আগ্নেয় দ্বীপে রূপকথা লেখে কালো বালির সৈকত, বরফরাজ্য আইসল্যান্ড এক রহস্য

আইসল্যান্ড মানেই এক শিরশিরানি অনুভূতি। সুমেরীয় বৃত্তের এই বরফরাজ্যে একই সঙ্গে শ্বেতশুভ্র বরফের স্তুপ, পাথুড়ে রুক্ষতা ও আগ্নেয়গিরির বীভৎসতা দেখা যায়। রসকষহীন সৌন্দর্যেরও যে একটা মায়াবী টান থাকে সেটা আইসল্যান্ডে না গেলে বোঝা যাবে না।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    চৈতালী চক্রবর্তী

    ‘দ্য সিক্রেট লাইফ অফ ওয়াল্টার মিটি’ সিনেমায় একটা দৃশ্য ছিল, যেখানে অভিনেতা বেন স্টিলার আইসল্যান্ডের নির্জন পথ দিয়ে আগ্নেয়গিরির দিকে সাইকেল ছুটিয়েছেন। এক শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ, আকাশে ঘন হয়ে আসা কালচে মেঘ আর এক অপার্থিব নিস্তব্ধতা।

    আইসল্যান্ড মানেই এক শিরশিরানি অনুভূতি। সুমেরীয় বৃত্তের এই বরফরাজ্যে একই সঙ্গে শ্বেতশুভ্র বরফের স্তুপ, পাথুড়ে রুক্ষতা ও আগ্নেয়গিরির বীভৎসতা দেখা যায়। রসকষহীন সৌন্দর্যেরও যে একটা মায়াবী টান থাকে সেটা আইসল্যান্ডে না গেলে বোঝা যাবে না। একদিকে সবুজের সমারোহ কেউ যেন শিল্পীর তুলির টানে এঁকে রেখেছে, অন্যদিকে নীল সমুদ্রের তটজুড়ে কালো বালির হাতছানি।

    কালো বালির সৈকত

    সমুদ্রের সফেন জলরাশি এই কুচকুচে কালো সৈকতে আছড়ে পড়ে যেন সাদা-কালোর ক্যানভাস তৈরি করছে। কালো বালির উপরে ছোট ছোট শিলাখণ্ড, কোথাও দানবীয় ব্যাসল্ট রক। গোধূলির নরম আলো কালো সৈকতের উপরে যেন সোনালী জরির পাড় বসিয়ে দেয়। আইসল্যান্ডের কালো বালির সৈকত তাই পর্যটকদের আকর্ষণের জায়গাও। সৌন্দর্য ও পর্যটক আকর্ষণের নিরিখে বিশ্বের জনপ্রিয় সমুদ্র সৈকতগুলির মধ্যে আইসল্যান্ডের ‘ব্ল্যাক স্যান্ড বিচ’ আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।

    ধূসর বা হলদেটে ঝুরো বালির বদলে পাথুড়ে কালো বালিরও একটা কারণ আছে। তার জন্য আইসল্যান্ডের ভৌগোলিক মানচিত্রটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপ মহাদেশের প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র হল আইসল্যান্ড। এর ভৌগোলিক অবস্থানও বিচিত্র। দেশের উত্তরে আটলান্টিক মহাসাগরে গ্রীনল্যান্ড, নরওয়ে, স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও ফারো দ্বীপপুঞ্জ। আইসল্যান্ডের উত্তর প্রান্ত আর্কটিক বা সুমেরু বৃত্তকে ছুঁয়েছে। প্রায় ডিম্বাকার দেখতে এই দ্বীপকে অনেকে আগ্নেয় দ্বীপও বলেন। প্রায় ১৩০টি আগ্নেয়গিরি রয়েছে এই দ্বীপে। যাদের মধ্যে বেশ কিছু এখনও সক্রিয়। আগ্নেয়গিরি ফুঁসে উঠলে গনগনে লাভাস্রোত ধেয়ে আসে সমতলের দিকে। কালো ছাইয়ের স্তুপ জমে সৈকতে। লাভা ঠাণ্ডা হলে সমুদ্রের জলে মিশে তার শেষ চিহ্ন রেখে যায়। কালো ছাই ঝুরো বালি হয়ে জমে থাকে সমুদ্র তটে। আইসল্যান্ডের সমুদ্র সৈকতে এই কালো বালিই দেখা যায়। রুক্ষ, পাথুড়ে কিন্তু খনিজ উপাদানে সমৃদ্ধ।

    রিং রোড

    আইসল্যান্ডে পাঁচটি ব্ল্যাক স্যান্ড বিচ জনপ্রিয়। তবে কালো বালির সৈকত বলতেই রিখিয়াভিক টাউনের রেইনিসগারা সৈকতের কথাই প্রথম মনে আসে। ভিক টাউনে দেখার জায়গার অভাব নেই। এখান থেকে গাড়িতে চাপলে দক্ষিণ উপকূল বরাবর পড়ে রেইনিসগারা সৈকত। রিং রোড হাইওয়ে ধরে জোরে গাড়ি ছোটালে সময় লাগবে প্রায় আড়াই ঘণ্টার মতো। সৈকতে পা দিলেই যে দৃশ্য ধরা পড়ে তাকে ক্যামেরার লেন্সে নয়, মনের পর্দায় বন্দি করে রাখতে হয়। দিগন্ত বিস্তৃত সমুদ্রের তট পুরোটাই কুচকুচে কালো। আর কালোরও যে এমন মোহময়ী রূপ হয় সেটা না দেখলে বোঝা যাবে না। স্থানীয়রা বলেন, এই সৈকত নাকি বিপজ্জনক। এখানে ট্রাভেল করতে হলে কিছু নিয়মকানুন মানতে হয়। তবে বিপদের কথা মাথায় না এনেই পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে এই ব্ল্যাক স্যান্ড বিচে।

