‘আমাকে বাবার মতো শ্রদ্ধা করত, ভালবাসত, ওঁর বাবার কথাই বরং শুনত না’

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    সুব্রত মুখোপাধ্যায়

     

    ভাবতে খুব কষ্ট হচ্ছে অমর সিং আর আমাদের মধ্যে জীবিত নেই। কী বা বয়স হয়েছিল ওঁর। মাত্র ৬৪ বছর। কত ছোট ছিল আমাদের থেকে। ওঁর শরীররাটা যে ভাল নেই তা জানতাম। সিঙ্গাপুরে গত কয়েক মাস ধরে চিকিৎসা চলছিল। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি ও ছেড়ে চলে যাবে দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি।

    অমরের সঙ্গে আমার সম্পর্ক চার দশকেরও বেশি পুরনো। ও ছিল আমার ভাইয়ের মতো, আমার পরিবার। আমাকে বাবার মতো শ্রদ্ধা করত। বরং ওঁর বাবার কথাই শুনত না। যুব কংগ্রেস করার সময় থেকেই ও ছিল আমার ন্যাওটা। সকালে আমার কাছে আসত। সারাদিন আমার সঙ্গে থাকত। রাতে বাড়ি যেত।

    আদতে উত্তরপ্রদেশের লোক হলেও ওঁরা সপরিবারে কলকাতায় চলে এসেছিল বহু বছর আগে। অমরের পড়াশোনাও ছিল কলকাতায়। পরে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়েছে। বড়বাজারে ওঁদের একটা হার্ডওয়ারের দোকান ছিল। সম্ভবত তালার ব্যবসা। ওঁর বাবা আমাকে বলতেন, দিনভর আপনার কাছে পড়ে থাকে। ব্যবসাটাও তো একটু দেখতে পারে। কিন্তু কে কার কথা শোনে। আসলে রাজনীতি নিয়ে ওঁর একটা রোমান্টিকতা ছিল। ওটাতেই মজা পেত। আমার সঙ্গে কত ‘দুঃসাহসী অভিযান’ ( যেগুলো সব লেখার মতো নয়, তবে বামেদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য অপরিহার্য ছিল) ও করেছে ইয়ত্তা নেই।

    খুব মনে পড়ছে ৮২ সালের কথা। ৭২ সালে ক্ষমতায় এসেছিলাম আমরা। পাঁচ বছর পর ৭৭ সালের ভোটে আমি জিততে পারিনি। তার পরের ভোটে আমাকে টিকিট দেওয়া হল কলকাতার জোড়াবাগান থেকে। শুনলাম ওখানে নাকি সিপিএম কোনও মাহেশ্বরীকে প্রার্থী করবে। খুব চিন্তায় পড়লাম। অবাঙালি এলাকা। তার উপর ওখানে মাহেশ্বরীদের ভাল ভোট রয়েছে। সব শুনে অমর আমাকে বলল, দাদা কোনও চিন্তা নেই। আপনার কি মাহেশ্বরীদের কারও সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে? আমি বললাম, না তো। ও বলল, বিড়লাদের বাড়ির কাউকে চেনেন না! আমি বললাম, তা চিনব না কেন, ভাল করে চিনি। বলল, তা হলে একবার ওদের সঙ্গে দেখা করুন।

    দিল্লিতে গিয়ে কে কে বিড়লার সঙ্গে দেখা করলাম। অমরও ছিল সঙ্গে। উনি সব শুনে বললেন, ওখানে আমাদের জানাশোনা অন্তত একশটি পরিবার রয়েছে। আপনি সবার সমর্থন পাবেন। এ কথা বলে, কুমার মঙ্গলম বিড়লাকে উনি বলে দিলেন এ ব্যাপারে সবার সঙ্গে যোগাযোগ করতে।

    বিড়লাদের সঙ্গে সেই থেকে আমার সম্পর্ক শুধু মজবুত হল তা নয়। ওঁদের সঙ্গে অমরেরও খুব ভাল বন্ধু সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল। কুমার মঙ্গলম বিড়লার মেয়ে শোভনা ভারতিয়া ও তাঁর স্বামীর সঙ্গে বেশ দোস্তি হয়ে গেল অমরের।

