কোজাগরী রূপকথা! মেয়েকেই লক্ষ্মীরূপে পুজো করল নদিয়ার বিশ্বাস পরিবার

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: কাঠের সিংহাসনের সামনে ছোট পিঁড়িটার উপর বসে রয়েছে ‘লক্ষ্মী।’ লাল বেনারসী পরিপাটি করে পরানো। সামান্য গয়নার সাজ। মোটা মালা গলায় ঝুলিয়ে একহাতে পদ্ম ও অন্য হাতে শক্ত করে ধরে রয়েছে একটা ছোট্ট ঝাঁপি। পুজো করতে ঠাকুরঘরে ঢুকেই চমকে গেলেন পুরোহিতমশাই। মাটির প্রতিমা তো নয়! কিন্তু সাক্ষাৎ যেন দেবীমূর্তি। শান্ত, ফুটফুটে মুখে একগাল হাসি ছড়িয়ে কচিগলাটা বলে উঠল, ‘পুজো করবে না দাদু!’  মন্ত্র পড়তে পড়তেই আসনে বসে পড়লেন পুরোহিত। কাঁসর-ঘণ্টা বেজে উঠল চারপাশে। আলতা মাখানো হাতে বরাভয় দেখাল ছোট্ট লক্ষ্মী। মায়ের আদুরে লক্ষ্মী।

    পাঁচ বছরের রূপকথা। নদিয়ার মাজদিয়া শিবনিবাসের বাড়িতে সেই লক্ষ্মী। মাটির প্রতিমা নয়, নিজেরে মেয়েকেই দেবী রূপে পুজো করলেন মা ঝুমাশ্রী খাঁ বিশ্বাস। ‘‘মেয়ের জন্ম হলে তো সকলেই বলে ঘরে লক্ষ্মী এসেছে। নারীই তো শক্তি। নারীই দেবী। তাই স্নেহে-আদরে-নিষ্ঠায় অঞ্জলি দিয়েছি জীবন্ত প্রতিমাকে। ওই তো আমার লক্ষ্মী,’’ বললেন দুই মেয়ের গর্বিত মা ঝুমাশ্রী।

    রূপকথা আর সাঁঝবাতি। ঝুমাশ্রীদেবীর দুই মেয়ে। সাজবাতির বয়স এক বছর। পিঁড়িতে অনেকক্ষণ বসে থাকতে পারবে না সে। পরবর্তীকালে তাকেও দেবীরূপে পুজো করবেন মা ঝুমাশ্রী। স্বামী রমেশ শক্তিনগর উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক। জানিয়েছেন, লক্ষ্মীরূপে মেয়েকে পুজো করার ইচ্ছা ছিল দু’জনেরই। ঘরের সুখ-সম্পদের ধন তো মেয়েরাই। দেহমন্দিরেই তো ঈশ্বরের বাস। আর শক্তির রূপ তো নারীই।

    জীবন্ত প্রতিমা। মৃন্ময়ী মূর্তির সামনে সপ্রাণ মানব-মানবীকেও দেব দেবী জ্ঞানে পুজোর রীতি বহু কাল ধরেই চলে আসছে আমাদের দেশে। কুমারী পুজো হল দেহ মন্দিরে বাস করা শুদ্ধাত্মার পুজো। কুমারী অর্থাৎ অরজঃস্বলা প্রকৃতির পুজোই এর বিধান। তাকেই পুজো করা হয় মাতৃজ্ঞানে। কুমারী মেয়ের বিশুদ্ধতাই তাকে দেবীর সমান আসনে বসার বিধান দেয়। এ তো শাস্ত্র মত। কিন্তু মায়ের মত অন্য। বলেছেন, “কন্যাসন্তান মানেই ব্রাত্য নয়। খবরের কাগজে, টিভিতে সবসময় দেখা যায় কন্যাভ্রূণ হত্যা চলছে দেশের নানা দিকে। মেয়ের জন্ম দিয়েছেন যে মা তাকে চূড়ান্ত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। যেন কোনও বড় অপরাধ করে ফেলেছেন। মেয়েরা যে বাবা-মায়ের গর্ব সেটাই বোঝাতে চেয়েছি আমরা।’’ একই মত রমেশবাবুরও।

    কুমারী পুজোর মতোই নিয়ম মেনেই মায়ের বরণ, অঞ্জলি সবই হয়েছে। এতদিন বাড়ি বাড়ি মাটির প্রতিমা পুজো করে এসেছেন যে পুরোহিত, তাঁর মুখেও দেখা গেছে প্রসন্নতার হাসি। এই প্রতিমা বড়ই সরল, বড়ই সুন্দর। তাকে আবাহন করতে হয় না। ডাকলেই মিষ্টি গলায় সাড়া দেয়। পুজোর আসনে যেন কোজাগরীর জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পড়ে।

    নারীশক্তির জয় নিয়ে আস্ফালন করতে চাননি শিবনিবাসের ঝুমাশ্রী-রমেশ। পিতৃতন্ত্র-মাতৃতন্ত্রের মধ্যে স্থূল-সূক্ষ্ম বিচারও করতে চাননি তাঁরা। শুধুমাত্র এক অনাবিল মাতৃস্নেহের বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে নদিয়ার এই ছাপোষা পরিবার। নাড়ি ছিঁড়ে যে কন্যার জন্ম হচ্ছে তাকে মেরে ফেলার মধ্যে আজও কোনও অপরাধ দেখেনা সমাজের একটা অন্ধ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন অংশ। লিঙ্গ বিচার করে গর্ভপাত আজও হয় আমাদের দেশে। ‘বেটি’ বাঁচাতে হলে ঢাক পিটিয়ে আড়ম্বরের সঙ্গে আচার-অনুষ্ঠান নয়। বরং চিন্তার বিবর্তনটা শুরু হোক নিজের বাড়িতেই। পরিচিত ঘেরাটোপে পরিবারের মধ্যেই সম্মান লাভ করুক মেয়েরা। ব্যতিক্রমী ভাবনার দৃষ্টান্ত গড়ে তুলুক সমাজ। এটাই চেয়েছে শিবনিবাসের বিশ্বাস পরিবার।

    আরও পড়ুন:

    ‘মাতৃরূপেণ সংস্থিতা’..পুরনো শাড়ি, এলো চুলে আজও আগুনে তেজ জ্যান্ত দুর্গাদের

    পড়ুন, দ্য ওয়ালের পুজোসংখ্যার বিশেষ লেখা…

    হয়তো সেই ছোট্ট গ্রামে দেখেছি বাঞ্ছারামকে: মনোজ মিত্র

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More