সবই বৃথা তোমায় ছাড়া

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দেবজ্যোতি দাস

(এসএফআই-এর সর্বভারতীয় প্রাক্তন যুগ্ম সম্পাদক ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির প্রাক্তন সম্পাদক)

“একটা ছেলে
মনের আঙিনাতে
ধীর পায়েতে
এক্কা-দোক্কা খেলে
বন পাহাড়ি ঝর্ণা খুঁজে,
বৃষ্টি জলে একলা ভিজে…”

দুপুরে হঠাৎ চিপকু(অনন্যা নিয়োগী)’র ফোন। “শ্যামলদা নেই”! বেশ কয়েকদিন ধরেই দড়ি টানাটানি চলছিল প্রায়! তার মধ্যেও প্রতিটা লড়াই’ই শ্যামলদা জিতে যাচ্ছিলেন অতীতের সব যুদ্ধের মতো। হঠাৎ করেই ৬ অগস্ট দুপুরে শ্যামলদা পরাজিত, এ জীবনে হয়তো প্রথমবার! ঘড়িতে তখন দুপুর ১টা ৪৫ মিনিট।

বেশ কিছুদিন আগের ঘটনা। শ্রমিক ভবনে গেছি শ্যামলদাকে ফোন করেই। কিছুক্ষণ জমিয়ে আড্ডার পর তখন ফেরার পালা, সুভাষদাও (মুখার্জী) রেডি বেরোনোর জন্য! হঠাৎ শ্যামল’দা বললেন- “একটু দেখা করে যাস। তোর সাথে কয়েকটা কথা ছিল…”। বললাম, এখনই বলেই দাও। নিজের ঘরে নিয়ে মাথায় হাত রেখে বললেন- “ওরা কয়েকজন আমায় ধারাবাহিকভাবে ভুল….”। আমি বললাম- “থাক। আর কাউকে এটা বলতে হবে না। তুমি বুঝেছো, এটাই আমার পাওনা! আছি…”।

শ্যামলদার জন্ম ১৯৪৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। আমার যতটুকু জানা, শ্যামলদা ছেলেবেলায় থেকেছেন নদীয়ার কুপার্স ক্যাম্পে। পরে দমদম নলতা রোডে চলে আসে তাঁদের পরিবার। ১৯৫১ সালে দমদম বৈদ্যনাথ ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হন। মেধাবী ছাত্র হিসেবে ডাবল প্রোমোশন পেয়ে চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। শ্যামল’দা স্কুল ফাইনাল পাশ করে দমদম মতিঝিল কলেজে ভর্তি হন। ওই সময় থেকেই সুভাষ’দা আর শ্যামলদার একসঙ্গে পথচলা শুরু। এখান থেকেই ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে বিদ্যাসাগর কলেজে ভর্তি, পরবর্তীতে সেই কলেজেরই ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। বিদ্যাসাগর কলেজ থেকেই তিনি স্নাতক হন ১৯৬৬ সালে।

প্রমোদ দাশগুপ্তর সঙ্গে ( চেয়ারে বসে) বিমান বসু, সুভাষ চক্রবর্তী, শ্যামল চক্রবর্তী ও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য

এমন একটা সময়ে শ্যামল’দাদের ছাত্র আন্দোলনে হাতেখড়ি হয়েছিল, যখন ভারতবর্ষের বামপন্থী আন্দোলনের ভারসাম্য কোন দিকে থাকবে তা ঠিক হচ্ছে। বাইরের আক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পাশাপাশি ভেতরেও একদিকে সংশোধনবাদী বা সংকীর্ণতাবাদী ঝোঁক, আর একদিকে সেই উভয় ঝোঁকের বিরুদ্ধে অবিরাম যুদ্ধ! কতটুকুই বা বয়স তখন শ্যামলদাদের, কিন্তু লড়াই করার অদম্য ইচ্ছা থেকেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সেদিন। ১৯৬২-র চিন ভারত সীমান্ত সংঘর্ষ, ভারতরক্ষা আইনে গ্রেপ্তারী, ১৯৬৬-র খাদ্য আন্দোলন…, আরও কত কী! সুভাষদা, শ্যামলদারা ছিলেন লক্ষ্যে অবিচল, আদর্শের প্রশ্নে অনমনীয়।

১৯৬৪-র পরবর্তী সময়ে এই বিভাজন রেখা ছাত্র আন্দোলনেও ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে গেল। সেই সময়ে ছাত্র ফেডারেশন তৈরির ইতিহাস, নেতাজীনগর ও দমদমের সভা- তার পরবর্তীতে এসএফআই-এর আত্মপ্রকাশ। এসএফআই-এর কর্মসূচি এবং তার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বোঝাপড়া নির্দিষ্ট করার ক্ষেত্রে শ্যামল’দার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। হাতে কলম উঠলে সেটা যে অস্ত্রের থেকেও শক্তিশালী হয়, শ্যামলদা বার বার তা প্রমাণ করেছেন।

