রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৫

১৩ হাজার ফুট উচ্চতার পাহাড় ঘেরা বৌদ্ধ মঠে অভিনব সমাবর্তন! স্নাতক হলেন ৫২ জন ‘হিমালয়ান হিরো’

দ্য ওয়াল ব্যুরো: হিমালয়কে রক্ষা করা এবং হিমালয়ের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যকে মানুষের কাজে কী ভাবে আরও বেশি করে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে নিত্য গবেষণা করছেন তাঁরা। সেই গবেষণাকে হাতেকলমেও কাজে লাগাচ্ছেন নানা ভাবে। সকলের অগোচরে, পাহাড়ের কোলে এক  প্রতিদিন হিমালয়ের জীবনযাত্রাকে সুন্দর থেকে সুন্দরতর করার কাজে ব্রতী এই তরুণ-তরুণী দল কিন্তু অনেকের কাছেই ‘হিমালয়ের হিরো’!

সেই হিরোদের নিয়েই অভিনব এক সমাবর্তন অনুষ্ঠান আয়োজিত হল লাদাখের হেমিস গুম্ফায়। ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ১৩ হাজার ফুট উচ্চতায়, উজ্জ্বল বাদামি রঙের শুষ্ক পাহাড় দিয়ে ঘেরা পরিবেশ। সেখানেই দীর্ঘ ও দুর্গম পথ পেরিয়ে সপ্তদশ শতকে হেমিস মঠ প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন বৌদ্ধ ভিক্ষুরা। এখন আর দুর্গমতা নেই ঠিকই, কিন্তু পরিবেশ রয়ে গেছে একই রকম।

সপ্তদশ শতকের সেই বৌদ্ধমঠের উঠোনে, উজ্জ্বল ও রঙিন প্রেয়ার-ফ্ল্যাগ ঘেরা এক মঞ্চে এসে জড়ো হয়েছেন ৫২ জন কৃতী ছাত্র-ছাত্রী, যাঁরা হিমালয়ের নানা অঞ্চলে বাণিজ্য, পরিবেশ, শিক্ষা এবং এলাকার বাসিন্দাদের বেকারত্ব সমস্যা নিয়ে নানা রকম সৃজনশীল এবং বাস্তবমুখী উপায় বার করেছেন। তাঁদেরই সম্মান জানানোর জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে খোদ হিমালয়ের কোলে এই ছবির মতো এলাকা। এমন সমাবর্তন উৎসব দেশে প্রথম, দাবি করছেন হেমিস গুম্ফা কর্তৃপক্ষ।

শুধু তা-ই নয়। দেশের মধ্যে এই প্রথম, হিমালয় এলাকার উন্নয়ন এবং প্রাকৃতিক সংরক্ষণ সংক্রান্ত পাঠ্যক্রমে স্নাতক হলেন এত জন পড়ুয়া। লাদাখের নারোপা ফেলোশিপের অধীনে গবেষণারত এই ৫২ জন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বেছে নেওয়া হয়েছে এই ৫২ জন পড়ুয়াকে। যদিও এঁদের মধ্যে তিন ভাগের এক ভাগ ছাত্রছাত্রী লাদাখেরই বাসিন্দা।

সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রথাগত রোব গায়ে চাপিয়ে শংসাপত্র নিলেন তাঁরা।  তবে কালো নয়, তাঁদের রোবের রং ছিল উজ্জ্বল মেরুন। ঠিক যেমন থাকে, বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের গায়ে।

লাদাখের রাজধানী লেহ শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে, পাহাড়ের কোলে অবস্থিত ছোট্ট গ্রাম হেমিস। গ্রামের নীচ দিয়েই বয়ে গেছে সিন্ধু নদী। সেই গ্রামেই হেমিস গুম্ফা। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, কেউ যেন উঁচু পাহাড়ের গায়ে হাতে করে বসিয়ে দিয়েছে ওই বৌদ্ধ মঠকে। বিশ্বাস হয় না, দু’হাজার বছরেরও বেশি সময় আগে, ওই দূর পাহাড়ে এমন নির্মাণ সম্ভব!

হেমিসের সমাবর্তন মঞ্চে উঠে কৃতীদের অভিনন্দন জানিয়ে, নারোপা ফেলোশিপের প্রতিষ্ঠাতা, বৌদ্ধ সন্ন্যাসী দ্রুকপা থুকসে রিংপোচে বলেন, “এমন ছবির মতো সুন্দর জায়গায় হয়তো আগে কখনও কোনও সমাবর্তন উৎসব হয়নি। তাই আপনারা যাঁরা আজ এই ফেলোশিপে স্নাতক হলেন, তাঁদের কাছে শুধু ডিগ্রি নয়, এই মঞ্চটিই যেন আরও একটা বড় পাওনা।”

এই সমাবর্তন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য রুদ্রাংশু মুখোপাধ্যায়-ও। তিনি কৃতীদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের। তাঁর কথায়, “আজ আপনাদের যেমন অভিজ্ঞতা হচ্ছে, কিছুটা তেমনই অভিজ্ঞতা হয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতীদের। প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়ার সুযোগ পান তাঁরাও।”

শিক্ষাবিদেরা বলছেন, এই নারোপা ফেলোশিপের মূল উদ্দেশ্যটিই অভিনব ও প্রশংসনীয়। হিমালয়কে রক্ষা করা এবং হিমালয়ের মানুষদের ভাল থাকাকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে পাঠ্যক্রম। প্রথাগত শিক্ষা থেকে দূরে প্রকৃত জীবন শিক্ষা আহরণ করে তা প্রয়োগ করেছেন কৃতীরা। তাই জন্যই তো তাঁরা ‘হিমালয়ান হিরো’!

Comments are closed.