    তার পর থেকে দিল্লিতেই বেশি থাকতে শুরু করে দিল অমর। ওই সময়ে একবার উত্তরপ্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বীর বাহাদুর সিং কলকাতায় কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে এসেছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় অমরের। এমনিতেই লখনউতে অমরদের পারিবারিক বাড়ি ছিল। বীরবাহাদুরের সঙ্গে আলাপের পর লখনউতেও যাতায়াত বে়ড়েছিল অমরের। শুনেছি বীর বাহাদুরের বাড়িতেই মুলায়ম সিংয়ের সঙ্গে প্রথমবার দেখা হয়েছিল অমর সিংয়ের। পরে মুলায়মের অন্যতম আস্থার ও ভরসার মানুষ হয়ে উঠেছিল।

    আসলে অমরের মতো প্রাণোচ্ছ্বল, আড্ডাবাজ, চৌখস ছেলে রাজনীতিতে কম পাওয়া যায়। যে কারও ভাল লেগে যেতে বাধ্য। মুলায়মের সমাজবাদী পার্টির ভোল বদলে দিয়েছিল অমর। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই দিল্লির রাজনীতিতে অন্যতম চরিত্র হয়ে উঠেছিল অমর। বাজপেয়ী সরকারের বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষ জোট গঠনে ও ছিল অন্যতম অনুঘটক। সনিয়া গান্ধীর সঙ্গে হরকিষেণ সিং সুরজিতের বোঝাপড়ার মাধ্যম।  পরে বামেরা ইউপিএ থেকে সমর্থন তুলে নিলে সেই সরকার বাঁচিয়ে রাখাতেও কম ভূমিকা ছিল না অমরের।

    বরাবরই খেতে ভাল বাসত অমর। চাট, ছোলে বাটুরে, মিষ্টি..। আর সুযোগ পেলেই সিনেমা দেখত। আকছার বলত, দাদা একটু আসছি। এই বলেই একটা সিনেমা দেখে চলে আসত। এমনকি হলে ঢুকে পড়ে মাঝখান থেকে পর্যন্ত সিনেমা দেখে নিত। রূপোলি পর্দার সেই জৌলুস, চাকচিক্য ওর বরাবরই পছন্দের ছিল। নিজের জীবনকেও নিয়ে গিয়েছিল সে পথে। অমিতাভ বচ্চন থেকে শুরু করে মুম্বইয়ের চলচ্চিত্র জগতের কত অভিনেতার সঙ্গে তাঁর যে সম্পর্ক ছিল ইয়ত্তা নেই। সেই সঙ্গে শিল্পমহলের সঙ্গেও অমরের সম্পর্ক ছিল বরাবরই ভাল। আসলে জনসংযোগটা খুব ভাল ছিল অমরের। একবার কারও সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হলে তা ধরে রাখতে জানত। শুধু দেশে নয়, দেশের বাইরেও ওঁর বন্ধু ছিল। এমনকী মার্কিন প্রেসিডেন্টের অফিস থেকে ওঁর কাছে ফোন আসতে দেখেছি।

    গত কয়েক বছর ধরেই অমরের শরীরটা ভাল যাচ্ছিল না। ওঁর কিডনির সমস্যা ছিল। প্রথমবার সিঙ্গাপুরে গিয়ে অপারেশন করে ফেরার পর লম্বা অনেকটা সময় বেশ ভাল ছিল। কিন্তু আবার সমস্যা দেখা দিল। কে জানে! এখানেও তো কি়ডনির ভাল চিকিৎসা হচ্ছে আজকাল। সিঙ্গাপুরেও ভাল চিকিৎসা হওয়ারই কথা। কেন ওঁরা বাচিয়ে রাখতে পারল না জানি না। খবরটা শোনার পর থেকেই বড় অসহায় লাগছে। অন্য সময় হলে এখনই প্লেন ধরে চলে যেতাম। তা সে দুনিয়ার যে মুলুকই হোক না কেন। ও তো আমার ভাই। কিন্তু এখন তো সব ফ্লাইটও বন্ধ। দেখি কী করি। ওর মেয়েদের ফোন করি একবার..

    লেখক: পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More