কাউকে পিষে দিয়েছিল ট্রাক্টর, কেউ গুলি খেয়েছিলেন বুকে, অন্যায়ের সঙ্গে আপোস করেননি, তাই ওদের মরতে হয়েছিল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    চৈতালী চক্রবর্তী

    অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন তাঁরা। অপরাধের চোখ রাঙানির তোয়াক্কা করেননি। তাঁদের কেউ আইপিএস অফিসার, কেউ অডিট উইংয়ের শীর্ষ কর্তা, কেউ সিভিল সার্ভিসের গ্রেড এ অফিসার ইত্যাদি। সমাজের অন্ধকার দিকের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে প্রত্যেকেরই জীবনে নেমে এসেছিল মর্মান্তিক মৃত্যু।  অপরাধীরা কেউ সাজা পেয়েছিল, কেউ বা আইনের ফাঁক গলে নিস্তার পেয়েছিল রহস্যজনক ভাবে।

    সত্যেন্দ্র দুবে:

    ২৭ নভেম্বর, ২০০৩ সাল। ভোর তিনটে। আত্মীয়ের বিয়ে সেরে বেনারস থেকে গয়া স্টেশনে নামলেন সত্যেন্দ্র দুবে। ইন্ডিয়ান ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসের একদন জাঁদরেল, সৎ পুলিশ অফিসার হিসেবে যাঁর নাম ছিল বিহারে। রিকশায় চেপে বসার পর মিনিট খানেক। অন্ধকারের বুক চিরে ছুটে আসে এলোপাথাড়ি গুলি। রক্তাক্ত লুটিয়ে পড়েন সত্যেন্দ্র। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই সব শেষ।

    সরকারি প্রকল্পের একাধিক দুর্নীতি একসময় ফাঁস করে দিয়েছিলেন তিনি। ২০০২ সালে আইইএসে যোগ দেওয়ার পরে কোডার্মার ন্যাশনাল হাইওয়ে অথরিটি অব ইন্ডিয়ার (NHAI) প্রজেক্ট ডিরেক্টরের পদে বহাল করা হয় তাঁকে। ঔরঙ্গাবাদ-বারাছাট্টি সেকশনের ২ নম্বর জাতীয় সড়কের (গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড) নতুন প্রকল্প ‘দ্য গোল্ডেন কোয়াড্রিল্যাটারাল কোরিডর প্রজেক্ট’-এর দায়িত্ব তখন তাঁর কাঁধে। কাজ শুরুর পরেই কোটি টাকার প্রকল্পের একের পর এক দুর্নীতি সামনে আসে সত্যেন্দ্রর। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও লাভ হয়নি। শেষে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীকে চিঠি লেখেন সত্যেন্দ্র। চিঠির বয়ান ছিল এরকম, ‘‘সরকারের স্বপ্নের প্রকল্প নষ্ট করে দিচ্ছে অন্ধকার জগতের কিছু মাফিয়া। আমার অনুমান প্রশাসনের কর্তারাও এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। জনগণের টাকা যথেচ্ছ ভাবে লুঠ হচ্ছে। আপনি কিছু করুন।’’ চিঠির সঙ্গে অভিযুক্তদের সম্ভাব্য একটা তালিকাও প্রধানমন্ত্রীকে তিনি দিয়েছিলেন বলে শোনা যায়।

    অপরাধীদের কঠোর শাস্তির দাবিতে জাতীয় সড়কের উপরেই শুরু হয় প্রতিবাদ।

    চাপটা আসে এর পর থেকেই। একাধিক বার খুনের হুমকি দেওয়া হয় তাঁকে। তবে পিছিয়ে যাননি। সংসদেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনার ঝড় ওঠে। তদন্তে নামে সিবিআই। প্রধান সাক্ষী হিসেবে সত্যেন্দ্রর বয়ান রেকর্ড করা হয়। তবে তদন্ত শেষের আগেই গয়া রেল স্টেশনে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেওয়া তাঁকে। পরে মন্টু কুমার, উদয় কুমার ও পিঙ্কু রবিদাস নামে তিনজনকে গ্রেফতারও করে পুলিশ। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২, ৩৯৪, ২৭ (এ)ধারায় মামলা দায়ের হয়। কিন্তু দুর্নীতিতে জড়িত মাথাদের ধরা সম্ভব হয়নি।


    নরেন্দ্র কুমার:

