কিউবার প্লায়া প্যারাইসো: রাজকীয় নীল সৈকতে আদিম প্রকৃতির গন্ধ, ইতিহাস আর সৌন্দর্যের টানেই ছুটে যেতে হয় ফিদেল কাস্ত্রোর দেশে

ফিদেল কাস্ত্রোর দেশে দাঁড়িয়ে রাজকীয় নীল সমুদ্রের দিকে চাইলে তার এই উন্মাদিনী রূপের আড়ালে শান্ত-স্নেহশিলা কন্যার ছবিই ভেসে ওঠে। সমুদ্র এখানে স্নিগ্ধ, মায়াময়। দিগন্তরেখায় যেখানে তার মিলন হয়েছে সেখানকার রঙ রাজকীয় নীল।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    চৈতালী চক্রবর্তী

    “কোথা তার তল! কোথা কূল! বলো কে বুঝিতে পারে/তাহার অগাধ শান্তি, তাহার অপার ব্যাকুলতা, তার সুগভীর মৌন, তার সমুচ্ছল কলকথা”—‘সোনার তরী’ কাব্যে ‘সমুদ্রের প্রতি’রবীন্দ্রনাথের অনুভূতি ছিল ‘স্নেহচঞ্চলা, স্নেহপূর্ণ স্ফীতস্তনভারে’ উন্মাদিনীর মতো ছুটে এসে সে ধরণীর বুকে আছড়ে পড়ে ।

    ফিদেল কাস্ত্রোর দেশে দাঁড়িয়ে রাজকীয় নীল সমুদ্রের দিকে চাইলে তার এই উন্মাদিনী রূপের আড়ালে শান্ত-স্নেহশিলা কন্যার ছবিই ভেসে ওঠে। সমুদ্র এখানে স্নিগ্ধ, মায়াময়। দিগন্তরেখায় যেখানে তার মিলন হয়েছে সেখানকার রঙ রাজকীয় নীল। গভীর থেকে যতই সে তার রূপ নিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ততই তার গাঢ় রঙের তেজ কমেছে। সৈকতের কাছে যেন হালকা নীল মখমলের কাপড়, কোথাও আবার সবজে-নীলে যেন ক্যানভাসে শিল্পীর তুলির টান। ঝুরো সাদা বালির উপরে আদর মাখিয়ে দিয়ে যায়। কায়ো লার্গো দেল সুর—ক্যারিবিয়ান রিসর্ট আইল্যান্ড। ছবির মতো সুন্দর এই দ্বীপ কিউবার দক্ষিণ উপকূলে।

    সাদা বালির সৈকত জুড়ে হোটেল, রেস্তোরাঁর ছড়াছড়ি। স্কুবা ডাইভিং, প্রবাল প্রাচীরের সৌন্দর্য দেখতে পর্যটকদের আনাগোনা লেগেই থাকে। কায়ো লার্গো দেল সুরের মূল আকর্ষণ হল তার পশ্চিম উপকূল বরাবর প্লায়া সিরেনা ও প্লায়া প্যারাইসো সৈকত। কায়ো লার্গো থেকে আগে ট্রেনে চেপে এই সৈকতগুলো ঘুরে দেখা যেত। এখন ট্যাক্সি বা গাড়ি বুক করে যাওয়া যায়। সি টার্টলদের ডিম পাড়ার সময় গেলে সেই দৃশ্যে মনের ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখার মতো। তবে সমুদ্রের নীল আর সৈকতের ‘সান বাথ’ যদি টার্গেট হয় তাহলে কায়ো লার্গোর তুলনা নেই।

    আরও পড়ুন: পোলিশ ইতিহাস আর গথিক স্থাপত্যের শহর, ফিনিক্স পাখির মতোই বারে বারে ফিরে এসেছে ক্র্যাকো

