ভূ-রাজনৈতিক চিত্র বদলাচ্ছে, পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কায় ভীত হয়ে পড়ছেন কৌশলগত বিশেষজ্ঞদের অনেকেই

চিন-ভারত সীমান্ত যুদ্ধের উত্তাপ যেভাবে বাড়ছে, দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ যেভাবে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে জড়িয়ে পড়ছে, তাতে অনেকে কৌশলগত বিশেষজ্ঞ একটু বেশিই ভয় পাচ্ছেন। তাঁরা মনে করছেন, এক বিধ্বংসী পারমাণবিক যুদ্ধের সিঁদুরে মেঘ ঘনাচ্ছে পূব দিকে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক কী? সাম্প্রতিক সময় প্রশ্নটা করা হলে উত্তর আসবে করোনাভাইরাস। সত্যিই কি তাই! অতিমহামারী এক ভয়ঙ্কর স্বাস্থ্য বিপর্যয় বটেই, বহু মানুষের মৃত্যু হচ্ছে সেটাও ঠিক। তবে এটা হল মুদ্রার একটা পিঠ। অন্য যে দিকটা আড়ালে চলে গেছে সেটা আরও বেশি ভয়ঙ্কর, প্রাণঘাতী। ছাড়খাড় করে দিতে পারে সব। পৃথিবীর ধ্বংসের ইতিহাস লিখতে পারে। পারমাণবিক যুদ্ধ। চিন-ভারত সীমান্ত যুদ্ধের উত্তাপ যেভাবে বাড়ছে, দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ যেভাবে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে জড়িয়ে পড়ছে, তাতে অনেকে কৌশলগত বিশেষজ্ঞ একটু বেশিই ভয় পাচ্ছেন। তাঁরা মনে করছেন, এক বিধ্বংসী পারমাণবিক যুদ্ধের সিঁদুরে মেঘ ঘনাচ্ছে পূব দিকে।

    পারমাণবিক অস্ত্রের সংহার রূপ কেমন হতে পারে তার সাক্ষী থেকেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ১৯৪৫ সালের ৯ অগস্ট জাপানের হিরোসিমায় ইউরেনিয়াম গান-টাইপ ফিসন বোমা ‘লিটল বয়’ ফেলেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তার ঠিক তিন দিন পরেই ৯ অগস্ট টার্গেট ছিল নাগাসাকি। প্লুটোনিয়াম ইমপ্লোশন-টাইপ ফিসন বোম ‘ফ্যাট ম্যান’-এর প্রভাবে দুই লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ধ্বংসের বীভৎসতা দেখেছিল জাপান। ১৯৮৬ সালে রাশিয়ার চের্নোবিলে যে পারমাণবিক দুর্ঘটনা ঘটেছিল তার প্রভাবে ১৫০০ কিলোমিটার দূরে সুইডেনের বাতাসে তেজস্ক্রিয়তার খোঁজ মিলেছিল। কানাডার আকাশেও দেখা গিয়েছিল তেজস্ক্রিয় মেঘ। ঘণ্টায় প্রায় ৮০ মাইল বেগে ধেয়ে গিয়েছিল সেই তেজস্ক্রিয় ঝড়। ২০১১ সালে জাপানের ফুকুশিমায় পারমাণবিক চুল্লির বিস্ফোরণে ২০০ কিলোমিটার দূরে টোকিও শহর অবধি তেজস্ক্রিয় মেঘ ধেয়ে গিয়েছিল। এগুলো ছিল দুর্ঘটনা, তবে এখান থেকেই আঁচ করা গিয়েছিল প্রকৃতই যদি পারমাণবিক অস্ত্রের প্রয়োগ করা হয় তাহলে তার পরিণতি কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে।