    ২০১২ সাল। মধ্যপ্রদেশের মোরেনায় তখন অবৈধ পাথর খাদানের রমরমা। মাফিয়া রাজ চলছে গোটা এলাকায়। গর্জে উঠলেন ৩০ বছরের এই আইপিএস অফিসার। ভোর রাতে ওঁৎ পেতে থেকে বুক চিতিয়ে দাঁড়ালেন পাথর বোঝাই ট্রাক্টরের সামনে। বন্দুক উঁচিয়ে আত্মসমর্পন করতে বলেন চালককে। কিন্তু, চালক তখন বেপরোয়া। ট্রাক্টরের গতি বাড়িয়ে পিষে দিল অফিসারকে। তাজা রক্তে ভিজে গেল মোরেনার মাটি।

    স্ত্রী মধুরানি তেওটিয়ার সঙ্গে নরেন্দ্র কুমার

    ২০০৯ ব্যাচের আইপিএস নরেন্দ্র কুমার। যাঁর খুনের ঘটনায় তোলপাড় হয়েছিল গোটা রাজ্য। বিচারবিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী। মোরেনার খনিজ দফতর জানিয়েছিল, বৈধ খাদানকে ফাঁকি দিয়ে মাসের পর মাস মূল্যবান পাথর পাচার হয়ে যাচ্ছে ভিন রাজ্যে। জায়গায় জায়গায় গড়ে উঠেছে অবৈধ খাদানও। সেখানে অন্ধকার জগতের কুখ্যাত মাফিয়াদের আনাগোনা। সব জেনেও প্রাণ ভয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছে প্রশাসন। একমাত্র এগিয়ে এসেছিলেন নরেন্দ্র।

    বিহার থেকে বানমোরের সাব ডিভিনাল অফিসারের পোস্টে বদলি হওয়ার পর থেকই অবৈধ পাথর খাদানের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন নরেন্দ্র। একাধিক ট্রাকের লাইসেন্স বাতিল করেছিলেন তিনি, খনি মাফিয়াদের চোরাচালান রুখতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রী মধুরানি তেওটিয়া ছিলেন আইএএস অফিসার। শোনা যায় তিনিও নাকি স্বামীর মতোই দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেন। ঘাতক ট্রাক্টরের চালক মনোজ গুরজরকে পরে গ্রেফতার করে পুলিশ। সরকারি নির্দেশে তদন্তও চলেছিল বেশ কয়েকমাস। শেষ পরিণতি কী হয়েছিল, সেই নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়েছে।

    রণধীর প্রসাদ বর্মা:

    তাঁকে বলা হয় ‘ধানবাদ লেজেন্ড।’ ১৯৭৪ ব্যাচের এই আইপিএস অফিসারকে মরণোত্তর অশোক চক্র দেওয়া হয়েছিল। ২০০৪ সালে পোস্টাল স্ট্যাম্পে তাঁর ছবি রেখেছিল ভারত সরকার।

    ১৯৫২ সালে বিহারের জগতপুরের সহস্র জেলায় জন্ম রণধীর প্রসাদের। পটনা কলেজের স্নাতক রণধীর ছেলেবেলা থেকেই ছিলেন সাহসী ও ডাকাবুকো। ১৯৭৪ সালে আইপিএস হওয়ার পরে ধানবাদের পুলিশ সুপারের পদে যোগ দেন তিনি। খুন, ডাকাতি, নারী পাচার, জাল নোটের একাধিক বড় চক্রকে পাকড়াও করেছিলেন তিনি। স্থানীয়দের কথায়, রণধীর প্রসাদ বর্মার শাসনে ধানবাদে অপরাধের সংখ্যা কমেছিল অনেকটাই। এসপি থাকার সময়েই শিশু পাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন তিনি। নারী নির্যাতন, গার্হস্থ্য হিংসার মতো অপরাধের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযান ছিল প্রশংসনীয়। লোকে বলত, রণধীর প্রসাদের নাম শুনলেই ভয় পেয়ে মুখ লুকাত অপরাধীরা।

    ১৯৯১ সালের ৩ জানুয়ারি। ভোর বেলায় খবর আসে ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ায় লুঠ চালাচ্ছে ডাকাতের একটা দল। ফোর্স না নিয়ে একাই ছুটে যান ব্যাঙ্কে। সম্বল শুধুমাত্র সার্ভিস রিভলভার। শুরু হয় পাঁচ ডাকাতের বিরুদ্ধে গুলির লড়াই। পাঁচ জনকেই প্রায় আয়ত্তে এনে ফেলেছিলেন রণধীর। তাদের ব্যাঙ্ক থেকে বার করার সময়েই একজন আচমকা গুলি চালিয়ে দেয় তাঁর বুক লক্ষ্য করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন, গুলি খেয়েও দরজা আগলে দাঁড়িয়েছিলেন রণধীরয যতক্ষণ না পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছয়, ততক্ষণ ডাকাতদের পালাতে দেননি তিনি। অপরাধীদের রুখেছিলেন নিজের জীবন দিয়ে।

