অনাহার, অপুষ্টির ভারত যক্ষ্মাতেও শীর্ষে, রোগ ছড়াচ্ছে মহামারীর মতো, আশঙ্কার কথা জানাল হু

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: লক্ষ্য ছিল ২০২৫। ভারত থেকে যক্ষ্মা নামক মারণব্যধিটাকে শিকড়সমেত উপড়ে ফেলার সরকারি লক্ষ্য। কিন্তু, রোগপ্রতিরোধের যা গতিপ্রকৃতি তাতে লক্ষ্যপূরণে সফলতা তো দূর, রোগবৃদ্ধির শঙ্কা সমূলে চেপে বসেছে। বিপদঘন্টি বাজিয়ে দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘হু’ (WHO)। রিপোর্ট বলেছে, বিশ্বের এক কোটি যক্ষ্মা রোগীর ২৭ শতাংশেরই বাস ভারতে। যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যায় এবং রোগের বাড়বাড়ন্তে বিশ্বের শীর্ষস্থান জুড়েই রয়েছে এ দেশ। গত ২০১০ সাল থেকে একচুলও টলানো যায়নি তাকে।

    বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট বলছে, ২০১৮ সালের হিসেবে ভারতে যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা প্রায় ২৭ লক্ষ। প্রতি বছর এই রোগে আক্রান্ত হয়ে চার লক্ষেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। ভারতের পরেই যক্ষ্মা আক্রান্তের সংখ্যায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে চিন। বিশ্বে ৯ শতাংশ যক্ষ্মা রোগীর ঠিকানা এখানেই। ইন্দোনেশিয়া, যেখানে এই হার ৮ শতাংশ, পাকিস্তানে ৬ শতাংশ, বাংলাদেশে ৪ শতাংশ এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় ৩ শতাংশ।

    যক্ষ্মার (Tuberculosis) সঙ্গে মানুষের যুদ্ধের গল্পটা অনেক পুরনো। এবং সময়ের সঙ্গে তা ক্রমশ জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে। যখন কোনও চিকিৎসাই ছিল না তখন যক্ষ্মার অপর নাম ছিল মৃত্যু। নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি আসার সঙ্গে সঙ্গেই বিশেষজ্ঞরা বলেন, ৩৩ শতাংশের মতো রোগীরা ভাল হবেন, ৩৩ শতাংশ রোগী ভাল না হয়ে ভুগতে থাকবেন ও সংক্রমণ ছড়াতে থাকবেন, বাকিদের মৃত্যু হবে। মার্কিন সংস্থার প্রকল্প- টিউবারকিউলোসিস হেলথ অ্যাকশন লার্নিং ইনিশিয়েটিভ জানিয়েছে, ভারতে সবচেয়ে বেশি যক্ষ্মা রোগের সংক্রমণের কারণ  ‘অপর্যাপ্ত চিকিৎসা’। তাই পর্যাপ্ত অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও যক্ষ্মা বা টিবির বিরুদ্ধে মানুষের যুদ্ধ চলতে থাকাটাই তার পরাযয়ের অন্যতম কারণ।

    অনাহার, অপুষ্টি, মাদকের নেশা থেকে মহামারীর আকার নিচ্ছে যক্ষ্মা

    বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব অনুযায়ী, ২০১৬ সালে আমাদের দেশে মোট যক্ষ্মা আক্রান্তের সংখ্যা ২৭ লক্ষ ৯০ হাজার। এদের মধ্যে প্রতি বছর (২০০৬ – ২০০১৪ সাল পর্যন্ত) প্রায় ২ লক্ষ ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। শুধু তাই নয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমীক্ষায় জানা গিয়েছে যে, আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ টিবির জীবাণু বহন করছেন। কিন্তু বেশির ভাগেরই অসুখ নেই।

    বিশেষজ্ঞরা বলেন, টিবির জীবাণুরা সহজে মরে না। স্পিরিট, এমনকী অ্যাসিডও এদের অনেক সময় মারতে পারে না। এরা বাতাসে ভেসে বেড়ায়। মূলত নিঃশ্বাসের সঙ্গে আমাদের দেহে ঢোকে এবং ফুসফুস হয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। শতকরা ১০০ জন আক্রান্তের থেকে সংক্রমণ অন্তত পাঁচ জনের মধ্যে ছড়ায়।