    স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য বলছে, এক বছরে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা কিছুটা হলেও কমেছে। তবে দুই আমেরিকা ও রাশিয়ার সামরিক অস্ত্রভাণ্ডার বিপুল পরিমাণ পারমাণবিক অস্ত্র মজুত করে রেখেছে। গত সপ্তাহেই ফ্রান্স তাদের সামরিক অস্ত্রবাহী যুদ্ধজাহাজ থেকে নিউক্লিয়ার মিসাইলের সফল উৎক্ষেপণ করেছে। শব্দের থেকেও ২০ গুণ বেশি গতিতে ছুটতে পারে সেই মিসাইল। শুধু তাই নয়, চিনও গোপনে তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার সাজিয়ে গুছিয়েই রেখেছে। উত্তর কোরিয়া, ভারত, পাকিস্তান, ইজরায়েল-সহ পৃথিবীর অন্তত ৯টি দেশ পারমাণবিক শক্তিতে শক্তিধর। মোদ্দা কথা, বিশেষজ্ঞরা বলতে চাইছেন, যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি না হলেও, অন্তরালে কিন্তু বীজটা পোঁতাই আছে।

    রাশিয়ার সারমাট ইন্টারন্যাশনাল ব্যালিস্টিক মিসাইল

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া অধিকার ভেঙে দিয়ে ১৯৫২ সালে যুক্তরাজ্য প্রথম স্বাধীনভাবে পারমাণবিক বোমা পরীক্ষা করে, ১৯৬০ সালে চিন এবং তারপরে ১৯৬৪ সালে ফ্রান্স। লাগামছাড়া অস্ত্র প্রতিযোগিতায় রাশ টানতে ১৯৮৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যেও একটি চুক্তিও স্বাক্ষর করেছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগন এবং সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভ।  গত পাঁচ দশকে নিজেদের পরমাণু অস্ত্রের সম্ভার কমাতে একের পর এক অন্যান্য চুক্তিতেও অংশ নেয় আমেরিকা ও রাশিয়া। কিন্তু তার পরেও দুই দেশ একে অপরের দিকে চুক্তি ভেঙে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা করার অভিযোগ তুলেছিল। আমেরিকার অভিযোগ ছিল, চুক্তি ভেঙে মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নোভাটর উৎক্ষেপণ করে চলেছে রাশিয়া, যার কারণে ন্যাটো গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলির ওপর পরমাণু হামলা চালানোর ক্ষমতার অধিকারী হয়ে গেছে মস্কো। পাল্টা অভিযোগ আনে রাশিয়াও।

    ‘লিটল বয়’ অ্যাটম বোম, হিরোসিমার উপরে ফেলেছিল আমেরিকা

    বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা সংস্থাগুলির হিসেবে পৃথিবীর ৯টি দেশে এখন ৯ হাজারের বেশি পরমাণু বোমা আছে। ২০১৮ সালে ‘ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্সিট’ যে হিসেব দেয় তাতে জানা গেছে, রাশিয়ার অস্ত্রভাণ্ডারে সাড়ে ৬ হাজারের বেশি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। তাছাড়াও রাসায়নিক অস্ত্র আছে প্রায় ৪০ হাজার টন। রাশিয়ার শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র সারমাট ইন্টারন্যাশনাল ব্যালিস্টিক মিসাইল। এই মিসাইলের গতি শব্দের থেকে আট গুণ বেশি। তাছাড়া, রাশিয়ার কাছে রয়েছে, বম্বার, ট্যাকটিক্যাল মিসাইল, ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল, এয়ার ডিফেন্স মিসাইল সিস্টেম, নিউক্লিয়ার মিসাইল ইত্যাদি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই সংখ্যা ৬ হাজার ১৮৫। ব্রিটেনের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র আছে ২১৫টি, ফ্রান্সে ৩০০টি, ভারতে ১৩০-১৪০টি।

    আমেরিকার টাইটান-২ নিউক্লিয়ার মিসাইল, নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে অ্যারিজোনার টাইটান মিসাইল মিউজিয়ামে

