রবিবার, জুন ১৬

টিউমার ফেটে রক্তে মাখামাখি এক দিনের শিশু, শরীরে চোট নিয়ে ফুটপাথে কাতরাচ্ছে রোগী

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

পিঠের টিউমার ফেটে গলগল করে বেরোচ্ছে রক্ত। মাংসপিণ্ডের সঙ্গে মিশে রক্ত ঝরছে ছোট্ট শরীরটা থেকে। যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠছে এক দিনের শিশু। বুকে আগলে ডাক্তারদের দোরে দোরে ঘুরছে পরিবার। এ দিকে বালুরঘাট সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন শিশুটির মা। অসহায়তার এই সন্ধিক্ষণে ঠাঁই মেলেনি কোথাও! রক্তাক্ত-যন্ত্রণাকাতর একরত্তি ছেলেকে নিয়ে কলকাতার ফুটপাথেই অনন্ত অপেক্ষা শুরু করেছিলেন শিশুটির জ্য়েঠা।  ডাক্তার নিগ্রহে রক্তের দাগ লেগেছে তিলোত্তমায়, এ বার তার আকাশ ভারী হলো শিশুর কান্নায়।

রায়গঞ্জ এলাকার সব সরকারি হাসপাতাল ফিরিয়ে দিয়েছে, জানিয়েছেন শিশুটির জ্য়েঠা ভোলানাথ ঘোষ। বুকে জড়ানো সন্তান তখন রক্তে মাখামাখি। ওই অবস্থায় আশার আলো জ্বালিয়ে ছুটে এসেছেন কলকাতায়। আশ্রয় মেলেনি সেখানেও।তাঁর কথায়, “একদিন আগে সিজার হয়েছে আমার ভাইয়ের বউয়ের। জন্মের পরই ওকে রেফার করা হয় মালদা মেডিক্যাল কলেজে। সেখান থেকে বলা হয় নিউরোসার্জিক্যাল বিভাগ না থাকায় কলকাতায় বিসি রায় নিয়ে যেতে। বিসি রায় ভর্তি করতে রাজি না হওয়ায় পিজি-তে নিয়ে যাই আমরা। সেখানেও ঠাঁই মেলেনা।” ভোলানাথবাবু জানিয়েছেন, পিজি-তে সুপার না থাকায় সেখান থেকে চিত্তরঞ্জন শিশু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় বাচ্চাটিকে। সেখান থেকে শম্ভুনাথ, ফের বিসি রায় মেডিক্যাল কলেজ। ভোলানাথ বাবুর কথায়, নিউরোসার্জিক্যাল বিভাগ না থাকার কারণেই প্রথমে শিশুটিকে ভর্তি নিতে চায়নি বিসি রায়। পরে বাচ্চাটার শারীরিক অবস্থা দেখে তাঁকে ভর্তি নেওয়া হয়।

তবে সব হাসপাতাল যখন মুখ ফেরায়, মানবিকতার নিদর্শন রাখে বিসি রায় হাসপাতাল। বেলার দিকে জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয় শিশুটিকে। ডাক্তাররা জানিয়েছেন, শিশুটির অবস্থা আশঙ্কাজনক।

ভোলানাথ বাবু জানিয়েছেন, শিশুটির মা সুমিত্রা সরকার ঘোষও মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। সেখানেও তাঁর ঠিকমতো চিকিৎসা হচ্ছে কি না নিশ্চিত নন তিনি।

মঙ্গলবার নীলরতন সরকার মেডিক্য়াল কলেজে জুনিয়র ডাক্তার-ইন্টার্ন নিগ্রহের যে নিকৃষ্টতম ঘটনা সামনে এসেছে তার পরিপ্রেক্ষিতেই রাজ্য জুড়ে এক ভয়ানক ঝড় উঠেছে। কলকাতা থেকে জেলা— সরকারি থেকে বেসরকারি—সিনিয়র, জুনিয়র, ইন্টার্নরা অনির্দিষ্ট কালের জন্য় ধর্না-অবস্থান শুরু করেছেন। বন্ধ প্রায় সমস্ত আউটডোর বিভাগ। ইমার্জেন্সি খোলা রাখার কথা বলা হলেও আদতে সেটা হচ্ছে না বেশিরভাগ জায়গাতেই। পরিষেবা না পেয়ে আরও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছেন রোগীরা। ডাক্তারদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রোগী বিক্ষোভও। কোথাও লাঠি নিয়ে, আবার কোথাও ইটবৃষ্টি চলছে জেলার মেডিক্যাল কলেজগুলিতে। বর্ধমান, মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল নতুন করে শুরু হয়েছে কর্মবিরতি, সেই সঙ্গে রোগীর পরিবারদের বিক্ষোভ, হাঙ্গামা, অশান্তি। ডাক্তার-রোগী খণ্ডযুদ্ধে বর্বরতার এক পৈশাচিক তাণ্ডব শুরু হয়েছে গোটা রাজ্যই।