    হুড়োহুড়ি ভিড় এখানে হয় না। কারণ বিশ্বের অন্যান্য জমজমাট সমুদ্র সৈকতগুলির তুলনায় এই প্রত্যন্ত ক্যারিবিয়ান আইল্যান্ডে পর্যটকদের ভিড় তুলনায় কম। প্লায়া সিরেনা হয়ে প্লায়া প্যারাইসোতেই দু’দিন আরামে কাটিয়ে দেওয়া যায়। পকেটে যদি টান না পড়ে তাহলে দুরন্ত বিচ রিসর্টে মায়াবী সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আরও কয়েকটা দিন বাড়িয়ে নেওয়াই যায়। ইতালীয়, ফ্রেঞ্চ-সুইডিশ, মেক্সিকান কুইসিনের অভাব নেই। উপরি পাওনা অ্যাফ্রো-কিউবান মিউজিক। সন্ধে থেকেই খাওয়াদাওয়া, গান-বাজনায় মেহফিল সেজে ওঠে। রাইস আর বিনসের ডিশ এখানে ডেলিকেসি। খুব ভাল মাছ পাওয়া যায়। সি-ফুড অসামান্য। কিউবার কফির কথা তো আলাদা করে না বললেও চলে। আর হাভানা সিগার। কফি আর সিগার ধরিয়ে রাতের সমুদ্র দেখার আলাদা আকর্ষণ আছে। রাজকীয় নীল তখন সন্ধের ধূসর-খয়েরি থেকে রঙ বদলে ধীরে ধীরে নিকষ কালোর চাদর টেনে নিয়েছে। সাদা মুক্তোর মতো হাসি ছড়িয়ে দিচ্ছে সৈকতের প্রতিটি বালুকণায়। প্লায়া প্যারাইসোকে স্থানীয়রা বলেন ‘প্যারাডাইস বিচ’ । এক স্বর্গীয় সৌন্দর্য খেলা করে এই সৈকতে। রিসর্ট, গুটিকয়েক ক্লাব আর নিয়নের আলোয় একটুকরো আধুনিক পৃথিবীকে যেন অস্থায়ীভাবে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রকৃতির কোলে, বাকি সবটাই আদিম, অকৃত্রিম।

    আরও পড়ুন: আগ্নেয় দ্বীপে রূপকথা লেখে কালো বালির সৈকত, বরফরাজ্য আইসল্যান্ড এক রহস্য

    ইতিহাস বলে ১৪৯৪-তে ক্রিস্টোফার কলম্বাস নাকি কায়ো লার্গোর খোঁজ পেয়েছিলেন। একসময় জলদস্যুদেরও পছন্দের ঘাঁটি ছিল এই কায়ো লার্গো দেল সুর। এই দ্বীপের উত্তর দিকটায় রয়েছে প্রবাল প্রাচীর। ম্যানগ্রোভের বন। এদিকের আবহাওয়া একটু অন্যরকম। বেশিরভাগ সময়েই মেঘলা। হালকা শিরশিরানি হাওয়া শরীর ছুঁয়ে যাবে। সমুদ্রের নোনা গন্ধ আর ম্যানগ্রোভের সবুজ দেখতে দেখতে একটা বেলা আনায়াসেই কাটিয়ে দেওয়া যাবে।

    আরও পড়ুন: এ কি সেই দারুচিনি দ্বীপ! জাঞ্জিবারে প্রকৃতি আর ইতিহাসের যুগলবন্দি, বিশ্ব ঐতিহ্যের নিশান উড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে ‘স্টোন সিটি’

