নগ্নতা ছিল অপরাধ! গাউন-ব্যাগি প্যান্ট থেকে বিকিনি, সুইমস্যুটের ইতিহাস রোমাঞ্চকর

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

চৈতালী চক্রবর্তী 

১৯০৭ সাল। অস্ট্রেলীয় সাঁতারু অ্যানেট কেল্লারম্যানের গ্রেফতারি ঘিরে কম কেচ্ছা হয়নি। সুন্দরী, তন্বী, মডেল-অভিনেত্রী, অ্যাথলেটের এমন পোশাক! তাও আবার খোলা সমুদ্র সৈকতে! শত শত পুরুষের কৌতুহলী দৃষ্টিকে তোয়াক্কা না করেই এমন উন্মুক্ত বক্ষ বিভাজিকা ও খোলা উরু নিয়ে সৈকতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন অ্যানেট, ত্রাহি ত্রাহি রব উঠল চারদিকে। উত্তর বস্টনের রিভিয়েরা বিচ থেকে গ্রেফতার করা হল তরুণী অ্যানেটকে। ম্যাগাজিন-খবরের কাগজে ফলাও করে বেরলো তাঁর ‘নষ্টামি’র কথা।

অস্ট্রেলিয়ান মারমেড অ্যানেটের ‘অপরাধ’ একটাই ছিল। প্রথা ভেঙে ওয়ান-পিস সুইমস্যুটেই সৈকতে হাজির হয়ে গিয়েছিলেন। সমাজ ও আইনের চোখে যা ছিল গর্হিত অপরাধ। তখন অবশ্য জলে নেমে সাঁতারের অনুমতি পেয়ে গিয়েছেন মহিলারা, তবে পোশাক বিধি ছিল বড়ই কঠোর। স্কার্ট-টপ, স্টকিংস, সুইম বুট সব গলিয়ে, বিন্দুমাত্র শরীরের খাঁজ-ভাঁজ না দেখিয়েই সাঁতরাতে হবে। এই বিধিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে করসেট ছাড়াই স্লিভলেস সুইমস্যুট আর নির্মেদ শরীরে বিচে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলেন অ্যানেট। নারী সৌন্দর্যকে অন্তরালে রাখার চিরকালীন অভ্যাসের মুখে এটা ছিল অ্যানেটের নীরব প্রতিবাদ।

অস্ট্রেলীয় সাঁতারু অ্যানেট কেল্লারম্যান

অ্যানেট কেল্লারম্যানকে বেশিদিন আইন দিয়ে বাঁধা যায়নি। তবে সামাজিক নিয়মের একটা বদল এসেছিল। খোলামেলা সুইমস্যুটের যে ধারণাই ছিল না ১৮০০ শতকে, সেখানেই এল বিবর্তন। সাঁতারে লিঙ্গবৈষম্যের আগল ভাঙল, পোশাকেও লাগল সেই বিবর্তনের ছোঁয়া। অবশ্য ওয়ান পিস থেকে টু-পিসের জার্নিটা সহজ ছিল না, সময় লেগেছিল মানসিকতার বদলেও। বিবর্তনের সেই কাহিনি কম রোমাঞ্চকর নয়।

 

১৮০০ শতক, নগ্ন হয়ে জলে নামতেন পুরুষরা, সাঁতরানোর অনুমতি পায়নি নারীরা

সৈকতের পাড়ে হাঁটতে পারবে, তবে জলে নামতে পারবে না। কঠোর নিয়ম সেই সময়। সাঁতরানো তো নৈব নৈব চ। নগ্ন হয়ে জলে নামার অধিকার আছে একমাত্র পুরুষদেরই। তবে নদী বা সমুদ্রের ধারে হাঁটা বা বসার জন্য মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট করা আছে কিছু পোশাক। সুতি বা উলের লম্বা গোড়ালি ঝুল গাউন, ব্যাগি প্যান্ট, পায়ে বুট, মাথায় টুপি। শরীরে খোলা জায়গা বলতে থাকবে শুধু মুখটুকু, তবে প্রয়োজনে সেটাও ঢেকে বসলে ভাল।