    শরীরের ভেতরে এই জীবাণুরা সুপ্ত অবস্থায় থাকে। যদি কোনও ভাবে তারা জেগে ওঠে তাহলেই গণ্ডগোলটা বাধে। সবচেয়ে প্রথম দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। তারপর বংশবৃদ্ধি করতে থাকে দ্রুত। অপুষ্টি যেমন প্রতিরোধ ক্ষমতা কমার একটা কারণ, তেমনই মাদকাসক্ত হওয়া, ধূমপান করা, ডায়াবিটিস ও শরীরের নানা অসুখ, ক্যানসারের চিকিৎসায় বিভিন্ন কারণে দীর্ঘ দিন স্টেরয়েড খাওয়া প্রভৃতির জন্যও প্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে পারে। আর যে দেশে অনাহার, অপুষ্টির সংখ্যা এত বেশি, সেখানে যক্ষ্মা মহামারীর আবাকর নেবে এটা আর নতুন কী!

    দেশের মোট যক্ষ্মা রোগীর অধিকাংশই মাল্টি ড্রাগ রেসিস্ট্যান্স টিউবারকুলোসিস (multidrug resistant tuberculosis-MDR-TB)

    মহিলা ও শিশুদের মধ্যেও এমডিআর টিবি-র ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে। আসলে বাড়িতে কোনও এমডিআর রোগী থাকলে তাঁর থেকেও রোগ ছড়িয়ে পড়ে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে টিবি নির্মূল করার জন্য দরকার দীর্ঘ সময় ধরে ওষুধ খাওয়া। আগে যেটা বছর পেরিয়ে যেত সেটাকে প্রথমে ন’মাস ও পরে ছ’মাসের কোর্সের নামানো হয়েছে। আর এই লম্বা চিকিৎসায় দরকার একাধিক ওষুধের। বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মের পর বাধ্যতামূলক ভাবে যক্ষ্মার টিকা দেওয়া হয় ঠিকই, কিন্তু তার কার্যকারিতা থাকে ছ’বছর পর্যন্ত। এই সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পর বাচ্চাদের টিবির ঝুঁকি থাকে। যক্ষার চিকিৎসায় সাধারণত যে দু’টি সব থেকে কার্যকর ওষুধ ব্যবহারে করা হয় সেগুলি হল ইসোনিয়াজ়িড এবং রিফ্যামপিসিন। যখন টিবির চিকিৎসায় এই দু’টি ওষুধ কাজ করে না, তাকেই বলে এমডিআর টিবি।

    বিশেষজ্ঞদের মতে,  দু’তিন সপ্তাহ টানা কাশি, ঘুসঘুসে জ্বর, ওজন কমে যাওয়া— এ সমস্ত লক্ষণ শরীরে দেখা গেলেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়াটা জরুরি। আর এই সচেতনতা দিয়েই প্রথম স্তরে টিবি ধরা পড়লে চিকিৎসা হয়ে যায় সহজতর। স্পর্শে ছড়ায় না এই রোগ, ছড়ায় হাঁচি-কাশি-কফের মাধ্যমে।

    বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে প্রত্যেক বছর বিশ্বের ১৪ লক্ষ মানুষ টিবির কারণে মারা যান। এদের সিংহ ভাগই মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট টিবির শিকার। টিবি ধরা পড়ার পর হুর নির্দেশিকা মেনে নির্দিষ্ট ওষুধের মাত্রা না নিলে এমআরডি টিবির ঝুঁকি বাড়ে। এ ছাড়া অনেকেই সাময়িক ভাবে সুস্থ হয়ে গিয়েছেন মনে করে ওষুধের ডোজ কমিয়ে দেন অথবা ওষুধ খাওয়া ছেড়ে দেন। রোগীকে দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করালে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে টিবির বাড়বাড়ন্ত রুখে দেওয়া যায়।

    পড়ুন দ্য ওয়াল-এর পুজোসংখ্যার বিশেষ লেখা…

     

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More