মঙ্গলবার, জুন ২৫

দিনভর শিরোনামে কোচবিহার, অভিযোগ পাল্টা অভিযোগে রয়ে গেল রহস্যও

দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রথম দফার ভোটে বাংলার দুই কেন্দ্রের মধ্যে সারাদিনই প্রায় শিরোনামে রইল কোচবিহার। তেমনটাই আন্দাজ করা গিয়েছিল। তুলনায় আলিপুরদুয়ারের ভোট কিছুটা নিস্তরঙ্গ। দুটো কেন্দ্রেই বিক্ষিপ্ত অশান্তি নিয়ে তৃণমূল এবং বিজেপি একে অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তুলেছে। ভোট শেষের পর একশোর বেশি বুথে রিপোলের দাবিতে ধর্ণায় বসেন কোচবিহারের বিজেপি প্রার্থী নিশীথ প্রামাণিক। রাত সাড়ে আটটা নাগাদ অবস্থান উঠে যায়।

দৃশ্য ১, সকাল নটা- কোচবিহারের দিনহাটায় বিজেপি কর্মীদের তাড়ায় মাঠ পেরিয়ে ছুটছে তৃণমূল কর্মীরা।

দৃশ্য ২, সকাল সাড়ে নটা- কোচবিহারের বিজেপি প্রার্থী নিশীথ প্রামাণিক বলছেন, ‘খেলা তো এখনও শুরুই হয়নি। পুরো দিন তো পড়ে রয়েছে।’

দৃশ্য ৩, সকাল দশটা- তৃণমূলের কোচবিহার জেলা সভাপতি রবীন্দ্রনাথ ঘোষ অভিযোগ করছেন, বিএসএব বর্ডার এলাকায় সাধারণ মানুষকে ভয় দেখাচ্ছে। কমিশন কোনও কথা কানে তুলছে না। একই সুরে উষ্মা প্রকাশ করেন তৃণমূল প্রার্থী পরেশ অধিকারীও।

ভাবা যায়! তৃণমূলের খাসতালুকে তৃণমূলকে দৌড়ে পালাতে হচ্ছে! এক বছর আগেও পঞ্চায়েত নির্বাচনে ছিল ঠিক এর উল্টো ছবি। কিন্তু এ দিন বেলা যত বাড়তে থাকে পাল্টাতে থাকে ছবি। তৃণমূলের বিরুদ্ধে ছাপ্পা ভোট এবং বুথ দখলের অভিযোগ তোলে বিজেপি। দুপুর দেড়টা নাগাদ কোচবিহারের জেলা তৃণমূল কার্যালয়ে লাঞ্চ সেরে নিয়ে তরমুজে কামড় দিতে দিতে রবি ঘোষ বলে দেন, “ওষুধ দিয়ে দিয়েছি। যা কাজ হওয়ার হয়ে গেছে।” ভোট শেষ হওয়ার ঘণ্টা দেড়েক পর, জেলার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর  কোচবিহার পলিটেকনিক কলেজে রিপোলের দাবিতে ধর্ণায় বসেন নিশীথ। ঘণ্টাখানেক সেখানে বসার পর বিজেপি প্রার্থীকে পুলিশ তুলতে এলে ধুন্ধুমার বেঁধে যায় সেখানে।

আলিপুরদুয়ার কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী জন বার্লা অভিযোগ করেন, যে বুথগুলিতে রাজ্য পুলিশ দিয়ে ভোট করানো হয়েছে, সেরকম অসংখ্য বুথে তৃণমূল ভোটকে প্রহসনে পরিণত করেছে। তৃণমূলের জলপাইগুড়ি জেলা সভাপতি তথা আলিপুর দুয়ারের বিধায়ক সৌরভ চক্রবর্তীও রবি ঘোষের সুরেই কেন্দ্রীয়বাহিনী এবং বিএসএফ-এর বিরুদ্ধে সাধারণ ভোটারদের ভয় দেখানোর অভিযোগ তোলেন।

কমিশন অবশ্য জানিয়েছে বিক্ষিপ্ত কয়েকটি ঘটনা ছাড়া মটের উপর ভোট শান্তিপূর্ণ। পুলিশের বিশেষ পর্যবেক্ষক বিবেক দুবেও কয়েক প্রথম কয়েক ঘণ্টা কোচবিহারে থেকে কলকাতার উদ্দেশে রওনা দেন। বিকেলে কলকাতা বিমানবন্দরে নেমে দুবে বলেন, “ভোট শান্তিপূর্ণ। এবং পুলিশ সাহায্য করেছে।” ভোট শেষের পর সাংবাদিক বৈঠক করে রাজ্য নির্বাচন কমিশনের মুখ্য আধিকারিক আরিজ আফতাব জানান আলিপুরদুয়ার ৮১.৫৮ শতাংশ এবং কোচবিহারে ভোট পড়েছে ৮০.১১ শতাংশ।

আলিপুরদুয়ারের ভোট নিয়ে তেমন চাপানউতোর না হলেও, কোচবিহারের ভোট ছিল রহস্যে মোড়া। সকালে বিজেপি-র মুখে হাসি তো তৃণমূল উদ্বিগ্ন। বিকেলে বিজেপি-র গলায় উৎকণ্ঠা তো তৃণমূল নির্বিকার।

তাহলে কী হয়েছে কোচবিহারে?

বৃহস্পতিবার দুপুরে কালিম্পঙের জনসভা থেকে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ জানিয়ে দেন, কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ার, দুটোতেই জিতবে বিজেপি। ধর্ণায় বসে নিশীথ বলেন, “জিতে তো গেছিই। কিন্তু যে মানুষ তৃণমূলের  গুন্ডামি আর রাজ্য পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় ভোট দিতে পারল না, আমরা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে ধর্ণায় বসেছি।” একদা তৃণমূলের দোর্দণ্ডপ্রতাপ যুবনেতাকে প্রশ্ন করা হয়, “পার্থপ্রতিম রায় উপনির্বাচনে সাড়ে তিন লক্ষ ভোটে জিতেছিলেন। আপনি কী ভাবে জিতবেন? নিশীথের সাফ জবাব, “তখন নিশীথ প্রামাণিক তৃণমূল করত। এখন নিশীথ বিজেপি-র প্রার্থী।”

এ দিন সকালে দার্জিলিং থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফোন করেছিলেন রবি ঘোষকে। ভোট তখন ঘণ্টা তিনেক হয়েছে। কিন্তু দিদিকে ভাল খবর শোনানোর বদলে কেন্দ্রীয়বাহিনী নিয়ে অভিযোগ শুনিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ-ঘনিষ্ঠ এক তৃণমূল নেতার কথায়, “তখন দাদাকে বড্ড উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছিল।” কিন্তু সেই রবি ঘোষই সন্ধে বেলা জানিয়ে দেন, “আমরাই জিতছি। কোনও চিন্তা নেই। বিজেপি চেষ্টা করেছিল কেন্দ্রীয়বাহিনী দিয়ে ডিসটার্ব করার। কিন্তু বেলা যত গড়িয়েছে, মানুষ তা ব্যর্থ করা দিয়েছে।”

ভোটের ফল কী হবে তা তো জানা যাবে  ২৩ মে। ততদিন পর্যন্ত কোচবিহারের ভোট থাকবে রহস্যের রাংতা মোড়া।

Comments are closed.