সোমবার, ডিসেম্বর ১৬
TheWall
TheWall

গুগল ডুডলে বিক্রম সারাভাই: ভারতীয় মহাকাশ গবেষণার এই প্রাণপুরুষের মৃত্যু আজও রহস্যে ঘেরা

চৈতালী চক্রবর্তী 

১৯৭১ সালের ৩১ ডিসেম্বর। ভারতের সমস্ত সংবাদপত্রে আলোড়ন তোলে একটাই খবর। ইসরোর প্রতিষ্ঠাতা, ভারতের মহাকাশ গবেষণার প্রাণপুরুষ বিজ্ঞানী বিক্রম সারাভাইয়ের রহস্য মৃত্যু। কেরলের কোভালামের সরকারি রিসর্টে সারাভাইয়ের নিথর দেহ উদ্ধার হয় তাঁরই পছন্দের ঘর থেকে। শরীরে আঘাতের কোনও চিহ্ন নেই। মৃত্যুর কারণ অজানা। ৫২ বছরের সুস্থ, তরতাজা মানুষটার মৃত্যু কারণ আজও রহস্যই রয়ে গিয়েছে দেশবাসীর কাছে।

ডঃ বিক্রম আম্বালাল সারাভাই। তাঁকে ভারতের ‘অন্তরীক্ষ গবেষণার জনক’ বলা হয়। তাঁকে সম্মান জানিয়েই ঐতিহাসিক চন্দ্রযাত্রায় ‘বিক্রম’ নামটা যোগ করেছে ইসরো। ল্যান্ডার তৈরি হয়েছে প্রয়াত বিক্রম সারাভাইয়ের নামেই। পদার্থবিদ, গবেষক, উদ্ভাবক ডঃ বিক্রম সারাভাইকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আজ ১২ অগস্ট তাঁর জন্মদিনকে সেলিব্রেট করছে গুগল ডুডল।

আমদাবাদে জন্মগ্রহণ করেন বিজ্ঞানী বিক্রম সারাভাই। ১৯১৯ সালের ১২ অগস্ট।  গুজরাটের বর্ধিষ্ণু সারাভাই পরিবার তখন বেশ জনপ্রিয়। শিল্পপতি শেঠ আম্বালাল সারাভাই মহাত্মা গান্ধীর একনিষ্ঠ  ভক্ত। স্বাধীনতা সংগ্রামে এই পরিবারেরও অবদান রয়েছে। বিক্রমের দিদি মৃদুলা সারাভাই স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন। তবে বিক্রমের আকর্ষণ ছিল অন্য জায়গায়। পদার্থবিদ্যা, সংখ্যাতত্ত্ব থেকে ক্রীড়া জগৎ সবেতেই তাঁর জ্ঞান অগাধ। পদার্থবিদ্যা তাঁকে হাতছানি দিত। আগ্রহ ছিল ধ্রুপদী সঙ্গীত ও নৃত্যকলাতেও। তাঁর স্ত্রী মৃণালিনী ছিলেন ক্লাসিকাল ডান্সার।

স্ত্রী মৃণালিনীর সঙ্গে ডঃ বিক্রম সারাভাই

গুজরাট কলেজে পড়াশোনা সেরে পাড়ি দেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁর গবেষণার গুরু ছিলেন ডঃ সিবি রমন। কেমব্রিজ থেকে পিএইচডি শেষে দেশে ফিরে পরিবার ও বন্ধুদের সাহায্যে ১৯৪৭ সালের ১১ নভেম্বর আমদাবাদে গড়ে তোলেন ‘ফিজিক্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি’ (পিআরএল)। যা ছিল ইসরো পূর্বসুরি। মাত্র ২৮ বছর বয়সে তৎকালীন ভারত সরকারের কাছে আর্জি জানিয়েছিলেন দেশের মাটিতে মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তুলবেন। ইন্ডিয়ান স্পেল রিসার্চ ইনস্টিটিউট বা ইসরোর প্রাণপুরুষ তিনিই।

