আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন, বাঁচিয়েছিল ভিখারিরা, এখন ঘরহারাদের মুখে খাবার তুলে দেন চেন্নাইয়ের এই অটো চালক

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    চৈতালী চক্রবর্তী  

    প্রতি রবিবার তাঁর বাড়ির সামনে ভিখারিদের লাইন পড়ে যায়। সংখ্যাটা কম করেও হাজার। রান্নার আয়োজন সারা থাকে শনিবার সন্ধে থেকেই। তাঁর নিজের আশ্রম  ‘নিঝল মাইয়াম’-এর বাসিন্দাদের জন্যও সে দিন ভোজের ব্যবস্থা। ভিখারিদের পাত পেড়ে খাইয়ে, বাকি খাবার চলে যায় আরও ছ’টি আশ্রমে। অনাথ শিশুদের জন্য ঝাল কম দিয়ে সাম্বার ডাল আর ভাত তৈরি করেন নিজের হাতে। এই ভাবে চলছে বছরের পর বছর।

    পেশায় অটো চালক। দিনভর চেন্নাইয়ের অলিতে গলিতে অটো চালিয়ে মাসে রোজগার মেরেকেটে হাজার তিনেক। তা ছাড়া আরও কিছু টুকটাক কাজ। তাতেও আয় খুব বেশি নয়। অথচ মাসে অভাবী, অভুক্তদের মুখে অন্ন তুলে দিতে খরচ হয় ২০ হাজার টাকারও বেশি। তার পরে নিজের আশ্রমের খরচ তো রয়েছেই। সেখানেও ঠাঁই মিলেছে নিজের বাড়ি থেকে খেদিয়ে দেওয়া বৃদ্ধ-বৃদ্ধা থেকে ঘরহারা ভিখারিদের।

    মুরুগান। নামটা হয়তো জানেন না অধিকাংশ চেন্নাইবাসীই, কারণ প্রচারের আলো ছাড়াই নিশ্চুপে, নিঃস্বার্থ ভাবে মানুষের চোখের জল মুছিয়ে দিচ্ছেন মুরুগান। স্ত্রী ও দুই সন্তানের পরিবারে তাঁর আপনজন যে আরও!  নাম না জানা, অপরিচিত, অভাবী ধুঁকতে থাকা মানুষগুলোকে নিয়েই স্বপ্ন সাজাতে ভালোবাসেন মুরুগান। তাঁর যাপন-চাহিদা খুবই কম, কিন্তু লক্ষ্যটা এক আকাশ বড়।

    রান্নার আয়োজন চলছে মুরুগানের আশ্রমে।

    তবে শুরুটা ঠিক এমন ছিল না। আলোর পথের আগে অন্ধকারটা ছিল বড়ই গাঢ়। তারই বিবরণ দিতে গিয়ে মুরুগান বলেছেন, সালটা ১৯৯২। দশমের পরীক্ষায় ফেল করার পরে পড়াশোনায় ইতি টেনে দেয় বাড়ির লোকজন। মানসিক অবসাদ এমন চরম সীমায় পৌঁছয় যে জীবন শেষ করে দেওয়ার সংকল্প নেয় সে দিনের কিশোর। টিফিনের খরচ বাঁচানো ৩০০ টাকা নিয়ে একদিন সন্ধেবেলা বাড়ি থেকে পালিয়ে বাসে চেপে বসেন মুরুগান। উদ্দেশ্য বাস যেখানে থামবে, সেখানে নেমেই আত্মহত্যা করবেন তিনি।

    বাস পৌঁছয় কোয়েম্বত্তূরের সিরুমুগাইতে। চেন্নাইতে তাঁর বাড়ি থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার। তখন মধ্যরাত। রাস্তার ফুটপাথেই আশ্রয় নিতে হয়। বাড়ির নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে সম্পূর্ণ অপিরিচিত জায়গায় পৌঁছে এক অজানা আশঙ্কায় মন কেঁপে ওঠে। কোথায় যাওয়া যায় ভাবছেন মুরুগান, ঠিক তখনই মাথায় স্নেহের হাত রাখেন এক বৃদ্ধ। ছেঁড়াফাটা তাপ্পি মারা জামা, লুঙ্গি, কাঁধে একটা ঝোলা। মুরুগানের কথায়, “পরে জানতে পারি ওই বৃদ্ধ ছিলেন একজন মুচি। সে দিন রাতে আমাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন তাঁর ঝুপড়ি ঘরে। সারা রাত মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন সব ঠিক হবে।”

