অতিরিক্ত ধূমপান বাড়াচ্ছে কোভিড সংক্রমণের ঝুঁকি! ধূমপায়ীদের বিপদ কতটা বললেন বিশেষজ্ঞ

ধূমপান কীভাবে বাড়ায় কোভিড সংক্রমণের ঝুঁকি? জানুন বিশেষজ্ঞের মতামত।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

সঞ্জীব আচার্য

কর্ণধার সিরাম অ্যানালিসিস

তামাকের সঙ্গে কোভিড সংক্রমণের সম্পর্ক আছে কিনা সেটা এখনও গবেষণার স্তরে। ধূমপান সংক্রমণের ঝুঁকি কতটা বাড়ায় সে নিয়েও গবেষণা চলছে। তবে বিজ্ঞানীদের ধারণা, সার্স-কভ-২ ভাইরাস যেহেতু ফুসফুসের সংক্রমণের জন্য দায়ী এবং এই ভাইরাসের প্রভাবে অ্যাকিউট রেসপিরেটারি সিনড্রোমে আক্রান্ত হন রোগী, তাই ফুসফুসের জন্য ক্ষতিকর যে কোনও কিছুই ভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কা বাড়াতে পারে। তার মধ্যে প্রথমেই রয়েছে সিগারেট তথা তামাকজাত পণ্য।

গবেষকদের একাংশ বলছেন, ধূমপায়ীদের করোনায় সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। কারণ সিগারেট এমনভাবে ফুসফুসের নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতাকে তছনছ করে দেয় যে, ভাইরাস সহজেই সংক্রামিত করতে পারে শ্বাসযন্ত্রকে। আর সার্স-কভ-২ ভাইরাস যেহেতু প্রথমেই ফুসফুসকে তাদের নিশানা বানায়, তাই বলাই যেতে পারে যাদের এই অঙ্গটির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদেরই আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। অধিক ধূমপানের কারণে ফুসফুস শুধু দুর্বলই হয় না, নানা রোগ বাসা বাঁধে সেখানে। সিগারেটের ধোঁয়া এমনিতেই ফুসফুসের বারোটা বাজিয়ে রাখে, তার উপর ভাইরাল স্ট্রেন সেখানে ঢুকলে তাদের পক্ষে গোটা ফুসফুসকে কব্জা করে নেওয়া অনেক সহজ হয়ে যায়।

ফুসফুসের নানা রোগের রিস্ক-ফ্যাক্টর ধূমপান, ঝুঁকি বাড়াতে পারে কোভিড সংক্রমণেরও

শ্বাসনালীর সংক্রমণ, শুকনো কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা থেকে নিউমোনিয়া—ধূমপানের ক্ষতিকর দিক অনেক। ফুসফুসের নানা সংক্রামক রোগের পিছনে কোনও না কোনও ভাবে ধূমপানই দায়ী। দেখা গেছে, সিগারেটে আসক্তি যাঁদের বেশি, তাঁরাই ‘অ্যাকিউট রেসপিরেটারি ডিসট্রেস সিনড্রোম‘-এ বেশি আক্রান্ত হন।

এখন দেখে নেওয়া যাক, সিগারেটে একবার টান দিলে শরীরে কী কী ক্ষতিকর পদার্থ ঢুকছে। সিগারেটের উপাদানে আছে আর্সেনিক, টয়লেট ক্লিনারে ব্যবহৃত অ্যামোনিয়া, কীটনাশক ডিডিটি, নেলপলিশ রিমুভার অ্যাসিটোন, ব্যাটারিতে ব্যবহৃত ক্যাডমিয়াম, নিকোটিন-সহ আরও প্রায় ৭০০০ রকমের বিষ! ভাইরাসের সংক্রমণ যদি নাও হয়, তাহলেও অধিক ধূমপানে ফুসফুসের যে দফারফা হবে এটা বলাই বাহুল্য।

বিশ্বজুড়েই বিজ্ঞানীদের গবেষণা বলছে, সার্স-কভ-২ ভাইরাস নাক, মুখ দিয়ে ঢুকে শ্বাসনালীকে প্রথম আক্রমণ করে। কারণ নাক, মুখ ও গলায় থাকে গবলেট কোষ। এই কোষের সারফেসে রিসেপটর এসিই-২ প্রোটিন ভাইরাসদের বিশেষ পছন্দের। এই প্রোটিনের সঙ্গে ভাইরাল স্পাইক গ্লাইকোপ্রোটিন জোট বেঁধেই কোষে সরাসরি প্রবেশ করে। শ্বাসনালী দিয়ে তারা পৌঁছয় ফুসফুসে। যেসব কোষে ওই রিসেপটর প্রোটিন আছে সেখানেই ঢুকে ভাইরাসের বাড়বৃদ্ধি শুরু হয়। তবে ফুসফুসেরও একটা প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে। সব কোষকে সমানভাবে সংক্রামিত করতে পারে না ভাইরাস। কিন্তু দেখা গেছে, যাদের ফুসফুসের অবস্থা আগে থেকেই বেহাল, সেটা হতে পারে ধূমপান বা অন্য শ্বাসযন্ত্রের রোগের কারণে, তাদের ক্ষেত্রে ভাইরাস মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে ফুসফুসে। যার কারণেই শুরু হয় তীব্র শ্বাসকষ্ট। এমনও বলা হচ্ছে, যিনি ধূমপান করছেন তাঁর শরীরে যদি ভাইরাস থাকে তাহলে ধোঁয়ায় বা ধূমপায়ীর লালার কণার ভর করে সেই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে আশপাশে। অ্যারোসল বা বাতাস বাহিত কণায় এই ভাইরাস চার ঘণ্টারও বেশি বেঁচে থাকতে পারে বলেই জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