১৮৭০ সালের সুইমস্যুট। মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম আর্টে এই পোশাক এখনও সংরক্ষিত।

ভিক্টোরিয়ান যুগের ‘বাথিং মেশিন’

এই ব্যাপারটা আরও মজার। ১৮৯০ সালের কোনও একটা সময়। ইতিহাসবিদদের কেউ কেউ বলেন তারও আগে। মহিলাদের জলে নেমে স্নান করার অদম্য ইচ্ছায় কিছুটা ছাড় দিয়েছিল পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। ছোট ছোট চাকা লাগানো কাঠের ঘর, চালিয়ে নিয়ে যেতে হত জলের মাঝে। নিরিবিলি দেখে গোপনে জলে নেমে গা ভিজিয়েই ঢুকে পড়তে হত সেই ঘরে। পরনে একইরকম গাউন ও বুট।

১৯০০-১৯১০, সুইমস্যুট না নাচের পোশাক বোঝা দায়!

গাউন-ব্যাগি প্যান্টে জলে নামতে বেশ কষ্ট। পায়ে আবার গামবুট। বিস্তর তর্ক-বিতর্ক পেরিয়ে ভারী পোশাক একটু হালকা হল। ভিক্টোরিয়ান স্টাইলের সুইমস্যুটের নাম হল ‘বাথিং স্যুট।’ হাঁটু ঝুল কলার দেওয়া ফ্রক, স্ট্রাইপ দেওয়া প্যান্ট, পায়ে অবশ্য বুটের বদলে লেস বাঁধা জুতো উঠল। ১৯১০ সালে এল টার্কিস-স্টাইল ব্লুমার। পোশাকের ঝুল এবং ডিজাইনে খুব একটা ফারাক হল না। পোশাকবিধির এমন কড়া বিধিনিষেধের সময়েই ওয়ান-পিস খোলামেলা পোশাক পড়ে বিতর্কের ঝড় তুলে দিলেন অস্ট্রেলীয় সাঁতারু অ্যানেট কেল্লারম্যান।

১৯১৫-২০, অলিম্পিকে মহিলা সাঁতারুদের জন্য সুইমস্যুট হল খোলামেলা

অ্যানেটের বিপ্লব ঝড় তুলেছিল নারী-সমাজে। ১৯১০ সালের পর থেকেই সাঁতারের পোশাকে বিবর্তনের ছোঁয়া লাগে। অলিম্পিকে সাঁতারে যোগ দেন মহিলারা। ফলে পোশাক তৈরি হয় অ্যাথলেটদের উপযোগী করেই। ১৯১২ সালের অলিম্পিকে ব্রিটিশ সাঁতারু মহিলাদের যে ছবি সামনে এসেছিল তাদের সকলেরই পরনে ছিল টপ-শর্টস। খোলা পা এবং অনাবৃত হাতে বিশেষ আপত্তি তোলেনি সমাজ। ১৯২০ সাল। সুইমস্যুট হল আরও খোলামেলা। ওয়ান-পিস স্যুটের ঝুলও কমল।

১৯১২ অলিম্পিকে ব্রিটিশ মহিলা সাঁতারুরা

১৯২০ সালের মাঝামাঝি ‘ভোগ’ ম্যাগাজিনে ফলাও করে লেখা হল, সমুদ্র সৈকতের নতুনত্ব হল জার্সি-বাথিং স্যুট যাকে ছাড়পত্র দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে অ্যাথলিটরা ছাড়া অন্যান্য মহিলাদের ক্ষেত্রে তখনও সুইমস্যুটের একটা আড়াল-আবডাল ছিল। সাঁতার তখনও মনোরঞ্জনের বিষয় হয়ে ওঠেনি। ভোলবদল হয় ১৯৩০ সালের পর থেকে।

১৯২২ সাল। নিয়মের রাশ আলগা হয়নি। সৈকতে মহিলাদের সুইমস্যুটের ঝুল পরীক্ষা করছে পুলিশ

