বছরের মধ্যে বড় দুর্যোগ ঘনিয়ে আসতে পারে দুনিয়াজুড়ে। এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য সব থেকে বড় কারণ বাতাসে মিশছে অতিরিক্ত পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড। যার জন্য দায়ী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, জীবাশ্ম জ্বালানির ধোঁয়া। সবুজ-হারা কংক্রিকেটর জঙ্গলে ক্রমাগত কমতে থাকা গাছের সংখ্যাও এই বিপদ বাড়াচ্ছে।

আরও পড়ুন: মানুষ নয়, এ বার গাছের প্রাণ প্রতিস্থাপন করল কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ

অন্য গাছের চেয়ে বট গাছে পাতা থাকে বেশি। তাই সালোক-সংশ্লেষের সময় অন্য গাছের চাইতে বাতাস থেকে বেশি কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্রহণ করে অক্সিজেন ফিরিয়ে দেয়।  একটি প্রমাণ বয়সের বটগাছ ফি দিন গড়ে ৫০-৭০ গ্যালন জলীয় বাষ্প ছাড়ে। যা স্থানীয় এলাকার আর্দ্রতা  নিয়ন্ত্রণ করে। মূল গাছ এবং গাছের ঝুরির শিকড় অনেকটা ছড়িয়ে পড়ে বিস্তীর্ণ এলাকার মাটি আঁকড়ে রাখে। ভূমিক্ষয় রোধ করে। নদী তীরে যে সব জায়গায় বট গাছ আছে, সেখানকার ভূমিক্ষয় তুলনায় অনেক কম।

কুন্তলের কথায়, একটা বটগাছকে ঘিরেই গড়ে ওঠে ‘ইকোসিস্টেম’ বা বাস্তুতন্ত্র। পশু. পাখির আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে বটগাছ। আর বাড়ির গাছটি তো তাঁর পরম বন্ধু। ঠিক যেন সন্তানের মতো। তাকে যোগ্য হাতে তুলে না দেওয়া পর্যন্ত স্বস্তি নেই কুন্তলের।

আরও পড়ুন:

কুন্তল-পিয়ালীর বাসায় ‘মহাসুখে’ বহুতলে ঘর হারানো চড়াইরা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More