দত্তপুকুরের ‘সামুরাই ঠাকুমা’! ৬৯ বছর বয়সের কিক-পাঞ্চের কাছে গোল খাচ্ছে ১৯ কিংবা ২৯

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: বয়স নাকি সংখ্যামাত্র। মনের ইচ্ছের কাছে, শরীরের বয়স নাকি কোনও বাধাই নয়।– এ কথা আমরা সকলেই জানি, এমনকী প্রায়ই বলি। কিন্তু সত্যি করে কি বয়সকে হারাতে পারি আমরা? মন থেকে চাইলেও, একটা বয়সের পরে শারীরিক পরিস্থিতি কি আমাদের ইচ্ছে পূরণে বাধা হয় না? আপনি-আমি হয়তো এর উত্তরে বলব, হ্যাঁ হয়। একটা বয়সের পরে শরীরের বাধা মনের ইচ্ছেদের আটকে দেয়। কেউ হয়তো বলবেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক বাধাও অনেক বাড়ে।

কিন্তু এ সব তর্ক-বিতর্ককে অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছেন দত্তপুকুরের ‘সামুরাই ঠাকুমা’। হ্যাঁ, ৬৯ বছরের এই বৃদ্ধার ভাল নাম একটা আছে বটে, কিন্তু সে নামকে পেছনে ফেলে স্থানীয় মানুষের কাছে বড় হয়ে উঠেছে তাঁর এই পরিচিতিটাই। বয়সের হিসেবে এ প্রতিবেদনে তাঁকে বৃদ্ধা বলে উল্লেখ করা হল বটে, কিন্তু আদতে যে তিনি মোটেই বৃদ্ধা নন, তার প্রমাণ তাঁর কাজই।

৪২ বছর ধরে নাগাড়ে স্কুলের শিক্ষিকা হিসেবে পড়ানোর পরে, ৬৩ বছর বয়সে পৌঁছে দত্তপুকুরের মুক্তি মুখোপাধ্যায় দে ঠিক করেন, এবার কিছু করতে হবে। ‘কিছু করা’র জন্য ৬৩ বছর বয়সটা অনেকের কাছেই বেশি মনে হলেও, মুক্তিদেবীর কাছে সেটা কেবল সংখ্যা ছিল। বলছিলেন, “আমি ছোট থেকেই নাচ, গান, নাটক, আবৃত্তি, যোগব্যায়াম– এ সব করতাম। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যা হয়, সবই একে একে বিদায় নেয়। কিন্তু সব বন্ধ হলেও,আমার স্বপ্ন দেখাটা কোনও দিন বন্ধ হয়নি, ইচ্ছে কোনও দিন কম পড়েনি। আমি অপেক্ষায় ছিলাম, কবে একটু সময় পাব। সময় পেলাম, অবসরের পরে। বয়সের হিসেবে হয়তো দেরি হয়ে গেল, কিন্তু আমার ইচ্ছের কাছে সে বয়স হেরে গেল।”

২০১৩ সালে দত্তপুকুর স্টেশনের কাছেই বলাকা সংঘ ক্লাবের ক্যারাটে ক্লাসে যে দিন প্রথম গিয়েছিলেন, সে দিন অনেকেই ভেবেছিল, কোনও ছাত্র-ছাত্রীর দিদিমা বা ঠাকুমা এসেছেন হয়তো স্যারের সঙ্গে কথা বলতে। ‘স্যার’ কিন্তু চমকে উঠেছিলেন তাঁর কথা শুনে। “আমি কি পারব? এই বয়সে শুরু করা যায়?– এটাই ছিল ওঁর প্রশ্ন।”– বললেন, মুক্তিদেবীর ক্যারাটে ট্রেনার অনিন্দ্য ভট্টাচার্য। দীর্ঘ দিন ধরেই ওই ক্লাবে ক্যারাটে শেখাচ্ছেন তিনি। নানা বয়সের ছেলে মেয়ে ভিড় করে তাঁর ক্লাসে। কিন্তু তাই বলে ৬৩ বছর বয়সে ক্যারাটে শেখা শুরু করতে চাইছেন এক মহিলা!

বিস্ময় চেপে রেখেই সে দিন অনিন্দ্য বলেছিলেন, “আপনার ইচ্ছে থাকলে নিশ্চয় হবে।”
আর আজ, ছ’বছর পরে মুক্তিদেবী বলছেন, “আজকে আমি যা, তার সবটুকু কৃতিত্ব অনিন্দ্যর। ও আমায় তৈরি করেছে। আমার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু ও উৎসাহ না দিলে পারতাম না। আমার মনের জোরকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে অনিন্দ্য।”