এনআরএস-এ ৮৫ বছরের বৃদ্ধ মহম্মদ সাহিবের মৃত্যুতে প্রতিবাদ ও পাল্টা প্রতিবাদ ঘিরে ক্ষোভের যে আগুন জ্বলেছিল তা ক্রমশই বাড়ছে শহর থেকে জেলায়। এনআরএস তো বটেই, পিজি, এসএসকেএম, কলকাতা মেডিক্য়াল, আর জি কর-সহ কলকাতার নানা প্রান্তের হাসপাতালগুলির বাইরে রাস্তায় শুয়ে, বসে অপেক্ষা করছেন রোগীরা। পিজি হাসপাতাল চত্বরে মঙ্গলবার থেকেই অপেক্ষারত মহম্মদ ইসলাম, রহমত আলি। আট বছরের রহমতের মাথায় গুরুতর চোট। সিটি স্ক্যান করতে হবে। কিন্তু ইমার্জেন্সি বন্ধ থাকায় সেটা সম্ভব হচ্ছে না।

আরও পড়ুন: গুন্ডামি, প্রতিবাদ, ভোগান্তি– এর শেষ কোথায়! ফের প্রশ্ন তুলে দিল এনআরএস

পিজি-র ডাক্তার তথা আন্দোলনের মুখ ওঙ্কার দে সরকার বলেছেন, “আমরা ইমার্জেন্সি বিভাগ বন্ধ রাখিনি। শান্তিপূর্ণ অবস্থান করছি। রোগীদের সমস্যা গুরুত্ব দিয়েই দেখা হবে।” ডাক্তারবাবুর কথার পরেও দেখা যায় ইমার্জেন্সি বিভাগের দরজা বন্ধ, বাইরে পোস্টার ঝুলছে, আর দরজার বাইরে চাদর বিছিয়ে বসে রয়েছেন রোগীরা। এই প্রসঙ্গে ডাক্তারবাবু জানান, “কী ভাবে এবং কেন ইমার্জেন্সি বিভাগের দরজা বন্ধ রাখা হয়েছে তার সঠিক তথ্য নেই। তবে আমরা এই কাজ করিনি।”

দশ বছরের ছেলেকে নিয়ে পিডি-র ইমার্জেন্সির বাইরে ঠাঁই হয়েছে মহম্মদ নাসিমের। অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে কোথায় যাবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। ইমার্জেন্সি খোলা রাখার কথা বললেও কার্যত তা বন্ধ। পরিষেবা নেই আউটডোরেও।

হাহাকার রেহেনার পরিবারের

মঙ্গলবার থেকেই মুর্শিদাবাদ মেডিক্যালে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা চলছে। ডাক্তারদের বিক্ষোভে বন্ধ সমস্ত পরিষেবা। বাইক অ্যাক্সিডেন্টে গুরুতর জখম বছর পনেরোর রেহেনা খাতুন আট দিন ধরে ভর্তি নওদার একটি হাসপাতালে। তাঁর মা জানিয়েছেন, গতকাল থেকে কোনও ডাক্তারই দেখতে আসেননি মেয়েকে। উল্টে কর্মবিরতির কারণে নার্সেরা দুর্ব্যবহার করছেন। মেয়ের অবস্থাও খারাপ হচ্ছে প্রতি ঘণ্টায়। বড় বিপদের আশঙ্কায় হাহাকার করছেন রেহেনা পরিবারের লোকজন।

চিকিৎসায় গাফিলতিতে রোগী মৃত্যু, অথবা ডাক্তারদের অবহেলার অভিযোগ আগেও বহুবার উঠেছে। সেই অভিযোগকে হাতিয়ার করে ডাক্তার-নিগ্রহের ঘটনাও অজস্র। এনআরএসের জুনিয়র ডাক্তার পরিবহ মুখোপাধ্যায়ের উপর যে নির্যাতন চলেছে সে দিক থেকে ডাক্তারদের রাগ-ক্ষোভের কারণ প্রাসঙ্গিক। কিন্তু, সেই রাগ, ক্ষোভ যদি এক অন্ধ বিপ্লবের আকার নিয়ে গোটা চিকিৎসা ব্যবস্থাটাকে ছাড়খাড় করে দেয় সেটা কোনও মতেই কাম্য নয়। পীড়িত, যন্ত্রণায় কাতর, মৃত্যু পথযাত্রীদের দায়িত্ব তাহলে কে নেবে? আন্দোলনকারীরা নাকি প্রশাসন? উত্তরটা বোধহয় এখনও অজানা।

আরও পড়ুন:

https://www.thewall.in/news-bengal-doctors-strike-worsens-shutdown-at-hospitals-statewide/

Comments are closed.