১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে ত্রিবান্দ্রমে যে সম্মেলন থেকে এসএফআই তৈরি হয়, সেখান থেকেই শ্যামলদা কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হন। এরপর ১৯৭৩ সালে শিবপুর রাজ্য সম্মেলন থেকে এসএফআইয়ের রাজ্য সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। সম্পাদক হন সুভাষ চক্রবর্তী। ’৭৪-এ এসএফআইয়ের সর্বভারতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় কলকাতায়। সেই সম্মেলন থেকে সর্বভারতীয় সহ সভাপতি নির্বাচিত হন শ্যামল চক্রবর্তী। এরপর ১৯৭৯-র জানুয়ারিতে (মতান্তরে ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর) ব্যারাকপুরে অনুষ্ঠিত রাজ্য সম্মেলন থেকে অব্যাহতি নেন। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে পাটনায় অনুষ্ঠিত এসএফআই-এর তৃতীয় সর্বভারতীয় সম্মেলন থেকে ছাত্র আন্দোলন থেকে অব্যাহতি নেন। ওই সম্মেলন থেকেএসএফআই-এর সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন নেপালদেব ভট্টাচার্য, সভাপতি হয়েছিলেন এম এ বেবী।

ছাত্র আন্দোলনে সুভাষ-শ্যামল জুটি যেমন একদিকে সংগঠনকে দৃঢ় করেছিল, তেমনই মতাদর্শগত দিক থেকে শানিত করার ক্ষেত্রেও এদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। তারপর শ্রমিক আন্দোলনের অগ্রণী কর্মী, রাজ্যের মন্ত্রী, রাজ্যসভার সাংসদ, দীর্ঘদিন সিপিআই(এম) এর রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলী ও আমৃত্যু কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য—শুধু এগুলো দিয়েই শ্যামল’দাকে বিচার করা ঠিক হবে না।

স্ত্রী ও মেয়ের সঙ্গে শ্যামল চক্রবর্তী

শ্যামলদার একটা অদ্ভুত স্টাইল ছিল সব কিছুতেই। শ্যামলদা কথায় কথায় ‘রবীন্দ্রনাথ’ বলতেন। যে কোনও ভাষণের সঙ্গে কবিতা জুড়ে দিতে পারতেন। শ্যামলদার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত স্মৃতি অনেক। ছাত্র আন্দোলনের কাজে দিল্লি গেলে শ্যামলদার (তখন সাংসদ) ১৬৮ নর্থ অ্যাভিনিউয়ের কোয়ার্টারেই ছিল আস্তানা। সেখানে প্রতিদিন একটা এইরকম মানুষকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের বাইরে তিনি একটা অন্য মানুষ। যে ভাবে আমার বাবা-মা ভাবেন, সে ভাবেই শ্যামলদা ভাবতেন। এমনও দিন গিয়েছে, আমি হয়তো অনেক রাতে ফিরেছি। অসুস্থ শরীরে নিজে রান্না করে বসে থাকতেন। “তুই ফিরলে একসঙ্গে খাব”- ভোলবার নয় কোনোদিনও! শ্যামলদার সঙ্গে বহুবার ট্রেনে একসঙ্গে জার্নি করেছি। অসুস্থ ছিলেন বলে রাতে ঘুমানোর সময় একটা সিস্টেমে থাকতে হত। ট্রেনে আমি জেগে থাকলে বলতেন- “ওরে তুই ঘুমা…”। আমি জেগে থাকলে পরের দিন একশ লোককে বলে ফেলতেন- “ও আমার জন্য কাল রাত জেগেছে”!

শ্যামলদা অসম্ভব খাদ্যরসিক ছিলেন- যেমন খেতে ভালবাসতেন, তেমন খাওয়াতেও! একটা সময়ে উৎপল দত্তের খুব কাছাকাছি থাকার সুযোগ হয়েছিল শ্যামলদার। সাংস্কৃতিক বোধও ছিল এভারেস্ট সমান। একজন ‘মাল্টিডায়মেনশনাল’ মানুষ বলতে যা বোঝায়, শ্যামল চক্রবর্তী ছিলেন তাই’ই।

এই তো কয়েক বছর আগের ঘটনা। মধ্যমগ্রামের ট্যাক্সি চালকের মেয়ে স্বপ্না ঝাঁকে ধর্ষণ করে খুনের ঘটনা ঘটল। মেয়েটির লাশ কার্যত ছিনতাই করতে এল পুলিশ। সেদিন সকালে নিমতলা শ্মশানে শ্যামলদা পৌঁছে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। শববাহী গাড়িতে উঠে বসে পড়েন মানসিকতায় অনেক তরুণকেও হার মানানো শ্যামল চক্রবর্তী। পুলিশের সাহস হয়নি আর এক কদম এগোনোর। ভাঙা, অশক্ত শ্যামল চক্রবর্তী সেদিন আমাদের মধ্যে লড়াইয়ের বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।

