শনিবার, নভেম্বর ২৩
TheWall
TheWall

কন্যাসন্তান জন্মালে ১১১টি গাছ লাগানো হয় এই গ্রামে! লিঙ্গবৈষম্য দূর করার অস্ত্র যেন প্রকৃতি

দ্য ওয়াল ব্যুরো: সত্য সেলুকাস, কী বিচিত্র ই দেশ! ভারতের সম্পর্কে এই মন্তব্য সেই কবে করেছিলেন আলেকজান্ডার। ইতিহাসের পাতায় এই মন্তব্য আজও জ্বলজ্বল করছে। কিন্তু শুধু ইতিহাসের পাতায় নয়, বহু বছর পেরিয়ে এসে আজও এ দেশেই এমন সব বৈপরীত্য দেখা যায়, যা একই ভাবে অবাক করে সকলকে। তাই এ দেশেরই কোনও রাজ্যে যখন তিন মাসে একটিও কন্যাশিশু জন্মায় না, কোনও রাজ্য যখন এগিয়ে থাকে কন্যাভ্রূণ হত্যায়, তখন রাজস্থানের পিপালান্ত্রি গ্রাম যেন হয়ে উঠেছে আলোর দিশা! কারণ এ গ্রামের বাসিন্দারা বিশ্বাস করেন, কন্যাসন্তান জন্মানো যেন আশীর্বাদ। আর সেই আশীর্বাদকে রীতিমত উৎসবের মাধ্যমে উদযাপন করে তারা। এ গ্রামে এক একটি কন্যাসন্তান জন্মালে তার নাম করে রোপন করা হয় ১১১টি চারাগাছ!

লিঙ্গবৈষম্য এখনও বহাল এ দেশের সমাজে

বিজ্ঞানে-প্রযুক্তিতে দেশ যতই এগোক, যতই চন্দ্রযান পৌঁছে যাক চাঁদের পিঠে, তবু এ দেশের অনেক পরিবারে এখনও বংশপ্রদীপ হিসেবে আলাদা আদর পায় পুত্রসন্তান। অনেক পরিবারই কন্য়া সন্তান জন্মালে দুঃখ পায়। সেখানে পিপলান্ত্রি যেন অনন্য এক সুন্দরের প্রতীক! শুধু কন্যাসন্তানের সমাদর বলে নয়, কন্যা-প্রতি ১১১টি গাছ পোঁতাও যে এই সময়ে কতটা জরুরি, তা  আর বলার অপেক্ষা রাখে না। গ্রামবাসীরা এই বার্তাও দেন, জনসংখ্যা বাড়লেই তা পরিবেশের জন্য কোনও হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে না।

আগামী প্রজন্মের জন্য সবুজ ভবিষ্যৎ

গ্রামবাসীরা বলছেন, এই প্রথা চালু হওয়ার পর থেকে এখনও পর্যন্ত প্রায় আড়াই লক্ষ নতুন গাছ লাগানো হয়েছে গ্রামে এবং আশপাশে। কিন্তু কবে থেকে শুরু হল এই প্রথা? কী ভাবেই বা শুরু হল?

লোকমুখে জানা যায়, বহু বছর আগে শ্যামসুন্দর পালিওয়াল নামের এক গ্রামপ্রধানের কন্যাসন্তান খুব অল্প বয়সে মারা যায়। প্রিয় শিশুকন্যার স্মৃতির উদ্দেশে তিনিই চালু করেছিলেন এই প্রথা। চরম মানসিক যন্ত্রণা থেকে এই কাজ করলেও, তা সুফল দিয়ে চলেছে আজও। ভবিষ্যতেও দিতে থাকবে বলেই বিশ্বাস সকলের। পরিবেশবান্ধব এই ঐতিহ্যটি আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে চলেছে নিঃশব্দে।

কন্যাসন্তান কিন্তু বোঝা নয়!

শুধু তাই নয়। কন্যাসন্তানদের জন্ম উদযাপন করতে একটি বিশেষ তহবিলও গঠন করেছে ওই গ্রামের বাসিন্দারা। নিয়ম করা হয়েছে, গ্রামে কোনও কন্যাসন্তানের জন্ম হলেই সেই পরিবারের তরফ থেকে ১০,০০০ টাকা লগ্নি করতে হবে তহবিলে। বাকি ২১ হাজার টাকা চাঁদে দিয়ে তুলবে গ্রামবাসীরা। সেই ৩১ হাজার টাকা জমা করে রাখা হবে ব্যাঙ্কে। ২০ বছর পরে সুদ-সহ ফেরত পাওয়া যাবে পুরো টাকাটা। তখন তার উচ্চশিক্ষার জন্যই হোক বা কোনও কাজে হোক বা বিয়েতে হোক, সে টাকা খরচ করতে পারবেন মা-বাবা। তাঁরা যেন কোনও ভাবেই মেয়েকে বোঝা মনে না করেন, সে উদ্দেশেই এই নিয়ম বলে মনে করা হয়।

গাছ লাগাতে হবে, মেয়েকে পড়াতে হবে, বিয়েও দেওয়া চলবে না

তবে এখানেও শেষ নয়। এই তহবিলে লগ্নি করতে হলে বা টাকাটি পেতে হলে আরও দু’টি বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে যায় পরিবার। প্রথমত, প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত মেয়ের বিয়ে দিতে পারবেন না তাঁরা এবং দ্বিতীয়ত, বিয়ে দেওয়ার আগে মেয়েকে যথেষ্ট পড়াশোনা করাতে হবে।

এ সবের পাশাপাশি গাছ লাগানো তো আছেই। তবে শুধু গাছ লাগিয়েই থেমে থাকেন না গ্রামবাসীরা। নিয়মিত করেন পরিচর্যাও। উইপোকা বা অন্যান্য কীটপতঙ্গের হাত থেকে রক্ষা করতে গাছের চারপাশে ঘৃতকুমারী গাছ লাগান তাঁরা। নিয়মিত জল দেন, সার দেন। গাছ বড় হলে, তাতে ফুল বা ফল ধরলে সেসব বিক্রি করে অর্থও উপার্জন করেন তাঁরা।

ঐতিহ্য যখন সমাজ গড়ার হাতিয়ার

পিপলান্ত্রি গ্রামের এই সংস্কৃতি যে শুধু মেয়েদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করে তাই নয়, প্রকৃতির প্রতি তাদের ভালোবাসারও অনন্য নজির স্থাপন করেছে। তথ্য বলছে গত ছ’বছরে প্রায় আড়াই লাখ গাছ লাগানো হয়েছে এই গ্রামে। এই সংস্কৃতি গ্রামের সামাজিক জীবনেও অনেক শান্তি এনেছে। কন্যাশিশুদের প্রতি দায়িত্ব পালনে আগ্রহ বেড়েছে, কমেছে সমাজের অপরাধপ্রবণতা।

লিঙ্গবৈষম্য বিনাশ করা এবং প্রকৃতি রক্ষা করার লড়াই যেন হাতে হাত রেখে এগিয়ে চলেছে রাজস্থানের অনামী এই গ্রামে।

Comments are closed.