    এখনও ধানবাদে তাঁর নামে একটি রাস্তা রয়েছে, ‘রণধীর বর্মা চক।’ মুজফফরপুরে তাঁর নামে ক্রিকেট ক্লাবও রয়েছে ‘রণধীর বর্মা ক্রিকেট ক্লাব (RVCC)।’

    এসপি মহান্তেশ:

    মহান্তেশের মৃত্যু নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়েছে। কর্নাটক অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস (কেএএস)অফিসার এসপি মহান্তেশ কোঅপারেটিভ হাউসিং সোসাইটির অডিট উইং-এ ছিলেন। বহু দুর্নীতির পর্দা ফাঁস করেছিলেন তিনি। নিজের বাড়িতেই একদিন জনা কয়েক দুষ্কৃতীর আক্রমণের মুখে পড়েন। সালটা ২০১৩, ১৫ মে। মাথার পিছনে খুব ভারী জিনিস দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল তাঁকে। বেঙ্গালুরুর একটি হাসপাতালে মৃত্যু হয় তাঁর।

    প্রথমে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মহান্তেশের মৃত্যু হয়েছে বলে খবর রটে। পরে তদন্ত শুরু করে বেঙ্গালুরু সিটি ক্রাইম ব্র্যাঞ্চ। তদন্তে উঠে আসে খুনই করা হয়েছিল মহান্তেশকে। আয়াপ্পা, কিরণ কুমার, মুরালি এবং শিবকুমার নামে চার জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

    সিটি পুলিশ কমিশনার জ্যোতিপ্রকাশ মিরজি জানিয়েছিলেন, অডিট উইংয়ের একমাত্র সৎ ও নিষ্ঠাবান পুলিশ অফিসার ছিলেন মহান্তেশ। কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি ফাঁস করেছিলেন তিনি। হাউসিং-স্ক্যাম নিয়েও অভিযান চালিয়েছিলেন তিনি। গ্রেফতার করেছিলেন অপরাধীদেরও।

    মহান্তেশের খুনের ষড়যন্ত্রের মূল মাথা ছিল কিরণ কুমার নামে এক মাফিয়া ও তার দলবল। ড্রাগ মাফিয়া, জুয়াড়ি, নারী পাচারে জড়িত কিরণের বিরুদ্ধে পরবর্তীকালে একাধিক মামলা দায়ের করেছিল পুলিশ।

    ষন্মুখম মঞ্জুনাথ:

    ভেজাল তেলের কারবারিদের ধরতে গিয়ে প্রাণ দেন ২৭ বছরের মঞ্জুনাথ। সালটা ২০০৫, ১৯ নভেম্বর। তিনি তখন লখনউয়ের ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশনের গ্রেড এ অফিসার। অভিযোগ ওঠে, লখিমপুর ও খেরি, এই দু’টি পেট্রোল পাম্প থেকে ভেজাল তেল দেওয়া হচ্ছে। চালকরা দাবি করেন, তেলের সঙ্গে রাসায়নিক, কেরোসিন এমনকি জল মেশাচ্ছেন পাম্প মালিকরা।

    তদন্ত শুরু করেন মঞ্জুনাথ। পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে আচমকাই তল্লাশি চালান ওই পেট্রোল পাম্পে। তেলের নমুনা সংগ্রহ করে দেখা যায়, অভিযোগ সত্যি। রাসায়নিক মিশিয়ে তেল বিক্রি করছেন পাম্প মালিকরা। ওই দুই পেট্রোল পাম্প বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু পাম্প মালিকদের রোষের মুখে পড়েন মঞ্জুনাথ। পরে জানা যায়, লখিমপুরেরই গোলা গোকারান্নাথ এলাকায় গুলি করে খুন করা হয়েছিল তাঁকে। নিজের গাড়ির পিছনের সিটেই গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে হয়েছিল তাঁর দেহ। ৬টা গুলি বিঁধেছিল বুকে, পেটে, কোমরে। পুলিশ জানায়, তাঁর গাড়ির চালক ও এক সাফাইকর্মী ছিলেন পেট্রোল পাম্পেরই দুই কর্মচারী। তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়। ষড়যন্ত্রের মূল মাথাদের পরে পাকড়াও করা হয়েছিল কি না সে বিষয়ে সঠিক তথ্য জানা যায়নি।

    কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র মঞ্জুনাথ লখনউ আইআইএম থেকে এমবিএ করেছিলেন। পরে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দিয়ে গ্রেড এ অফিসার হন। মঞ্জুনাথের মৃত্যুর পরে আইআইএমের ছাত্রছাত্রীরা তাঁর নামে ‘দ্য মঞ্জুনাথ ষন্মুখম ট্রাস্ট’ তৈরি করেন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More