বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

‘আমার নয়, এটা আপনার পুরস্কার!’ ভারতে এসে শিক্ষকের হাতে নোবেল তুলে দেন পাকিস্তানের বিজ্ঞানী

দ্য ওয়াল ব্যুরো: সালটা ১৯৭৯। পাকিস্তান থেকে প্রথম নোবেল পেয়েছেন পদার্থ বিজ্ঞানের গবেষক, বিজ্ঞানী ডক্টর আব্দুস সালাম। পাকিস্তানের ইতিহাসে এই সম্মান বিরলই বলা যায়। শুধু তাই নয়, তাঁর আবিষ্কারের তত্ত্ব ব্যবহার করেই ২০১২ সালের ‘গডস পার্টিকেল’ বা ‘হিগস বোসন’ কণার আবিষ্কারের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল।

অথচ যাঁকে ঘিরে মাত্রা ছাড়াতে পারত পাকিস্তানের গর্ব। তাঁর এই অর্জন পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূহুর্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারত। কিন্তু সে সব দূরের কথা, সেই মানুষটি নিজের দেশের মানুষের কাছে এক রকম বিস্মৃত! তাঁকে কেউ তো মনে রাখেইনি, রাখলেও তাতে মিশে থেকেছে অশ্রদ্ধা। এতগুলো দশকের পরেও এই অবস্থার কোনও পরিবর্তন হয়নি।

এবং এই চরম বিস্ময়ের ও লজ্জার কারণ হিসেবে দায়ী হয়ে রয়ে গেছে তাঁর ধর্ম বিশ্বাস। আহমেদিয়া গোষ্ঠীর এই মানুষটির জীবনের অদ্ভুত এই অন্ধকার দিকটি নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি মুভিও বানাচ্ছে নেটফ্লিক্স। প্রকাশ পেয়েছে সেই মুভির ট্রেলর।

দেখুন সেই ট্রেলর।

এবং তাতেই সামনে এসেছে, নোবেলজয়ী এই পাকিস্তানি বিজ্ঞানী পুরস্কার পাওয়ার পরে নিজের দেশে ব্রাত্য হয়ে রয়ে গেলেও, তিনি কিন্তু নোবেল পাওয়ার পরেই যে মানুষটির কথা মনে করেছিলেন তিনি এক জন ভারতীয়। শুধু ভারতীয় নয়, বাঙালিও। পুরস্কার পাওয়ার পরে অনিলেন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায় নামের সেই মানুষটিকে বহু খুঁজে বার করেছিলেন আব্দুস সালাম। কারণ তাঁর অঙ্কের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন এই শিক্ষক। তাই বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কারে ভূষিত হওয়ার পরে তিনি সেই শিক্ষকের অবদান ভুলতে পারেন নি। পুরস্কার জেতার পরেই তিনি লাহোর থেকে কলকাতায় এসে তাঁর প্রিয় শিক্ষক অনিলেন্দ্রকে উৎসর্গ করে গিয়েছিলেন তাঁর নোবেল সম্মান।

কিন্তু বিষয়টা মোটেই এত সহজ ছিল না। কারণ, সেই ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময়ে লাহোর থেকে ভারতে চলে আসেন সনাতন ধর্ম কলেজের অধ্যাপক অনিলেন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়। কালের স্রোতে হারিয়ে যান তিনি। ছাত্র-শিক্ষকের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নোবেল পাওয়ার পরে, ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে আব্দুস সালাম অনুরোধ করেন, তাঁর অধ্যাপক অনিলেন্দ্র গাঙ্গুলিকে খুঁজে দেওয়ার জন্য। পাশে দাঁড়ায় ভারত সরকারও।

অবশেষে ১৯৮১ সালের জানুয়ারি মাসের ১৯ তারিখে, ডঃ সালাম ভারতে আসেন এবং অশীতিপর বৃদ্ধ অনিলেন্দ্রর সঙ্গে দেখা করেন তাঁর কলকাতার বাড়িতে গিয়ে। সেখানেই তিনি তাঁর শিক্ষকের হাতে নোবেল পুরস্কারটি তুলে দেন আব্দুস সালাম।

তখন শয্যাশায়ী অনিলেন্দ্র। স্মৃতিপথের আবছা আলোয় ভেসে ওঠে চারের দশকের দুরন্ত এক ছাত্র আব্দুসের মুখ। মনে পড়ে যায়, অঙ্কের প্রতি কী তীব্র ভালবাসা জন্মেছিল সে ছাত্রের। সেই ছাত্র এত দিন পরে তাঁকে মনে রেখেছেন! নোবেল পুরস্কার পেয়ে, সেই পুরস্কার তুলে দিতে এসেছেন তাঁর হাতে! কাঁটাতারের সীমানাও ফিকে হয়ে গেছে শিক্ষকের প্রতি ছাত্রের এই চরম শ্রদ্ধায়!