স্বাভাবিক কারণেই বামপন্থী রাজনীতিতে চিন্তাশীল মানুষের সংখ্যা বেশি থাকে। তাঁদের মধ্যেও যদি ‘মাস্টারক্লাস’ ধরা হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে শ্যামল চক্রবর্তী সেই শ্রেণিতে পড়েন। শ্যামলদার চলে যাওয়া আমার কাছে অভিভাবকহীন হওয়া। যে কোনও রাজনৈতিক সংকট, সাংগঠনিক সংকট, ছাত্র আন্দোলনের যে কোনও সমস্যায় শ্যামলদা বটবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে পড়তেন আমাদের পাশে।

এক ফ্রেমে বুদ্ধ, বিমান, সুভাষ, অনিল ও শ্যামল

শ্যামলদার চলে যাওয়া দুঃখের, যন্ত্রণার। শ্যামল’দারা হয়তো এ ভাবেই আলো দিতে দিতে হঠাৎ হারিয়ে যান। অসময়ে চলে যাওয়া আমাদের মনন, চিন্তার জগতে অপূরণীয় ক্ষতি তো হলই, সর্বোপরি ভয়ঙ্কর ক্ষতি হল বাংলার বাম আন্দোলনের। অমন করে অভিভাবকের মত করে কাছে টেনে নেওয়া, পাশে বসিয়ে কথা শোনা, রসবোধযুক্ত সহজ ভাষায় রাজনীতি ও অবস্থান বোঝানো, একের পর এক দুরন্ত লেখা উপহার দেওয়ার সেই ‘মানুষ’ আর কই!

লেখাটা শুরু করেছিলাম সাহানা বাজপেয়ীর গাওয়া একটা গানের লাইন দিয়ে। আমার কোথাও একটা যেন মনে হচ্ছিল আজ, সুভাষ’দা আর শ্যামল’দা- দুই বন্ধু তিনের ঘরের নামতা নিয়ে এক্কা-দোক্কা খেলতে খেলতেই চলে গেল। ৩ অগস্ট সুভাষ’দার মৃত্যুদিন ছিল, ‘বৃষ্টিজলে একলা ভিজে’ ৬ অগস্ট চলে গেলেন শ্যামলদা। সেই ‘ফ্যাবুলাস ফাইভ’-এর (বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, বিমান বসু, অনিল বিশ্বাস, সুভাষ চক্রবর্তী, শ্যামল চক্রবর্তী) মধ্যে তিন আর নেই। ২০০৬ এ অনিল’দা, ২০০৯-এ সুভাষ’দা, ২০২০-তে শ্যামলদা…!

অনেক কথা, কিছুই হয়তো বলা হল না শ্যামল’দা! সুদীপ্ত(গুপ্ত)’কে নিয়ে যাওয়া তোমার কাছে, ধারাবাহিকভাবে রাজ্যের নতুন ছাত্রনেতাদের তোমার সাথে কথা বলানো, বইয়ের দ্বিতীয় ভাগ, সুদীপ্ত’র চলে যাওয়া, মৃণাল দা’র মৃত্যু…, আরো কত কি! হাওড়া শরৎ সদনে সিটু রাজ্য সম্মেলনে বক্তৃতা করার পর একটা উপহার পেয়েছিলাম- তা রাখা আছে সযত্নে! রাখা আছে আরো…, আরো অনেক কিছু! রোজ বিকেলে রিপন স্ট্রীটে চায়ের আড্ডায় আমি, সুদীপ্ত আর সংবিদা(মুমু), আর কখনো কখনো ভোলা’দা- ফেরার পথে একবার দেখা করে যাওয়া তোমার সাথে। সেখানেও আড্ডা! তুমি, বিপুলদা, আমি, সুদীপ্ত…, পরবর্তীতে অর্কও। শেষদিন ফোনে অনেক কথার পর বলেছিলেন- “এমন মনটা যেন থাকে। এটাকে বাঁচিয়ে রাখিস…”। আরো অনেক কথা…, বাকিগুলি নয় আজ থাক!

আজ আর কলম চলছে না যেন, লেখার শক্তি যেন হারিয়ে ফেলছি! তোমার জন্য এমন লেখা এক্কেবারেই বেমানান, তবু শেষে রবি ঠাকুর’ই থাক আজও-

“কিছু মনে কোরো না,
সময় কোথা সময় নষ্ট করবার।
আমাকে নামতে হবে পরের স্টেশনেই;
দূরে যাবে তুমি,
দেখা হবে না আর কোনোদিনই।
তাই যে প্রশ্নটার জবাব
এতকাল থেমে আছে,
শুনব তোমার মুখে।
সত্য করে বলবে তো?”

সময় নষ্ট না করে শেষ সাক্ষাতে সত্যিটা বলেই দিয়েছিলে, তারপর চলে গেলে তুমি। ভালো থেকো শ্যামল’দা। যা কথা দিয়েছিলাম তোমায়, শুধু আমি নয়- আমরা সকলে মিলেই তা রাখবো…! ভরসা রেখো। সাবধানে থেকো…

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More