    শুধু সেই বৃদ্ধ নয়, তাঁকে আশ্রয় দিতে এগিয়ে এসেছিলেন আরও অনেক আশ্রয়হীনেরা। মুরুগান বলেছেন, “সেই ফুটপাথে অনেক মানুষ শুয়েছিলেন। তাঁদের নিজেদেরই কোনও ঠিকানা ছিল না। জমিয়ে রাখা খাবার থেকে আমাকে খেতে দিয়েছিলেন। অভাবী মানুষগুলোর আতিথেয়তা দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, এমনও হয়! আমার আত্মহত্যা করার পরিকল্পনা তাঁরাই বানচাল করে দিয়েছিলেন।” পরদিন সকালে ভিখারিরাই টাকা জোগাড় করে বাসের টিকিট কেটে মুরুগানকে তাঁর বাড়িতে ফেরত পাঠান।

    কিশোর বয়সের সেই অভিজ্ঞতার ইতি হয়তো সেখানেই হতে পারত, কিন্তু হয়নি। কারণ নিরাশ্রয়দের আশ্রয় দেওয়ার একটা বৃহত্তর পরিকল্পনা নিজের মনেই সাজিয়ে নিয়েছিলেন মুরুগান। তাকেই বাস্তব রূপ দিতে, শুরু হয় তাঁর জার্নি। জানিয়েছেন, পড়াশোনা আর সে ভাবে হয়নি। হোটেলে-রেস্তোরাঁয় কাজ করেছেন। বাসন ধুয়েছেন, খাবার পরিবেশন করেছেন। “যে সব হোটেলে কাজ করেছি সেখানে ভোর ৪টে উঠতে হতো। সাফাইয়ের কাজ সেরে রান্নার জোগাড় করতে হতো। তিন বেলা খাবার পেতাম, আর মাইনে। টাকাটা জমিয়ে রাখতাম,” বলেছেন মুরুগান।

    ছ’মাস এই ভাবে চলে। তার পর আবার নতুন কাজ। বাড়িতে বাড়িতে খবরের কাগজ বিলি। নিজের জন্য সামান্য টাকা রেখে, পুরোটাই জমিয়ে রাখতেন। এর পর একদিন অটোর স্টিয়ারিং উঠল হাতে। সালটা ২০০৬। এক সংস্থার অধীনে কয়েকটি রুটে অটো চালানোর কাজ। ড্রাইভিং লাইসেন্স জুটিয়ে দিল তারাই। শুরু হল এক নতুন পথ চলা। মাসে তিন হাজার টাকা রোজগার।

    এ লড়াই মানবিকতার। তারই পুরস্কার।

    দু’বছরে যা টাকা জমল তাই দিয়ে ২০০৮ সালে খুলে ফেললেন ‘নিঝল মাইয়াম।’ একজন, দু’জন করে ঘরহারাদের নিয়ে আসতে লাগলেন নিজের আশ্রমে। সিরুমুগাইয়ের সেই ফুটপাথ থেকেও নিয়ে এলেন অনেককে। মানসিক ভারসাম্যহীন শিশুরাও আশ্রয় পেতে শুরু করল তাঁর আশ্রমে। বাড়তে লাগল মুরুগানের পরিবার।

    “একাই শুরু করেছিলাম। কী ভাবে খরচ চালাবো জানতাম না, মনে সাহস নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলাম। পরে আরও ছয় বন্ধু যোগ দেন আমার সঙ্গে। তাঁরাও টাকা জোগাড় করে আনতেন,” মুরুগান বলেছেন, এখন এলাকার অনেক সহৃদয় ব্যক্তি আমাদের অনুদান দেন। আরও ২৫টা আশ্রমের সঙ্গে আমরা যুক্ত। সেখানকার মানুষজনেরও সেবা করি। জীব সেবাই আমাদের ধর্ম।

    প্রতি শনিবার বাজার দোকান সেরে রাখেন মুরুগান ও তাঁর স্ত্রী। ভাত, সাম্বর ডাল আর এক রকম সবজি। রবিবার সকাল থেকে ভিখারিদের লাইন শুরু হয়ে যায়। সারা সপ্তাহের জমানো টাকা থেকেই রবিবারের এই বিশেষ ভোজ। শুরুটা হয়েছিল ১০০ জন দিয়ে। এখন সংখ্যাটা হাজার ছাড়িয়েছে। আশ্রয়দাতা সে দিনের সেই বৃদ্ধ মুচি আজ আর বেঁচে নেই, তবে তাঁরই মতো শয়ে শয়ে অভাবী মানুষের পেটের জ্বালা মেটান মুরুগান। দুঃস্থ শিশুদের নিজের হাতে ভাত মেখে খাইয়ে দেন আর বলেন, “কখনও আত্মহত্যার চেষ্টা কোরো না। জীবন অনেক বড়। এগিয়ে যাও, হয়তো একদিন আমারই মতো লক্ষ্য খুঁজে পাবে।”

    আরও পড়ুন:

    চাকরি ছেড়ে চাষ, সফটওয়্যার ডেভেলপারের হাতেই সোনা ফলছে নাসিকে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More