শনিবার, আগস্ট ২৪

ইদের আগের দিনই শিবের মাথায় জল ঢাললেন রেজাবুল, মনিরুল, শেখ বসিররা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ধর্মের ভেদাভেদ উৎসবের জৌলুসকে কোনোদিনই ফিকে করতে পারেনি। দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি যতই উত্তেজক হোক না কেন, মিলনের স্রোত অন্তঃসলীলা হয়ে ঠিক তার জায়গা করে নেয়। শ্রাবণের শৈবক্ষেত্র বর্ধমানেশ্বর মন্দিরও সেজে উঠেছে বিবিধের মাঝে মহামিলনের বার্তা দিতেই। গঙ্গার জলে ঘটিয়ে ডুবিয়ে, কাঁধে বাঁক ফেলে শিবের মাথায় জল ঢালতে তাই কোনও বাধা ছিল না রেজাবুল, মনিরুল, শেখ বসিরদের।

বর্ধমানের রাজারা ধর্মবিশ্বাসে শৈব ছিলেন। তাই শহরের ভিতরে, বাইরে শিবমন্দিরের ছড়াছড়ি। শহরের তিনটি বড় শিবমন্দির রয়েছে তিন প্রান্তে। উত্তরে নবাবহাটের ১০৮ শিবমন্দির, দক্ষিণে আলমগঞ্জের বড় শিবের মন্দির এবং মাঝে গোলাপবাগের রমনার বাগানের বিজয়ানন্দেশ্বর শিবমন্দির। ধর্মের কাঁটা এই মন্দিরগুলিকে স্পর্শ করেনি। তাই মহাশিবরাত্রিতে বর্ধমান হয়ে ওঠে নানা জাত, ধর্ম-বর্ণের মিলনক্ষেত্র।

গোটা শ্রাবণ জুড়েই লাখো ভক্তের ভিড় আলমগঞ্জের বর্ধমানেশ্বর শিবমন্দিরে। আবির্ভাব দিবস উপলক্ষ্যে সপ্তাহের ভিড়টা এ বার অনেক বেশি। রবিবার ছিল মন্দিরের প্রতিষ্ঠা দিবস। শনিবার সকাল থেকে হাজার হাজার ভক্ত সমাগম হয় মন্দিরে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা ধর্মের মানুষ আসেন শিবের মাথায় জল ঢালতে। হিন্দু বন্ধুদের সঙ্গে তাই এ বার বাবার মাথায় জল ঢালতে কাঁধে বাঁক ফেলে হাঁটা লাগিয়েছিলেন মুসলিম ভাইয়েরাও।

বলগোনা, শিকোত্তর, সেলেন্ডা-সহ আরও কয়েকটি গ্রামের ৯ জনের একটি দল বর্ধমানেশ্বরে পৌঁছয় রবিবার সন্ধেয়। রবি দাস, রাহুল দাসের সঙ্গে এই দলে ছিলেন শেখ রাজু, রেজাবুল বড়াল, শেখ মনিরুল, রাজু শেখ ও শেখ বসির। তাঁদের কথায়, ‘‘কাটোয়ার গঙ্গা থেকে ঘটিতে জল ভরে বর্ধমান অবধি হেঁটে মন্দিরে পৌঁছই আমরা। বর্ধমানের অন্যতম প্রাচীন এই মন্দির বর্ধমানেশ্বরের দরজা সব ধর্মের মানুষের জন্যই খোলা থাকে। শ্রাবণ মাসেও তার ব্যতিক্রম নয়। হর হর মহাদেব ধ্বনিতে হিন্দু-মুসলিম ভাগাভাগি নেই।’’

শিবরাত্রি ও শিবের গাজন— বর্ধমানে এই উৎসবই পালিত হয় জাঁকজমকের সঙ্গে। লোকসমাগমের দিক থেকে সবচেয়ে বড় পুজো হয় নবাবহাটের ১০৮ শিবমন্দিরে। এর পরেই আলমগঞ্জের বর্ধমানেশ্বর মন্দির। এই মন্দিরের আর্বিভাব নিয়েও নানা জনশ্রতি রয়েছে এলাকায়। স্থানীয়দের বিশ্বাস, আলমগঞ্জে জমিতে মাটি কাটার কাজ করার সময় মাটির তলা থেকে উদ্ধার হয় এই সুবিশাল শিবলিঙ্গ। সালটা ১৯৭২। দামোদরের বুক থেকে এই শিবলিঙ্গ নিয়ে আসা হয়েছিল। কষ্ঠি পাথরের তৈরি এই লিঙ্গের ওজন প্রায় ১৩ টন, উচ্চতা ৬ ফুট, পরিধিতে প্রায় ১৬ ফুট।  এমনকিও এও শোনা যায়, নদীগর্ভ থেকে সেই বিশাল শিবলিঙ্গ তুলে আনতে সেনাবাহিনীকে খবর দিতে হয়েছিল।

মনিরুলদের কথায়, স্বাভাবিক ভাবেই এই মন্দির ঘিরে বর্ধমানের মানুষজনের আলাদা আবেগ রয়েছে। যেমন রয়েছে তাঁদেরও। শুক্রবারের নমাজের মতো শ্রাবণে বর্ধমানেশ্বরের মন্দিরে পুজো দেওয়ার পিছনেও সেই আবেগই রয়েছে। তবে রেজাবুল, শেখ রাজুরা জানিয়েছেন তাঁদের আরও কিছু লক্ষ্য ছিল। কাটোয়া থেকে বর্ধমান ৬০ কিলোমিটার যাত্রাপথে বলগোনা, ভাতার, আমারুন, নর্জা প্রভৃতি এলাকায় পরিবেশ-বাঁচাও কর্মসূচির প্রচার করেন তাঁরা। রাস্তা ঝাঁট দিয়ে আবর্জনা মুক্ত পরিবেশের বার্তা দেন স্থানীয়দের। সেই সঙ্গে জল সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ, মিশন নির্মল-বাংলা অভিযানের মতো জনমুখী প্রকল্পের প্রচারও করেন।

রেজাবুল, শেখ বাসিরের কথায়, ‘‘আমাদের এলাকায় হিন্দু-মুসলিম একই সঙ্গে ওঠাবসা। একটাই ধর্ম আমাদের—মানবধর্ম। তাই এ বার আমরা সংকল্প করি পুজো দেবো এবং প্রকৃতি রক্ষার প্রচারও চালাব। সম্প্রীতি শুধু মনে নয়, কাজেও হওয়া দরকার।’’

Comments are closed.