ধূমপায়ীদের বিপদ কতটা বেশি

লাগাতার ধূমপানে ফুসফুসের রোগ ঠেকানোর ক্ষমতা কমে যায়। ফুসফুসের মধ্যে যে সিলিয়েটেড কোষ থাকে সেগুলো দুর্বল হতে থাকে। এই সিলিয়েটেড কোষে ছোট ছোট চুলের মতো অংশ থাকে যা বাইরে থেকে শরীরে ঢোকা রোগজীবাণু বা ধুলোবালি ছেঁকে বাইরে বার করে দিতে পারে। অধিক ধূমপানে এই কোষের কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। তাই ধূমপায়ীদের মধ্যে যে কোনও ধরনের ফুসফুসের সংক্রমণ নিউমোনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা, টিবি ইত্যাদি বেশি হতে দেখা যায়। এই একই কারণে করোনা সংক্রমণের আশঙ্কাও তাঁদের বেশি।

গবেষণাও এমনও তথ্য সামনে এসেছে যে, ধূমপানের কারণে যদি ‘ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ’ বা ‘সিওপিডি’ নামের রোগ হয়ে থাকে, তাহলে ভাইরাস সেই শরীরে ঢুকলে তার বাড়বাড়ন্ত অনেক বেশি হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) রিপোর্ট বলছে,  প্রতি বছর বিশ্বে সিওপিডি-তে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা কয়েক কোটি। প্রতি ১০ সেকেন্ডে সিওপিডি-তে আক্রান্ত হয়ে এক জন রোগীর মৃত্যু হয়। হু প্রকাশিত ‘ইন্টারন্যাশনাল কোয়ালিশন এগেনস্ট সিওপিডি’ এবং ‘সিওপিডি ফাউন্ডেশন’-এর যৌথ সমীক্ষা রিপোর্টেও দেখা গেছে, অধিক ধূমপান, বাতাসের দূষণ এই সিওপিডি-র জন্য দায়ী। যাঁরা বেশি সিগারেটে আসক্ত তাঁদের সিওপিডি-র ঝুঁকি অনেক বেশি। কী কী উপসর্গ দেখা দেয় সিওপিডি-তে? ক্রমাগত কাশি, রাতে কাশির দমকে ঘুম ভেঙে যাওয়া, সিঁড়ি বা উঁচু জায়গায় ওঠানামার ক্ষেত্রে বুকে চাপ অনুভব করা বা শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়া, বুকের মধ্যে সাঁইসাঁই করা। কোভিড-১৯ সংক্রমণের উপসর্গগুলোও অনেকটা এমনই।

ধূমপানে কার্ডিওভাস্কুলার রোগের ঝুঁকি বাড়ে। কোভিড সংক্রমণেও রোগীদের হৃদরোগের আশঙ্কা বাড়ে। সার্স (SARS-CoV) ও মার্স (MERS-CoV) সংক্রমণের ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছিলেন শ্বাসযন্ত্রের রোগই শুধু নয় রোগী আক্রান্ত হচ্ছেন হৃদরোগেও। হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, রক্তচাপের তারতম্য এমন উপসর্গ দেখা গেছে। কোভিড সংক্রমণেও এই উপসর্গগুলিই ধরা দিয়েছে রোগীদের মধ্যে। গবেষণা বলছে, শ্বাসযন্ত্রকে অকেজো করে সার্স-কভ-২ ভাইরাস হানা দেয় হৃদপিণ্ডেও। হৃদপেশীর মধ্যে ঢুকে সংক্রমণ ছড়াতে শুরু করে। এমনকি ভাইরাসের প্রকোপে হৃদপিণ্ডে রক্ত জমাট বেঁধে মৃত্যু হতেও দেখা গেছে। আর ধূমপান যেহেতু কারিডওভাস্কুলার রোগের জন্য দায়ী, তাই এক্ষেত্রে ভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়।

ধূমপানের সঙ্গে কোভিড সংক্রমণের সম্পর্ক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যেভাবেই থাক না কেন, অধিক ধূমপান যে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ভেঙে দেয় সেটা নতুন করে বলার কিছু নেই। আর দুর্বল শরীর মানেই ভাইরাসকে বাধা দেওয়ার মতো সুরক্ষাকবচ থাকে না, ফলে ভাইরাস ইচ্ছামতো নিজের প্রতিলিপি বানিয়ে চলে এবং ধীরে ধীরে গোটা শরীরেই তার সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More