ছাত্রী-শিক্ষক যেন পরস্পরের পরিপূরক হয়ে উঠেছেন। অনিন্দ্যবাবুর তীব্র চেষ্টাকে যেমন মুক্তিদেবী কৃতিত্ব দিচ্ছেন, তেমনই অনিন্দ্যবাবু বলছেন, “উনি কোনও কিছুতে না বলেননি কখনও। যখন যেটা শেখাতে চেয়েছি, যা করতে বলেছি, তা যত কঠিনই হোক, চেষ্টা না করে হার মানেননি মুক্তিদেবী।”

আর এখানেই বোধ হয় জিতে গেছে মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা খেলোয়াড় সত্ত্বা। হার-না-মানার লড়াকু মনোভাব। বাধা তুচ্ছ করে এগিয়ে যাওয়ার জেদ। তাই তো ছ’-সাত বছরের টানা অনুশীলনে সামুরাই ঠাকুমা মুক্তিদেবী আজ ব্ল্যাকবেল্ট অর্জন করেছেন। আন্তর্জাতিক স্তরের প্রতিযোগিতায় নেমে সোনাও জিতে এনেছেন গত বছর!

হবে না-ই বা কেন। মুক্তিদেবী যে এই বয়সেও জোর গলায় বলতে পারেন, শারীরিক বা সামাজিক, কোনও রকম প্রতিবন্ধকতা নেই মুক্তিদেবীর। “আমার ছেলে আমায় সব সময়ে অনুপ্রেরণা জোগায়। আমার ট্রেনার অনিন্দ্য ভট্টাচার্যের কথা আর কী বলব। আমার শারীরিক কোনও সমস্যা নেই। সুগার, প্রেশার– কিছু নেই। হাড়েরও কোনও সমস্যা হয় না। সামান্য কোনও অসুবিধা হলেই অনিন্দ্য ব্যায়াম দেখিয়ে দেয়। আমি ক্যারাটে করে একেবারে সুস্থ আছি, ভাল আছি।”– তৃপ্তি চাপা থাকে না ৬৯ বছরের ‘তরুণী’র কণ্ঠে।

অনিন্দ্য জানালেন, যখন মুক্তিদেবী তাঁর কাছে ভর্তি হয়েছিলেন, শরীরের ওজন ছিল ৮৭ কেজি। এখন সেটা কমে হয়েছে ৬০ কেজি। চিকিৎসকেরা বলেছেন, কোথাও কোনও অসুবিধা নেই ওঁর শরীরে। বার্ধক্যও থাবা বসাতে পারেনি।

এই বয়সে পৌঁছেও নিজেকে নতুন করে গড়েপিটে নিয়েছেন মুক্তিদেবী। হয়ে উঠেছেন, গোটা এলাকার সামুরাই ঠাকুমা। কিন্তু আজকের যুগের মেয়েদের নিয়ে কী ভাবেন তিনি? মুক্তিদেবী বললেন, “এখন তো মেয়েরা অনেক সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছ, আমরা পাইনি। আমাদের বাড়ি থেকে বেরোনোই কঠিন ছিল। এখনকার মেয়েরা আগে পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াও। ওরা যথেষ্ট স্বাধীনতা পেয়ে বড় হচ্ছে, সেটাকে কিন্তু ঠিকঠাক কাজে লাগাতে হবে। সমাজে কিছু দিতে হবে। মাথা উঁচু করে চলতে হবে ওদের।”

দেখুন ভিডিও।

আর এই সম্মান নিয়ে চলার জন্য ক্যারাটের প্রশিক্ষণ বেশ জরুরি বলেই মনে করেন তিনি। বললেন, “আজ থেকে কয়েক দশক আগে চার দিকে এত হিংসা ছিল না। মেয়েদের নিরাপত্তাও বোধ হয় আর একটু বেশি ছিল। তাই বলব, আজকাল আত্মবিশ্বাস বাড়ানো খুব জরুরি। সেটার জন্য ক্যারাটে শেখা যেতে পারে। দু’দিন শিখেই যে খারাপ লোকেদের মেরে উড়িয়ে দেওয়া যাবে এটা বলব না। কিন্তু কিছু সময় ঠেকিয়ে অন্তত রাখা যাবে, যাতে লোকজন জড়ো হওয়ার সময়টা পাওয়া যায়। আর এই শিক্ষা এক দিনে হবে না, নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে আয়ত্ত করতে হবে।”

আর সামুরাই ঠাকুমার দ্রোণাচার্য অনিন্দ্য বলছেন, “আমি শিক্ষক হিসেবে ১০০-য় ১০০ দেব ওঁকে। কারণ উনি কতটা কী শিখছেন– তার থেকেও জরুরি হল, উনি অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পেরেছেন আর পাঁচটা মানুষের। উনি অনেককে বোঝাতে পেরেছেন, শুধু আত্মরক্ষার জন্য নয়, সুস্থতার জন্যও ক্যারাটে বেশ জরুরি। এই স্পোর্টসে অনেক মহিলা এসেছেন ওঁকে দেখে। আর পাঁচ জনকে উদ্বুদ্ধ করতে পারার এই গুণটাকেই আমি কুর্নিশ করি।”

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More