মঙ্গলবার, মার্চ ২৬

শিলচরে হিন্দুত্ববাদীদের হাতে আক্রান্ত কবি শ্রীজাত

দ্য ওয়াল ব্যুরো: উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হাতে ফের আক্রান্ত কবি শ্রীজাত। ফের বিতর্কের কেন্দ্র বিন্দু ত্রিশূল নিয়ে লেখা তাঁর কবিতা। শনিবার সন্ধেবেলা এই ঘটনা ঘটেছে অসমের শিলচরে। কাছাড়ের পুলিশ সুপার রাকেশ রোশন দ্য ওয়াল-কে জানিয়েছেন, আপাতত নিরাপদেই আছেন শ্রীজাত।

এ দিন শিলচরের একটি সংস্থা ‘এসো বলি’র আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিলেন কবি শ্রীজাত। তাঁর হাত দিয়েই সূচনা হওয়ার কথা ছিল এই সংস্থার। এই জন্য এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল শিলচরের পার্ক রোডের ‘রিয়া প্যালেস’ নামের একটি অভিজাত হোটেলে।

শিলচরের স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, এই অনুষ্ঠান নিয়ে সকাল থেকেই নানা কথা বলছিল উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। সোশ্যাল মিডিয়াতেও শ্রীজাতর লেখা পুরনো বিতর্কিত সেই কবিতাটার প্রসঙ্গ তুলে বহু উসকানি মূলক পোস্ট করছিল তাঁরা।

শিলচরের বাসিন্দা ও ওই অনুষ্ঠানে হাজির থাকা অধ্যাপক জয়দীপ বিশ্বাস দ্য ওয়ালকে জানান, গোলমালের আশঙ্কায় হোটেলের সামনে প্রচুর পরিমাণে পুলিশ মোতায়েন করেছিল স্থানীয় প্রশাসন।

অনুষ্ঠান শুরু আগেও কাছাড়ের জেলাশাসকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন উদ্যোক্তারা। কিছুটা দেরিতেই শুরু হয় ওই অনুষ্ঠান।

অনুষ্ঠান চলাকালীন হঠাতই এসে হাজির হন পাঁচ-ছ’জন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কর্মী। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, তাঁরা সকলেই স্থানীয় বজরং দলের লোক। নেতৃত্বে ছিলেন বাসুদেব শর্মা নামের এক স্থানীয় বজরং নেতা। তবে অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে প্রথমেই কোনও ঝামেলা করেননি তারা। উদ্যোক্তাদের কাছে এসে তাঁরা জানিয়েছিলেন, তাঁদের কিছু কথা বলতে দিতে হবে। সেই সময় স্থানীয় শিল্পীদের সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছিল। উদ্যোক্তারা তাঁদের বলেন, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার জন্য।

সংবর্ধনা পর্ব শেষ হওয়ার আগেই ফের কথা বলার দাবি তোলেন ওই হিন্দুত্ববাদীরা। বাধ্য হয়ে তাঁদের কথা বলতে দেন আয়োজকরা।

তখন, তাঁদের মধ্যে একজন মাইকে এসে বলেন, কবি শ্রীজাতর কাছে তাঁর একটা কবিতার লাইনের ব্যাখা চান তাঁরা। বলে, শ্রীজাতর সেই বিতর্কিত কবিতার পংক্তিটির মানে জানতে চান তাঁরা। ঘটনার আকস্মিকতায় প্রথমে হতভম্ব হয়ে যান সবাই।

তারপর ওই অনুষ্ঠানে হাজির থাকা এই স্থানীয় সাংবাদিক তীব্র ভাষায় প্রতিবাদ করেন এই আচরণের। তিনি জানান, শ্রীজাতর কোনও কবিতার লাইনের অর্থ জানার থাকলে অন্য সময়ে তাঁরা সেটা জানতে চাইতে পারেন। কিন্তু এইভাবে একটা অনুষ্ঠান চলার সময়, বাধা দিয়ে এমন প্রশ্ন করতে পারেন না তাঁরা।

হিন্দুত্ববাদীরা পালটা উত্তর দেন, অনুষ্ঠানে বাধা দিতে তাঁরা চান না। শুধু কবি শ্রীজাতর কাছ থেকে তাঁর ওই পংক্তিটির উত্তর শুনেই বেরিয়ে যাবেন তাঁরা।

এই কথার প্রতিবাদ করেন ওই অনুষ্ঠানে আসা অন্যরাও।  উদ্যোক্তা ও পুলিশের লোকেরা কার্যত জোর করেই বাইরে বের করে দেন অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়া ওই পাঁচ ছয়জনকে।

এরপরেই ক্রমশই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। হোটেলের সামনে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা জড়ো হয়ে স্লোগান দিতে শুরু করেন। কিছুক্ষণ পরে হোটেল লক্ষ্য করে ঢিল ছুঁড়তেও শুরু করে উত্তেজিত জনতা। ভাঙে হোটেলের কাচও।

এরপরই হোটেল কর্তৃপক্ষ অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার অনুরোধ করে। এমনকি কিছু লাইটও বন্ধ করে দেয় তাঁরা। কিন্তু বাইরে উত্তেজিত জনতার সামনে বেরোতে ভয় পান অনেকেই। অবশেষে ন’টা নাগাদ স্থানীয় কয়েকজন সাহস করে হোটেল থেকে বেরিয়ে আসেন। সেই সময় তাঁদের লক্ষ্য করে অশ্লীল গালাগালি করতে থাকে উত্তেজিত জনতা।

এর কিছুটা পরেই আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের একাংশ জোর করে ঢুকে যায় হোটেলের ভেতরে। দাবি করে শ্রীজাতকে তুলে দিতে হবে তাঁদের হাতে। অনুষ্ঠানে হাজির মহিলারা কোনও মতে সেই মারমুখী জনতার হাত থেকে রক্ষা করে শ্রীজাতকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হাত থেকে বাঁচাতে শ্রীজাতকে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় হোটেলেরই একটা ঘরে।

পরিস্থিতি শান্ত করতে পাঠানো হয় বিরাট পুলিশ বাহিনী। উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হাত থেকে কোনওমতে উদ্ধার করা হয় কবি শ্রীজাতকে।

কাছাড়ের পুলিশ সুপার রাকেশ রোশন অবশ্য দ্য ওয়াল-কে জানান, আলোচনার মাধ্যমেই শান্ত করা গিয়েছে প্রতিবাদীদের। কবি শ্রীজাতকেও ওখান থেকে সরিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে বলে তিনি জানান।

শিলচরের স্থানীয় সূত্রের খবর, কাল সকালের বিমানে কলকাতায় নিয়ে আসা হবে শ্রীজাতকে। যদিও এই ব্যাপারে মুখ খুলতে রাজি হননি পুলিশ সুপার।

শনিবার রাত অবধি বহুবার চেষ্টা করেও কবি শ্রীজাতর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি দ্য ওয়াল। রবিবার সকালে অবশ্য জানা গিয়েছে কলকাতায় ফিরে এসেছেন তিনি।

এর আগেও একই কবিতা নিয়ে শিলিগুড়িতেও আক্রান্ত হয়েছিলেন কবি শ্রীজাত।

Shares

Comments are closed.