বিছানায় শুয়ে থাকা অনিলেন্দ্রর গলাতেই নোবেল পুরস্কারের মেডেলটি পরিয়ে দেন আব্দুস সালাম। বলেন, “স্যার, এই পুরস্কার আমার নয়। এটা আপনার। কারন আপনিই আমার মধ্যে অঙ্কের বীজ বপন করেছিলেন।”

তবে নিজের জীবনে এই অপূর্ব সৌজন্য ও শ্রদ্ধার পরিচয় দিলেও, আব্দুস সালামের নিজের জীবন কেটেছে চরম অশ্রদ্ধা ও অশান্তিতে। আহমেদিয়া গোষ্ঠীকে কোনও দিন স্বীকার করেনি পাকিস্তানের মুসলিম সম্প্রদায়। ব্রিটিশ ভারতের জং শহরে সেই গোষ্ঠীর একটি পরিবারে, ১৯২৬ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিনি। ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান জুড়ে শুরু হয় আহমেদীয়া-সমস্যা। খুন হয়ে যান বহু মানুষ। আরও ২০ বছর পরে, ১৯৭৪ সালে আইন করে অ-মুসলিম বলে ঘোষণা করা হয় আহমেদিয়াদের এবং সব রকম অধিকার থেকেও তাঁদের বঞ্চিত করা হয়।

এর পাঁচ বছর পরে নোবেল পান আব্দুস সালাম। বিশ্ব পদার্থবিদ্যার জগতে সালামের ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। মৌলিক কণার মধ্যে দুর্বল ও তড়িৎ চৌম্বকীয় মিথষ্ক্রিয়া বিষয়ক তত্ত্বে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্যই পদার্থ বিজ্ঞান ক্যাটেগরিতে নোবেল পুরস্কার পান তিনি।

কিন্তু পাকিস্তান জুড়ে এই অসহিষ্ণুতা ও হিংসার ধারা কখনও থামেনি। ২০১০ সালেও লাহোরে দুটি আহমেদিয়া মসজিদে হামলার ঘটনা ঘটে, যাতে ৯৪ জন নিহত হন।

১৯৫৩ সালের দাঙ্গার পরেই পাকিস্তান ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আব্দুস সালাম। তিনি লন্ডনে ইমপেরিয়াল কলেজে যোগ দেন। তবে নিজ দেশে প্রত্যাখ্যাত ও বিতাড়িত হলেও, তিনি কিন্তু পাকিস্তানকে ছেড়ে দেননি। বরং পাকিস্তানের বিভিন্ন বড় বড় বৈজ্ঞানিক প্রকল্পে সংযুক্ত থেকেছেন। ১৯৬১ সালে তিনিই পাকিস্তান স্পেস প্রোগাম প্রতিষ্ঠা করেন। পাকিস্তানের পরমাণু কর্মসূচিতেও তিনি যুক্ত ছিলেন। তাঁকে ব্রিটিশ ও ইটালিয়ান নাগরিকত্বের প্রস্তাব দেওয়া হলেও, মৃত্যু পর্যন্ত তিনি ছিলেন পাকিস্তানেরই নাগরিক।

তবে মৃত্যুর পরেও অপমান শেষ হয়নি। তাঁর কবরের ফলকে তাঁর পরিচয় হিসেবে লেখা ছিল, তিনি প্রথম মুসলিম নোবেলজয়ী। সেখান থেকে মুসলিম শব্দটি জোর করে মুছে দেয় কট্টরপন্থীরা। চিরকাল নিজের দেশকে আপন করতে চাওয়া মানুষটি নিজের দেশের মাটিতে সমাহিত হতে পারলেও, তাতে অশ্রদ্ধা ছাড়া আর কিছুই ছিল না।

পড়ুন দ্য ওয়াল-এর পুজোসংখ্যার বিশেষ লেখা…

Comments are closed.