    কায়ো লার্গো দেল সুর যাদের ডেস্টিনেশন হয় তারা আগে কিউবা এবং তার অন্যান্য দ্বীপও দেখে নেয়। চে গেভারা, ফিদেল কাস্ত্রোর দেশ। বাঙালি কবেই এঁদের হিরোর স্থানে বসিয়েছে, তবে বাঙালির ভ্রমণ মানচিত্রে কিউবার নাম খুব একটা উঠে আসেনি। কিউবার দ্বীপগুলি যদি আকর্ষণের তালিকায় থাকে তাহলে একবার দেশটির ভৌগোলিক মানচিত্র ও ইতিহাস জেনে নেওয়াটা খুবই জরুরি। সমুদ্র সৈকত হোক বা প্রাচীন মিউজিয়াম, প্রকৃতি আর ইতিহাসের এক মেলবন্ধন ঘটেছে কিউবায়। আমেরিকার সাঁড়াশি চাপে এখানকার সমাজ-অর্থনীতিতে অনেক বদল এসেছে, অনেক প্রতিকূলতা, অনেক লড়াই লড়েছে কিউবা। লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পশ্চিমী উপনিবেশ এবং মার্কিন মদতে কায়েম হওয়া স্বৈরাচারী জমানার বিরুদ্ধে সংগ্রামে বড় ভূমিকা নিয়েছে কিউবা। ইতিহাস মনে রেখেছে তার রক্তক্ষয়ী বিপ্লবকে। তবুও এক আকাশ স্বাতন্ত্র্য ধরে রেখেছে এই দেশ। বিপ্লব-উত্তর কিউবার স্বাস্থ্য পরিষেবা ও শিক্ষা ব্যবস্থার রূপকার ছিলেন এর্নেস্তো চে গেভারা। তাঁরই অনুপ্রেরণায় গোটা পৃথিবীতেই নিজের মৌলিক আদর্শ ছড়িয়ে দিয়েছে কিউবা।

    উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার মাঝে ক্যারিবীয় ও মেক্সিকো উপসাগরের মধ্যে অবস্থিত। ক্যারিবিয়ান সি, গালফ অব মেক্সিকো আর উত্তর আটলান্টিক মহাসাগর ছুঁয়েছে কিউবাকে। এর পূর্বে টার্কোস আর কেইকেস দ্বীপ, উত্তরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাহামা দ্বীপপুঞ্জ এবং দক্ষিণে জামাইকা।

    আরও পড়ুন: চিয়াং মাই: বৌদ্ধ মন্দিরে পিছলে যায় সূর্যাস্তের আলো, পুরনো ইতিহাসকে আঁকড়েই শ্বাস নিচ্ছে ‘নতুন শহর’

    হাভানা

    প্রায় ৪০০ বছর ধরে স্পেনের উপনিবেশ ছিল। এখানকার স্থাপত্যে স্প্যানিশ ঔপনিবেশিকতার ছাপ স্পষ্ট। বাড়িঘরের আদলে পুরনো ধাঁচ। বেশিরভাগই ভিনটেজ। বিশেষত হাভানা, ত্রিনিদাদে গেলে মনে হবে সত্তরের দশকের কিউবা। হোমস্টে-তে থাকলে সবচেয়ে ভাল। এখানকার মানুষজনের কাছাকাছি থাকলে মাটির গন্ধ আরও ভালভাবে পাওয়া যায়। গরিব দেশ, কিন্তু শিক্ষা-সংস্কৃতি-স্থাপত্যে অসাধারণ উন্নত এক দেশ। হাভানা, পুরনো হাবানা, ভারাদেরো, ত্রিনিদাদ দেখলেই তার প্রমাণ পাওয়া যাবে। পুরনো হাভানাকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তকমা দিয়েছে ইউনেস্কো।

    ভারাদেরো

    ডিসেম্বরের মাঝামাঝি অথবা জুলাই-আগস্ট কিউবা ঘোরার আদর্শ সময়। এখানে পাবলিক ট্রান্সপোর্টের কোনও অসুবিধা নেই। গাড়ি বুক করে ইচ্ছামতো ঘোরার ব্যবস্থা আছে। চাইলে ট্যাক্সি, এসি বাস বা ট্যুরিস্ট বাসও বুক করে নেওয়া যায়।

    “সকলের মতোই আমিও অচিরে বিদায় নেব। কিন্তু আমরা যদি সমবেদনা ও আত্মমর্যাদার সঙ্গে কাজ করি, তাহলে মানুষের প্রয়োজনীয় সাংস্কৃতিক সম্পদ তৈরি করতে পারব”…ফিদেল কাস্ত্রোর ভাবধারা আজও অণুরণিত হয় কিউবায়।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More