হলিউডের ছোঁয়া লাগল, ডিপ নেকলাইন-খোলা উরুতে অনেক সাহসী নারীরা

সিন্থেটিক ফেব্রিকের কাজ মনে ধরল মহিলাদের। বাজারে এল ইলাস্টিক ইয়ার্ন সুইমস্যুট। অভিনেত্রী অ্যানিটা পেজ এবং লায়লা হিয়ামসের লাস্য ঝড় তুলল। সুইমস্যুটের ভোলই বদলে গেল–সাহসী নেকলাইন, হায়ার-কাট লেগ। তখনও অবশ্য টু-পিসের কথা ভাবা হয়নি। সেই পরিবর্তন আসতে সময় লাগল আরও কয়েক বছর।

১৯৪৬ সালের ৫ জুলাই। সুইমিং পুলের ধারে ফরাসি মডেল মিশেলিন বার্নারদিনির ছবি ভাইরাল হল হুহু করে। প্রথম বিকিনি-মডেল মিশেলিন। খোলা কোমর, নারী-লজ্জাটুকু ঢাকা এমন সুইমস্যুট বানালেন ফরাসি ডিজাইনার লুইস রিয়ার্ড। বাজারে বাণিজ্যিকভাবে সুইমস্যুটে জায়গা করে নিল বিকিনি। অবশ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই নানা দেশে বিকিনি-সুইমস্যুটের চল শুরু হয়েছিল। ১৯৫০-এ সমুদ্র সৈকতে বিকিনিতে মেরিলিন মনরো স্টাইল-স্টেটমেন্টই বদলে দিলেন।

ফরাসি মডেল মিশেলিন বার্নারদিনি

১৯৬৪ সাল। ফের বিতর্কের শুরু। অস্ট্রিয়-আমেরিকান ডিজাইনার রুডি গার্নেরিচ বানালেন ‘মনোকিনি।’ উর্ধ্বাঙ্গে শুধু দুটো সরু স্ট্রিপ, উন্মুক্ত স্তন। গার্নেরিচ ভেবেছিলেন সুইমস্যুটে নগ্ন-নারী শরীর নতুন বিপ্লব লিখবে। কিন্তু সেটা হয়নি। মনোকিনি পরে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন অনেক মডেন-অভিনেত্রীই। গার্নেরিচের বানানো মনোকিনিকে বিতর্কিত পোশাক বলে হুলিয়া জারি করে দেওয়া হয়। ১৯৭০-৮০ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সুইমস্যুটে হাজারো বদল এসেছে। আধুনিকতার মোড়কে শরীর প্রদর্শন বাধা পায়নি।

বিচে সাহসী মেরিলিন মনরো

বুরকিনি—নতুন ইতিহাস লিখেছিল

২০০৪ সালে অস্ট্রেলীয় ডিজাইনার আহেদা জ়ানেত্তি ডিজাইন করেছিলেন এই সুইমস্যুটের। তিনি দেখেছিলেন অস্ট্রেলিয়ান স্পোর্টসে অনেক মুসলিম অ্যাথলিটরাই অংশ নেন। বিশেষত সমস্যায় পড়েন মহিলারা। শরীর ঢাকা সুইমস্যুট তখন ইতিহাস। কাজেই মুসলিম মহিলা অ্যাথলিটদের জন্য তিনি বানিয়ে ফেলেছিলেন পুরোপুরি শরীর ঢাকা এক সুইমস্যুট—বুরকিনি (বোরখা+বিকিনি)। যদিও বুরকিনি নিয়ে সমালোচনা কিছু কম হয়নি। ২০১৬ সালে ফ্রান্সের একাধিক জায়গায় বুরকিনি নিষিদ্ধ হয়ে যায়। অবশ্য তার আগে বিশ্বজুড়ে প্রায় সাত লক্ষ বুরকিনি বেছে ফেলেছিল জ়ানেত্তির সংস্থা।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More