১৯৬৬ সালে আমদাবাদে কমিউনিটি সায়েন্স সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন যা এখন বিক্রম সারাভাই স্পেস সেন্টার নামে পরিচিত। পরবর্তীকালে অ্যাটোমিক এনার্জি কমিশনের চেয়ারম্যানও হয়েছিলেন তিনি। পিআরএল ছাড়াও আমদাবাদের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট, কমিউনিটি সায়েন্স সেন্টার, দর্পণ অ্যাকাডেমি-সহ একাধিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিলেন তিনি। তাঁরই অনুপ্রেরণায় ১৯৭৫ সালে রুশ কসমোড্রোম থেকে ভারতের প্রথম উপগ্রহ ‘আর্যভট্ট’-এর সফল উৎক্ষেপণ হয়। তাঁর সহকর্মীরা জানিয়েছিলেন, সারাভাই নাকি প্রায়ই বলতেন, ‘‘উন্নয়নশীল দেশের মহাকাশ গবেষণা নিয়ে অনেকেই আঙুল তুলবেন। তবে ভারতের লক্ষ্য প্রতিযোগিতা নয়। চাঁদে পাড়ি দেওয়া ভারতবাসীর স্বপ্ন। মহাকাশ অভিযানে অন্য দেশের উপর নির্ভরশীল হয়ে কেন থাকব আমরা!  লক্ষ্য ও এগিয়ে যাওয়ার আগ্রহ দেশবাসীর মধ্যে তৈরি করাই আমার মূল উদ্দেশ্য।’’ ১৯৬৬ সালে পদ্মভূষণ ও ১৯৭২ সালে মরণোত্তর পদ্মবিভূষণ খেতাব দেওয়া হয় তাঁকে।

ডঃ এপিজে কালামের সঙ্গে বিক্রম সারাভাই। ছবি সৌজন্যে: ইসরো

ডঃ এপিজে আবদুল কালামের ইন্টারভিউ তিনিই করেছিলেন। কালামের মেন্টর, গুরুও ছিলেন তিনি। আবদুল কালাম বলেছিলেন, ‘‘ডঃ বিক্রম সারাভাইয়ের মুখোমুখি যখন বসেছিলাম আমি তখন সবে কাজ শিখছি। নবীন বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি আমাকে সুযোগ দেন। বলেন, আমার মধ্যে প্রতিভা আছে। উন্নতি করতে পারলে নিজের চেষ্টাতেই করব, আর ব্যর্থ বলে তার দায়িত্বও আমার।’’

ভারতীয় মহাকাশ গবেষণাকে সাফল্যের চূড়া চিনিয়েছিলেন যিনি তাঁর মৃত্যু রহস্যের উপর থেকে আজও যবনিকা সরেনি। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে কোভালামে নিজের পছন্দের সরকারি রিসর্টে ছিলেন সারাভাই। একটি রুশ রকেটের উৎক্ষেপণ দেখতেই কোভালামে গিয়েছিলেন তিনি। হামেশাই যেতেন। থাকতেন ওই সরকারি রিসর্টের নিজের পছন্দের ঘরে। ৩১ ডিসেম্বর সকালে ওই ঘর থেকেই ডঃ বিক্রম সারাভাইয়ের প্রাণহীন দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। জানা গিয়েছিল, দেহে কোনও আঘাতের চিহ্ন ছিল না। বাইরে থেকে কোনও অস্বাভাবিকতাও নজরে পড়েনি। ঠাকুমা সরলাদেবীর অনুরোধে মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়নি। তাই মৃত্যুর কারণ নিয়ে ধোঁয়াশাও কাটেনি।

(বাঁ দিক থেকে) ডঃ শান্তি স্বরূপ ভাটনাগর, ডঃ হোমি জাহাঙ্গির ভাবা, স্যর সিভি রমন এবং ডঃ বিক্রম সারাভাই

তদন্ত শুরুও হয়েছিল। তবে ধামাচাপা পড়ে গিয়েছিল উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে। বিক্রম সারাভাইয়ের সহকর্মী কমলা চৌধুরীর দাবি ছিল, মৃত্যুর কয়েকদিন আগে থেকেই নাকি সারাভাই তাঁকে বলছিলেন, আমেরিকা ও রাশিয়া তাঁর ওপর কড়া নজর রাখছে। কড়া নিরাপত্তার ঘেরাটোপেও রাখা হয়েছিল বিজ্ঞানীকে। তবে শেষরক্ষা হয়নি।

১৯৬৬ সালের জানুয়ারিতে আল্পস পর্বতের উপর এয়ার ইন্ডিয়ার ১০১ বিমান ভেঙে পড়ে মৃত্যু হয়েছিল ভারতের পারমাণবিক গবেষণার জনক ডক্টর হোমি জাহাঙ্গির ভাবার। এই মৃত্যুকেও অন্তর্ঘাত বলে দাবি করেছিল অনেক মহলই। এর পর ১৯৭১ সালে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণার পথিকৃৎ ডঃ বিক্রম সারাভাইয়ের আকস্মিক মৃত্যু। অনেকেই দাবি করেছিলেন বিজ্ঞানী হোমির মতোই অন্তর্ঘাতের শিকার হয়েছিলেন বিক্রম সারাভাই।  তবে প্রমাণ নেই। নেই সুনির্দিষ্ট তথ্যও। আজও রহস্যের চাদরে ঢেকে

Comments are closed.