সোমবার, এপ্রিল ২২

মুকুল-পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে সংকটমোচন মন্দিরে পুজো দীনেশের

দ্য ওয়াল ব্যুরো: সংকট কাটাতে এবার সংকটমোচনের মন্দিরে গেলেন ব্যারাকপুরে তৃণমূল প্রত্যাশী দীনেশ ত্রিবেদী। তাও আবার সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন বিজেপি নেতা মুকুল রায়ের পুত্র তথা বীজপুরের তৃণমূল বিধায়ক শুভ্রাংশু রায়কে। ১০ বছরের ব্যারাকপুরের এই সংসদ সদস্য এবার জোড়া সংকটের মুখে।

একদিকে, এলাকার বাহুবলি নেতা অর্জুন সিং তৃণমূল ছেড়ে তাঁর বিরুদ্ধে বিজেপি প্রার্থী হয়েছেন ব্যারাকপুর লোকসভায়। অন্যদিকে, ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের ভূমিপুত্র মুকুল রায়ও তাঁর বিরুদ্ধেই ঘুঁটি সাজাচ্ছেন। তাঁর ওপর ঘনিয়ে আসা জোড়া সংকট কাটাতে তাই মঙ্গলবার হাজিনগরের হুকুমচাঁদ ছাই ময়দানের শ্রী রাম হনুমান মন্দিরে পুজো দিলেন হিন্দু রীতিনীতি মেনে, নিষ্ঠাভরে যজ্ঞও করলেন দেশের শ্রেষ্ঠ সাংসদ।

এ বারের ভোট প্রচারে দীনেশ ত্রিবেদীকে নানারুপে দেখছেন ব্যারাকপুরের মানুষ, যা গত ১০ বছরে তাঁরা দেখেননি। কখনও নৈহাটির হরিনাম সংকীর্তনের অনুষ্ঠানে খোল করতাল বাজিয়ে কীর্তন করছেন, কখনও আবার ব্যারাকপুরে গৃহস্থবাড়িতে রুটি চেয়ে খাচ্ছেন। সে ভাবেই এ দিন হাজীনগরের সংকটমোচন মন্দিরে যান তিনি। অথচ গত ১০ বছর সাংসদ থাকাকালীন এই মন্দিরে কখনও আসেননি তিনি, এমনটাই অভিযোগ এলাকাবাসীর। এমনকি, ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে হাজিনগরে যে দাঙ্গার ঘটনা হয়েছিল তখনও পরিস্থিতি সামাল দিতে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব দেননি তাঁর দলের শ্রেষ্ঠ সাংসদকে। বরং সে যাত্রায় ভাটপাড়া থেকে অর্জুন সিংকে হাজিনগর এসে পরিস্থিতি সামাল দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সময় থেকেই মুকুল-তৃণমূল দূরত্ব বাড়ছিল! তাই হাজিনগরের দাঙ্গার সঙ্গে মুকুল রায় ও তাঁর বিধায়ক পুত্রকে কোণঠাসা করতে অর্জুনকে ব্যবহার করেছিলেন মমতা।

হাজিনগরের দাঙ্গা সামাল দিতে বীজপুর বিধানসভায় পাড়ি দিয়ে কাঁচরাপাড়া ও হালিশহর পুরসভার মুকুল বিরোধী কাউন্সিলরদের নেতা হয়ে যান অর্জুন। তখন কেই বা জানত, ২০১৯-এ রাজনীতির পাশা খেলার দান পাল্টাবে! যে অর্জুনে ভরসা করছেন দিদি, সেই হবেন তাঁর প্রতিপক্ষ।‌ গতবছর পঞ্চায়েত ভোটে যখন ব্যারাকপুর লোকসভার অধীন সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বিধানসভা আমডাঙায় সিপিএমের সঙ্গে তৃণমূলের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল, তখনও দিদির আস্থা ছিল অর্জুনেই। তাই ভোট প্রচারে নেমে ব্যারাকপুরের মাটির সঙ্গে যোগ না থাকা দীনেশ ত্রিবেদী এই সময় সবচেয়ে অসহায়। ব্যারাকপুরের রাজনীতিতে কে কোন দিকে, তাই বুঝে উঠতে পারছেন না তিনি।

ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চল থেকে নির্বাচিত তৃণমূলের এক জনপ্রতিনিধির কথায়, “দীনেশদা যদি গত ১০ বছরে দলের লোকের সঙ্গে সঠিকভাবে সম্পর্ক রক্ষা করতেন, তাহলে আজ তাঁকে এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হত না।” ওই নেতার কথায়, “শুভ্রাংশু যতই দীনেশদার পাশে থেকে তৃণমূলের প্রচার করুন না কেন, তাকে মন থেকে আর দলের কেউ বিশ্বাস করে না।”

বস্তুত,একসময় মুকুল-শুভ্রাংশুকে “টাইট” দিতে অর্জুনকে বীজপুর পাঠিয়েছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো। ফলে বছর তিনেক ধরে মুকুল বিরোধী তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়েছিলেন অর্জুন সিং। এখন অর্জুন বিজেপির প্রার্থী হওয়ায় সেই নেতাকর্মীরাও তৃণমূল কংগ্রেসের সন্দেহের নজরে। বর্তমানে ব্যারাকপুরের রাজনীতি “ঘেঁটে ঘ” হয়ে গিয়েছে বলেই দাবি ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের এক তৃণমূল নেতার। এমতাবস্থায় দীনেশ ত্রিবেদী অনিচ্ছাসত্ত্বেও মুকুল পুত্র শুভ্রাংশু-সহ একদা অর্জুনপন্থীদের নিয়েই প্রচারে বের হতে বাধ্য হচ্ছেন। কার্যত ব্যারাকপুরে শাসক দলের অন্দরের রাজনীতিতে এখন অবিশ্বাসের বাতাবরণ।

তবে আম ভোটারদের মধ্যে আলোচনা, কোনও নীতিগত প্রতিবাদ জানিয়ে অর্জুন সিং তৃণমূল ছাড়েননি। ছেড়েছেন ব্যক্তিগত স্বার্থে। তাই রাতারাতি ব্যারাকপুরের মানুষ তাকে উজার করে ভোট দেবেন এমন ভাবাটা ভুল হবে। অন্যদিকে, দীনেশ ত্রিবেদীর গত ১০ বছরে ট্র্যাক রেকর্ড বিচার করলে ব্যারাকপুরের মানুষের কাছে শূন্যই তাঁর প্রাপ্য।‌ তবে প্লাস পয়েন্ট রয়েছে তাঁর পক্ষে। অর্জুন সিং যেমন দাপট দেখাতে কোনও কোনও ক্ষেত্রে সন্ত্রাসের আশ্রয় নিয়েছেন ব্যারাকপুরে, দীনেশ ত্রিবেদী সযত্নে সেই সমস্ত বিষয়গুলি এড়িয়ে গিয়েছেন গত ১০ বছরে। তবে ভোট বিশ্লেষকদের মতে, এই আসনে সিপিএম আড়াই লাখ ভোট ধরে না রাখতে পারলে দীনেশ ত্রিবেদীর জয়ের সম্ভাবনা কম।

২০১৪ সালে ব্যারাকপুর লোকসভা যেভাবে ভোট করেছিলেন অর্জুন সিং-পার্থ ভৌমিকরা। এবার তেমনটা করা সম্ভব হবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। তাই গত বারের মত দিনেশ ত্রিবেদী ৪৬.০৭ শতাংশ ভোট পেয়ে যাবেন, তা আর হিসেবে ধরছেন না তৃণমূলের ভোট ম্যানেজাররা। সম্প্রতি ভাটপাড়া পুরসভায় অর্জুন সিংয়ের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পাশ করিয়েছে তৃণমূল। কিন্তু লোকসভা ভোটে সেই প্রভাব খাটবে না বলেই মত তাদেরই। বরং অর্জুন সিং প্রার্থী হওয়ায় গতবারে বিজেপির প্রাপ্ত ২২.১৫ শতাংশ ভোট যে অনেকটাই বৃদ্ধি পাবে তাও মেনে নিচ্ছে তৃণমূলেরই একাংশ। সেবার সিপিএম প্রার্থী সুভাষিনী আলি পেয়েছিলেন ২৬.১৯ শতাংশ ভোট। সেই ভোটের বড় অংশ বিজেপিমুখী হলেই ব্যর্থ হতে পারে দীনেশ ত্রিবেদীর সংকটমোচন মন্দির যাত্রা!

Shares

Comments are closed.