    রিং রোড ধরে রাউন্ড ট্রিপে এর পর পরে স্কোগাফস জলপ্রপাত। হাইওয়ের দু’ধারে নির্জন, বসতি নেই বললেই চলে। রাস্তার দুপাশে টিলা দেখতে দেখতেই চোখে পড়বে জলপ্রপাত। প্রচণ্ড শব্দে কান পাতা দায়। নিসর্গ প্রকৃতির মধ্যে এমন একটা জলপ্রপাতে মন হারিয়ে যাবেই। এখানকার পরিবেশের মধ্যে যেন একটা আদিম সৌন্দর্য আছে। মানুষের কোলাহল সেখানে প্রবেশ করেনি।

    এই স্কোগাফস জলপ্রপাতের কাছেই আইসল্যান্ডের আরও একটি ব্ল্যাক স্যান্ড বিচ রয়েছে। সলহেমাসান্ডার রেক। আগ্নেয়শিলার ছড়াছড়ি সৈকতে। ওয়াটারপ্রুফ বুট বা রুক্ষ কালো বালির উপর দিয়ে হাঁটার জন্য সঠিক জুতো দরকার। স্থানীয়রা বলেন স্টর্ম-প্রুফ জ্যাকেট পরে এই বিচে আসতে হয়। সবসময় একটা ঝোড়ো হাওয়া খেলা করে সৈকতে। যেন মনে হয় উড়িয়ে নিয়ে যাবে।

    আইসল্যান্ডের সবচেয়ে সুন্দর ব্ল্যাক স্যান্ড বিচ বলা হয় স্টকসনেস সৈকতকে। বিশাল পাহাড় আর সমুদ্র একটা সীমারেখায় মিলেছে। ভিক টাউন থেকে ৬ ঘণ্টা লাগে এই সৈকতে যেতে। আইসল্যান্ডের পূর্ব উপকূলে পড়ে। শীতকালে ভেসট্রাহর্ন পাহাড় বরফে ঢেকে যায়। তাই সে সময় এখানে বেশ ঠাণ্ডা পড়ে। এখানকার সৈকতের বিস্তৃতিও বেশি। ঘণ্টা তিনেক না কাটালে এর সৌন্দর্য বোঝা যাবে না।

    স্টকসনেস বিচ থেকে ৪৫ মিনিটের দূরত্বেই ডায়মন্ড বিচ। আইসল্যান্ডের আরও একটা কালো বালির সৈকত। তবে এই বিচের বৈশিষ্ট্য আবার আলাদা। নীল জলে টুকরো টুকরো বরফ ভেসে বেড়াচ্ছে, তার উপর সোনা রোদ পড়ে যেন আলো পিছলে যাচ্ছে। সৈকতে বড় বড় বরফের চাঁই পড়ে থাকতে দেখা যায়। কোনও কোনওটির আয়তন মানুষের সমান। এই বিচের বিপরীতেই রয়েছে জোকুলসারলন হিমবাহ। বিশাল সেই হিমবাহের সামনে দাঁড়ালো মনে হবে এক অন্য পৃথিবীতে চলে এসেছি। তুষারাবৃত প্রকৃতির সেই রূপ দেখার মতো। জোকুলসারলন হল হিমবাহে তৈরি লেগুন। জমাটবাঁধা হিমবাহের উপর আবার গাইড নিয়েও যাওয়া যায়।

    সমতল ছাড়িয়ে একটু উপরে উঠলে যে সৈকতে রুক্ষ আগ্নেয় পাথর ও সবুজের মিশেল ঘটেছে সেটা হল দিরহালে বা ডিরহালে ব্ল্যাক স্যান্ড বিচ। রেইনিসগারা সৈকত থেকেই গাড়িতে কিছুটা পথ। তবে সৈকত অবধি গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ। পাহাড়ের নীচেই গাড়ি পার্ক করে পায়ে হেঁটে বিচ অবধি যেতে হয়। এখানে সমুদ্র আবার অন্যরকম। সৈকতে পাফিনস পাখিদের ঘুরে বেড়াতে দেখা যাবে। গরমকালে গেলে পাখিদের দেখা বেশি মিলবে। এই সৈকতে রুক্ষতার থেকেও নরমের আভা বেশি। কালো বালির সৈকতের ধারে সবুজের সারি। বহু বছরের পুরনো স্মৃতি আঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে লাইটহাউস।

    আইসল্যান্ড আসলে রূপকথার রাজ্য। ইউরোপের মূল ধারার সঙ্গে মিশে গেলেও এখানকার মানুষজন তাদের ঐতিহ্য, রীতিনীতিকে আঁকড়ে আছে এখনও। প্রকৃতিও যেন নিজেকে সাজিয়ে রেখেছে তার আদিম রূপেই। উত্তর মেরুর পাহাড়, নীল জলের লেগুন, কালো বালির সৈকতে নীল জলরাশির আনাগোনা সব নিয়েই এই পৃথিবীর মধ্যেও এক আলাদা পৃথিবীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। মানুষ নয়, প্রকৃতিই এখানে রাজা।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More