    ভারতের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা নিউক্লিয়ার কম্যান্ড অথরিটি (NCA)-র তথ্য অনুসারে ভারতের শক্তিশালী পরমাণু বোমা শক্তি-১, যার পরীক্ষা হয়েছিল পোখরান-২ এ। তবে ১৯৯৯ সালের অগস্টে ভারত সরকার ঘোষণা করে পারমাণবিক অস্ত্র শুধুমাত্র প্রতিরক্ষার জন্যই, ভারত কখনওই প্রথমে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রয়োগ করবে না। দশকের পর দশক ধরে কাশ্মীর ইস্যুতে যতই ভারত-পাকিস্তান গোলাবারুদ বিনিময় হোক না কেন, গবেষকরা বলছেন যদি কখনও দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হয় তাহলে দেড় কোটি টনের বেশি তেজস্ক্রিয় পদার্থে ঢেকে যাবে আকাশ। প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত মার্কিন থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক সংস্থা ‘আটলান্টিক কাউন্সিল’-এর একটি রিপোর্ট বলেছিল, পাকিস্তানের হাতে প্রচুর পরিমাণে ট্যাকটিক্যাল (ছোটখাটো) পরমাণু অস্ত্র আছে যা নিয়ে ইসলামাবাদ এখনও পর্যন্ত তেমন পরীক্ষানিরীক্ষা করেনি। অন্যদিকে ভারতের হাতে রয়েছে ৬৮ রকমের নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড যেগুলি ভূমি থেকে ছোড়া যায়। অগ্নি-১, অগ্নি-২, অগ্নি-৩, সেনাবাহিনীর পৃথ্বী-১ ছাড়াও অগ্নি-৪ এবং অগ্নি-৫ মিসাইলের উৎক্ষেপণও সফলভাবে করেছে ভারত।

    ডংফেং-৪১ ইন্টারকন্টিনেন্টাল স্ট্র্যাটেজিক নিউক্লিয়ার মিসাইল, বেজিং

    অগ্নি-৫ ক্ষেপণাস্ত্র ভারতের অন্যতম শক্তি।  ৫৫০০ থেকে ৫৮০০ কিলোমিটার দূরে পরমাণু আক্রমণে সক্ষম এই মিসাইল। অগ্নি-৫ হল ভারতের হাতে থাকা একমাত্র ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল (আইসিবিএম) যা ১৫০০ কিলোগ্রাম ওজনের পরমাণু অস্ত্র বহন করতে পারে।

    ভারতে অগ্নি-৫ ক্ষেপণাস্ত্রের উৎক্ষেপণ

    ভারতীয় প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলেন, অগ্নি-৫ ক্ষেপণাস্ত্র চিনের যে কোনও প্রান্তে আঘাত হানতে সক্ষম এবং এই ক্ষেপণাস্ত্রটি তৈরি করে ফেলার সঙ্গে সঙ্গেই পাঁচ সুপার-পাওয়ারের (আমেরিকা, রাশিয়া, চিন, ব্রিটেন, ফ্রান্স) ‘ক্লাব’-এ ঢুকে পড়েছে ভারত যাদের হাতে আইসিবিএম রয়েছে। তাছাড়া সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য দূরপাল্লার ও মাঝারি পাল্লার ক্ষেপাণাস্ত্রও ভারত বানিয়ে ফেলেছে। তৈরি করেছে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রতিরোধ ব্যবস্থাও।  পাকিস্তানের সবচেয়ে বেশি চিন্তা ভারতের নতুন সমর কৌশল নিয়ে। ‘কোল্ড স্টার্ট ডকট্রিন’ নামে সেই যুদ্ধ পদ্ধতি পাকিস্তানের পক্ষে ভয়ঙ্কর হতে পারে বলে ইসলামাবাদ মনে করে।

    ভারতের সাবমেরিন লঞ্চড ব্যালিস্টিক মিসাইল (এসএলবিএম), কে-১৫ সাগরিকা

    পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ও যুদ্ধ পদ্ধতিতে পৃথিবীর অনেক দেশই এগিয়ে গেছে। তলে তলে শক্তি বাড়িয়ে রাখার কাজ করছে অনেকেই। সবরকম বিভিনিষেধ অমান্য করে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েই যাচ্ছে উত্তর কোরিয়া। অটোম্যাটিক বম্ব এবং হাইড্রোজেন বম্ব চলে এসেছে উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অস্ত্র ভাণ্ডারে। কোথাও পরমাণু বোমা ফেলার জন্য যে সব সরঞ্জাম জরুরি, ইন্টার কন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল-সহ সেই সব সরঞ্জামই উত্তর কোরিয়া তৈরি করে ফেলেছে বলে দাবি করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। কাজেই যুদ্ধের ক্ষেত্রটা তৈরিই আছে। অসীম ধ্বংসের এক পদধ্বনি যেন ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। শক্তি উন্মত্ত দেশগুলি শুনতে পাচ্ছে কি?

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More