মহা শিবরাত্রিতে মেতে উঠেছে মাজদিয়ার শিবনিবাস, ৯ ফুট উঁচু শিবলিঙ্গে জল ঢালতে লাখো ভক্তের ভিড়

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো, নদিয়া: উঁচু মন্দিরের চূড়াটা আজ যেন অন্যদিনের থেকে আলাদা। কাঁসর-ঘণ্টা-সমবেত ভক্তদের কণ্ঠস্বরে ভোর থেকেই উৎসবের আবহ। কেউ ছাতা মাথায়, কেউ ঘোমটা টেনে মন্দিরের বাইরে দীর্ঘ লাইনে। হাতে কাঁসার বড় ঘটি, ফুল-আকন্দ-বেলপাতার ডালি। আজ যে মহা শিবরাত্রি। নদিয়ার শিবনিবাসে তাই হাজার ভক্তের ভিড়।

    শিয়ালদহ-গেদে শাখার মাজদিয়া স্টেশনে নেমে টোটো বা ভ্যানে চেপে শোনঘাটা। তারপর নদী পেরোলেই শিবনিবাস মন্দির। ঘাট থেকেই নজরে পড়বে মন্দিরের চূড়া। ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে শিবনিবাসে ভক্ত সমাগম দেখার মতো। লাইন দিয়ে পালা করে চলেছে শিবের মাথায় জল ঢালা। ভক্তদের উৎসাহ-উদ্দীপনাকে ছাপিয়ে যায় পুরোহিতদের হইহল্লা। সেই সঙ্গে ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনিতে মুখরিত মন্দির চত্বর।

    ‘‘আগে ছিল ১০৮টা মন্দির। এখন সেটাই দাঁড়িয়েছে তিনটিতে,’’ বললেন মন্দিরেরই এক পুরোহিত। মূল মন্দিরটি আজও অক্ষত। তবে বাকিগুলি সংরক্ষণের অভাবে রুগ্ন। তাতে অবশ্য ভক্তদের উন্মাদনায় ভাঁটা পড়েনি। দু’টি শিব মন্দিরের সঙ্গে রয়েছে রাম-সীতার মন্দিরও। শিবের মাথায় জল ঢেলে ভক্তরা একবার প্রণাম ঠুকে যাচ্ছেন সেখানেও।

    কৃষ্ণনগর সদর মহাকুমার অন্তর্গত কৃষ্ণগঞ্জ থানার অধীনে সীমান্তবর্তী গ্রাম শিবনিবাস। গ্রামের নামেই মন্দিরের নামকরণ। এখানে ইতিহাসের সঙ্গে মিশে রয়েছে নানা গল্পকথা। ইতিহাস বলে এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা হয়েছে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজত্বকালে (১৭২৮-১৭৮২)। বর্গির আক্রমণ থেকে বাঁচতেই তিনি তাঁর রাজধানী কৃষ্ণনগর থেকে সরিয়ে আনেন এখানে। ঝাঁ চকচকে রাজপ্রাসাদের সঙ্গে তৈরি হয় অসংখ্য শিব মন্দির। সেই থেকেই গ্রামের নাম হয় শিব-নিবাস।

    রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রাজধানী প্রতিষ্ঠার জন্য কেন এই গ্রামকেই বেছে নিলেন তার পিছনেও রয়েছে কাহিনী। লোকে বলে, একবার নসরত খাঁ নামে এক ডাকাতকে ধরতে রাজা মাজদিয়ায় এসে পড়েন। তখন গোটা এলাকাই ছিল জঙ্গলে ঘেরা। জঙ্গলের ভিতর একরাত কাটিয়ে পরদিন সকালে নদীতে মুখ ধোওয়ার সময় একটি রুইমাছ লাফিয়ে তাঁর পায়ের কাছে এসে পড়ে। রাজার অমাত্যরা তখন বিধান দেন, রাজভোগ্য সামগ্রী যখন নিজে থেকেই রাজার সামনে হাজির হয়েছে, তখন এই স্থানই হতে পারে শত্রুর আক্রমণ মুক্ত নিরাপদ স্থান।

    তিন দিক চূর্ণী নদী গিয়ে ঘেরা এই স্থানে প্রথম শিব মন্দিরটি তৈরি হয় ১৭৫৪ খ্রিষ্টাব্দে। এটিই মূল শিব মন্দির যার নাম রাজরাজেশ্বর। স্থানীয়রা বলেন ‘বুড়োশিবের মন্দির।’ মন্দিরের গায়ে ‘গথিক’ শিল্পরীতি মুগ্ধ করবে। মন্দিরের ভিতরে খাড়া দেওয়ালের  প্রতিটি কোণে মিনার আকৃতির আটটি সরু থাম। রাজরাজেশ্বরের কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গের উচ্চতা প্রায় ৯ ফুট, প্রস্থে ২১ ফুটের কাছাকাছি। বলা হয়, পূর্ব ভারতের সবচেয়ে বড় শিবলিঙ্গ এই রাজরাজেশ্বর। শিবলিঙ্গের মাথায়  জল, দুধ ইত্যাদি ঢালবার জন্য সিঁড়ি আছে।

    রাজরাজেশ্বরের পাশেই রয়েছে দ্বিতীয় বড় মন্দির রাজীশ্বর। উঁচু বেদীর উপর তৈরি চারচালার এই মন্দিরের নির্মাণকাল ১৭৬২ খ্রিষ্টাব্দ। মন্দিরের প্রতিষ্ঠাফলক থেকে জানা যায় এই মন্দিরটি রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তৈরি করেছিলেন তাঁর দ্বিতীয়া স্ত্রীর জন্য। রাজরাজেশ্বরের থেকে এই মন্দিরের শিবলিঙ্গ উচ্চতায় কিছুটা কম, প্রায় সাড়ে সাত ফুট। রাজীশ্বরের গা ঘেঁষেই রয়েছে রাম-সীতার মন্দির। কাঠের সিংহাসনে রাম-সীতার মূর্তি ছাড়াও মন্দিরের ভিতরে শোভা পাচ্ছে শিবলিঙ্গ, কালী, রাধাকৃষ্ণ ও গণেশমূর্তিও।

    মন্দিরের বর্ষীয়াণ পুরোহিতের কথায়, আগে শিবনিবাসে ১০৮ ঘর ব্রাহ্মণ বসবাস করতেন। ভারতচন্দ্র রায়ের অন্নদামঙ্গলে শিবনিবাসকে কাশীধামের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। প্রতিবছরই শিব চতুর্দশীতে শিবনিবাসে উপচে পড়ে ভক্তদের ভিড়। যে কোনও রকম অপ্রীতিকর অবস্থা ঠেকাতে নিরাপত্তা আঁটোসাঁটো করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রশাসন। ভক্তদের সুবিধার জন্য সবরকম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে মন্দির কর্তৃপক্ষ।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More