বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৯

নেট-দুনিয়া মাতানো দুই ছোট্ট জিমন্যাস্ট খোদ কলকাতার সম্পদ! সামনে এল দারিদ্র ও প্রতিভার তীব্র লড়াই

দ্য ওয়াল ব্যুরো: দিন তিনেক আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলেছিল ১৫ সেকেন্ডের একটি ক্লিপ। স্কুলের পোশাকে, স্কুলের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে রাস্তার ধার দিয়ে হেঁটে আসা দু’টি বাচ্চা ছেলে-মেয়ে আচমকা ভল্ট দিল নিখুঁত ভাবে। ভীষণ ভাবে ভাইরাল হয়েছিল সেই ভিডিও। শুধু তা-ই নয়, এই ভিডিও টুইট করে প্রশংসা করেছিলেন স্বয়ং জিমন্যাস্টিকের কিংবদন্তী নাদিয়া কোমানিচি!

কিন্তু কে জানত, ভাইরাল ভিডিওর সেই ছেলে-মেয়ে দু’টি এই শহরেরই বাসিন্দা! গার্ডেনরিচ অঞ্চলের ভূকৈলাস রোডের বস্তির ঘুপচি টিনের ঘরে তাদের বাস। নুন আনতে পান্তা ফুরোনো পরিবারের ছেলে-মেয়ে দু’টি যে এভাবে রাতারাতি সেলিব্রিটি হয়ে গিয়েছে, তা প্রথমে টের পায়নি কেউই।

কারণ তাদের জিমন্যাস্টিকসের ভিডিও যখন ভাইরাল হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়, তখন জানা যায়নি সেটি কোথাকার। কেউ কেউ বলেছিলেন, নাগাল্যান্ডের রাস্তায় তোলা হয়েছে ওই ভিডিও। মনে করা হয়েছিল, ছেলে-মেয়ে দু’টিও হয়তো নাগাল্যান্ডেরই। কিন্তু খোঁজ-খবর করে জানা গেছে, কলকাতারই সম্পদ ১২ বছরের আলি এবং ১১ বছরের লাভলি। তাদের ভাল নাম অবশ্য মহম্মদ আজাজউদ্দিন এবং জেসিকা খান। গার্ডেনরিচের সঙ্ঘমিত্রা বিদ্যালয়ে আজাজউদ্দিন পড়ে ক্লাস এইটে, জেসিকা ক্লাস সেভেনে।

লাভলির মা রেশমা খাতুন জানালেন, কতটা কষ্ট করে বড় হচ্ছে তারা। নিম্নবিত্ত মুসলিম পরিবারে ছেলেমেয়েদের জিমন্যাস্টিকস শেখানোটা তাঁদের কাছে বিলাসিতা ছাড়া কিছু নয়। দু’জনেরই বাস দরিদ্র পরিবারে। রেশমা একটি দরজির দোকান চালান। তার বাবা তাজ খান ড্রাইভার। আলির বাবা-মা চা পাতার গুদামে দৈনিক মজুরির হিসেবে কাজ করেন।

দুই পরিবারই বাস করে বস্তির টিনের ঘরে। রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার কে‌নার ক্ষমতাও তাদের নেই। আলির মা বলেন, ‘‘দিন আনি দিন খাই পরিস্থিতি। দুধ বা কোনও স্বাস্থ্যকর খাবার আলিকে দিতে পারি না। কেবল ভাত, ডাল, সবজি। কখনও হয়তো ডিম।”

জিমন্যাস্টিকস শেখা দূরের কথা, মেয়ে নাচের স্কুলে যেতে চাইলেও বাধা দিতেন রেশমা। তবু সকালে উঠে ঘরের কাজ সেরে চুপিচুপি নাচ শিখতে চলে যেত লাভলি। কখনও সঙ্গে থাকত প্রতিবেশী পরিবারের শিশু আলিও। এই নাচ শিখতে শিখতেই জিমন্যাস্টিকসের নানা কসরত শিখে ফেলেছে তারা।

দেখুন সেই ভাইরাল ভিডিও, যা কুড়িয়ে নিয়েছিল নাদিয়া কোমানিচির প্রশংসা!

এই স্বপ্নের শুরু চার বছর আগে। স্থানীয় তরুণী শিখা রাও তাঁর নাচের স্কুলের জন্য নতুন প্রতিভা খুঁজছিলেন। ২৬ বছরের শিখা নিজেও এক জন ডান্সার। কিন্তু সুযোগের অভাবে তিনি বড় কোনও জায়গায় পৌঁছতে পারেননি। তাই পরে মন দেন বস্তি এলাকার শিশুদের নাচ ও জিমন্যাস্টিক শেখানোয়। সেটাও পুরোপুরি বিনামূল্যে।

তিনি জানান, সব বাচ্চার মধ্যেই নানা তাক লাগানো প্রতিভা থাকে। সেটাকেই ঘষামাজা করলে শিল্পী হয়ে উঠতে পারে অনেকে। সেই চেষ্টায় করেন বলে জানিয়েছেন শিখা। তিনি বলেন, “লাভলি ও আলি দু’জনেই দারুণ প্রতিভাবান। আমি ওদের জন্য বেশি কিছুই করতে পারি‌নি। আশা করব, এই ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরে কেউ নিশ্চয়ই এগিয়ে আসবে ওদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য।” শিখার নাচের ক্লাস হয় একটি ক্লাবের ঘরে, শক্ত সিমেন্টের মেঝেতে।

এখন অবশ্য অবস্থাটা অনেকটাই পাল্টে গিয়েছে। নাদিয়া কোমানিচির মতো জিমন্য়াস্ট বা কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী কিরেণ রিজিজুর আগ্রহ দেখে আলি-লাভলির পরিবার বুঝতে পেরেছে, তাদের সন্তানদের মধ্যে প্রতিভা রয়েছে। তাই এখন সেই প্রতিভার বিকাশই চান সকলে। তবে প্রথাগত ভাবে জিমন্যাস্টিকস শিখতে গেলে যে নিয়মিতপুষ্টিকর খাবারের বন্দোবস্ত করতে হয়, বা আরও বিভিন্ন খরচ করতে হবে, তা যে তাদের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়, তা-ও স্বীকার করে নিয়েছেন।

তবে প্রতিকূলতা যতই থাক, সামারস‌ল্ট, কার্টহুইল ও সাইড ফ্লিপে তুখোড়, শহরের দুই ছেলে-মেয়ে আজ বিশাল স্বপ্নের মুখে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ সেলিব্রিটি হয়ে গিয়ে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেও, তারা বুঝতে পারছে, এবার হয়তো খুব ভাল কোনও সুযোগ আসতে পারে তাদের। তারা জানিয়েছে, ভাল করে শিখে, দেশের জন্য পদক আনতে চায় তারা!

আলি-লাভলির স্কুল, সঙ্ঘমিত্রা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিশ্বরূপ উপাধ্যায়ের কথায়, “আমি তো চাই ওরা সুযোগ পাক জিমন্যাস্টিকস শেখার। এই ভাবে যদি রাজ্য বা জাতীয় স্তরে গিয়ে সফল হতে পারে, তার থেকে ভালো আর কী হতে পারে!”

আরও পড়ুন:

স্কুলের পোশাকে পথের মাঝেই দুরন্ত জিমন্যাস্টিক দুই ছাত্র-ছাত্রীর, প্রশংসায় মুখর স্বয়ং নাদিয়া কোমানিচি!

Comments are closed.