মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৬

নাগেরবাজার: মঞ্চ বেঁধে, লোক দেখিয়ে, ক্ষতিপূরণ পাচুর, কান্নায় ভেঙে পড়লেন বিভাসের বাবা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘বাবা একটু জল দেবে! সারা গা জ্বলে যাচ্ছে বাবা! একটু জল দাও না!”

বিস্ফোরণে তখন ঝলসে গেছে আট বছরের বিভাসের শরীর। বাবার কোলে শুয়ে চিৎকার করে এই কথাই বলেছিল ফুলের মতো শিশুটা। কথায় বলে সন্তান শোক সবচেয়ে বড় শোক। আর নিজের কোলে ছেলেটাকে জ্বলে পুড়ে মরতে দেখেছেন যে বাবা, তাঁকেই কিনা মঞ্চে তুলে, ‘লোক দেখানো’ অনুষ্ঠান করে চেক দিলেন দক্ষিণ দমদম পুরসভার চেয়ারম্যান পাচু রায়। সেই চেক নিতে যখন মঞ্চে উঠছেন মৃত বিভাসের বাবা, তখন হাউহাউ কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। যা দেখে ওখানে উপস্থিত অনেকেই নিজেদের চোখের জল ধরে রাখতে পারলেন না।

নাগের বাজার বিস্ফোরণে মৃত বিভাসের পরিবারকে দু’লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছিল রাজ্য সরকার। বিস্ফোরণে আহত বিভাসের মা-র জন্য আরও ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু সেই চেক বিতরণ নিয়ে যে কাণ্ড করলেন দক্ষিণ দমদম পুরসভার চেয়ারম্যান পাচু রায়, তা দেখে অনেকেই বলছেন, একেই কি বলে পাশে দাঁড়ানো! এর থেকে অমানবিক কিছু হতে পারে! এরা রাজনীতিক!

বৃহস্পতিবার সন্ধেবেলা, হ্যালোজেন জ্বালিয়ে, মাইক বাজিয়ে নাগের বাজার বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্তদের ‘পাশে দাঁড়ানোর’ কর্মসূচি সারলেন শাসক দলের স্থানীয় নেতারা। এখনও বিভাসের মা জানেন না তাঁর ছেলে আর নেই। বিস্ফোরণে আহত হয়ে তিনি এখনও হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ক্ষত শুকোচ্ছেন। দ্বিতীয়ার সন্ধেবেলায় পাচুবাবুর গায়ে সবুজ পাঞ্জাবী। আর তাঁর হাত থেকে চেক নেওয়ার জন্য রাস্তার মোড়ে ডেকে আনা হলো নিহত শিশুর বাবাকে। কান্নায় ভেঙে পড়া বাবা-র হাতে চেক ধরিয়ে মঞ্চে দাঁড় করিয়ে রাখা হল, যতক্ষণ না ফটো তোলা শেষ হয়!

নাগের বাজার বিস্ফোরণ স্থলের উপরেই পাচু বাবুর পার্টি অফিস। ২ অক্টোবর, চার বছর আগে বর্ধমানের খাগড়াগড়েও শাসক দলের পার্টি অফিসের উপরেই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল। আর এই অফিস যতটা না তৃণমূলের, তার থেকে বেশি পাচু রায়ের।

কে এই পাচু রায়? যিনি বিস্ফোরণের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে তিনবার বয়ান বদল করেছিলেন। এখনও তদন্ত চলছে নাগেরবাজার বিস্ফোরণের উৎস খোঁজায়। অনেকের মতে এখনও পাচুবাবু গোটা বিষয়টির বাইরে নন। গোষ্ঠী দ্বন্দ্বের কারণে এই বিস্ফোরণ নয় তো? এমন প্রশ্ন যখন উঠছে তখন পাচুবাবু এই অনুষ্ঠান করে নিজেকে সন্দেহের উর্ধে রাখতে চাইলেন বলেও মনে করছেন অনেকে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অতীতে এমন অনেক ঘটনায় আক্রান্ত বা নিহতদের বাড়িতে যেতেন। গায়ে, মাথায় হাত বুলিয়ে পাশে দাঁড়াতেন সেই পরিবারের। গত ২৭ অগস্ট ঝাড়গ্রামের দীর্ঘদিনের তৃণমূল নেতা চন্দন ষড়ঙ্গী খুন হওয়ার পর মমতা তাঁর বাড়িতে পাঠিয়েছিলেন পরিবেশ ও পরিবহণ মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং শিক্ষা মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে। পরে নিহত চন্দন ষড়ঙ্গীর বাড়ি গিয়ে গিয়ে শুভেন্দুবাবু ক্ষতিপূরণের চেক তুলে দিয়ে এসেছিলেন। ইসলামপুর কাণ্ডের পরেও নিহত দুই ছাত্র তাপস বর্মন এবং রাজেশ সরকারের বাড়িতে মন্ত্রী গোলাম রব্বানি এবং স্থানীয় বিধায়ককে পাঠিয়েছিলেন জেলার পর্যবেক্ষক শুভেন্দুবাবু। কিন্তু পাচুবাবুর কাণ্ড দেখে এ দিন মমতা- ঘনিষ্ঠ অনেক নেতারই মাথা হেঁট হয়ে গেছে। যা দেখে অনেকেই বলছেন, ‘এমন দুষ্টু গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল অনেক ভাল।’

যতই সমালোচনা হোক পাচু বাবু মনে করেন যা করেছেন ঠিক করেছেন। তাঁর কথায়, “বাড়ি বাড়ি গিয়ে চেক দিতে পারব না। আর সবাই আমার এলাকার লোকও নয়। কিন্তু এই ঢক্কানিনাদের কি দরকার ছিল? পাচুবাবু বলেন, “যা করেছি ঠিক করেছি। কাজ করলে সমালোচনা হবেই।”

দ্য ওয়াল পুজো ম্যাগাজিন পড়তে ক্লিক করুন

Shares

Comments are closed.