রবিবার, অক্টোবর ২০

সিপিএমের সংখ্যালঘু ভোট তো বাঁচিয়ে দিয়েছে তৃণমূলকেও

শঙ্খদীপ দাস

শুধু লোকসভা ভোটের সময়েই নয়, এক বছর আগে থেকেই হয়তো আশঙ্কা ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনে। দিদি তখনই স্লোগান তুলেছিলেন, ‘দিল্লি থেকে এলো রাম/ সঙ্গে জুড়ে গেল বাম!’ ভোটের ফল প্রকাশের পর তো কথাই নেই। নির্বাচনী বিপর্যয় নিয়ে তৃণমূলের এক যুক্তি- সিপিএমের ভোট বিজেপি-তে চলে গেছে।

অথচ পরিসংখ্যান ও পরিস্থিতি জানাচ্ছে, বাম ভোটে শুধু বিজেপি-র উপকার হয়নি, তা হয়েছে তৃণমূলেরও। নইলে তৃণমূল ২২ টি আসনও পেত না। তা হয়তো নেমে আসত আরও নীচে। বিপরীতে বিজেপি-র আসন সংখ্যা পৌঁছে যেত ২২ বা তারও উপরে।

শনিবাসরীয় সন্ধ্যায় কালীঘাটের বাসভবনে সাংবাদিক বৈঠক করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই বলেছেন, এ বার ভোটে ‘টোটালটাই’ হিন্দু মুসলমান হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ ধর্মীয়ে মেরুকরণ হয়েছে। হিন্দু ভোটের সিংহ ভাগ গেছে বিজেপি-র দিকে। সংখ্যালঘু ভোটের ষোলো আনা গিয়েছে তৃণমূলের দিকে।

মুখ্যমন্ত্রীর কথার সূত্র ধরেই বলা যায়, বামেদের হিন্দু ভোট যদি বিজেপি-তে গিয়ে থাকে, তা হলে তাদের সংখ্যালঘু ভোট গিয়েছে তৃণমূলে। শুধু বাম নয়, উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন আসনে কুড়িয়ে বাড়িয়ে কংগ্রেসের যে টুকু সংখ্যালঘু ভোট রয়েছে, তাও গিয়েছে তৃণমূলের দিকেই।

আরামবাগ লোকসভা আসনের কথাই ধরা যাক। তৃণমূল প্রার্থী অপরূপা পোদ্দার ওরফে আফরিন আলি সেখানে মাত্র ১১৪২ ভোটে জিতেছেন। ওই আসনে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বিজেপি। তৃতীয় স্থানে থাকা সিপিএম বলতে গেলে দূরের গ্রহ। প্রশ্ন হল, সেখানে বামেদের হিন্দু ভোট যদি বিজেপি-তে গিয়ে থাকে, তা হলে সিপিএমের অন্তত দু’হাজার সংখ্যালঘু ভোটও কি তৃণমূলে যায়নি?

গত লোকসভা ভোটে মুর্শিদাবাদ, জঙ্গিপুরে তৃতীয় স্থানে ছিল তৃণমূল কংগ্রেস। সেখানে এ বার তারা জিতেছে। সেখানে কংগ্রেস ও বামেদের সংখ্যালঘু ভোট তৃণমূলের অনুকূলে না গেলে কি জিততে পারত তৃণমূল? কৃষ্ণনগর, বসিরহাটে সিপিএম, কংগ্রেসের সংখ্যালঘু ভোটই বা কোথায় গেল?

আবার বীরভূম লোকসভা কেন্দ্র আরও মজার। তৃণমূল প্রার্থী শতাব্দী রায় গত ভোটে সেখানে ৬৭ হাজার ভোটে জিতেছিলেন। এ বার জিতেছেন ৮৮ হাজার ভোটে।

এখন বীরভূমের গত ভোটের হিসাব দেখে নেওয়া যাক। তৃণমূল প্রার্থী শতাব্দী রায় সেখানে জিতেছেন ৮৮ হাজার ভোটে। এই আসনে সংখ্যালঘু ভোটের সংখ্যা বিপুল হওয়ার কারণেই সিপিএম গতবারও এখানে সংখ্যালঘু প্রার্থী দিয়েছিল। এ বারও তাই করে। অথচ দেখা যায় এ বার বামেদের ভোট সেখানে গত বারের প্রায় চার লক্ষ থেকে কমে ৯৬ হাজারে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন উঠছে তাদের সংখ্যালঘু ভোট গেল কোথায়?

ভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে বামেরা বাংলায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেলেও, তারা যে এ যাত্রায় তৃণমূলকে বাঁচিয়ে দিয়েছে তা অন্য ভাবেও দেখা যায়। শ্রীরামপুর, বারাসত, দমদম, দক্ষিণ কলকাতা, পূর্ব বর্ধমানের মতো আসনের প্রতিটিতে বামেরা ১ লক্ষেরও বেশি ভোট না কাটলে তৃণমূলের বিপর্যয় আরও বড় হতে পারত।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বক্তব্য, এ ব্যাপারে আরও একটি বিষয় প্রাসঙ্গিক। শনিবার মুখ্যমন্ত্রী সাংবাদিক বৈঠকে দাবি করেছিলেন তৃণমূলের ভোট বেড়েছে। কিন্তু হিসাব বলছে, গত লোকসভা ভোটের তুলনায় এই লোকসভা ভোটে তৃণমূলের চার শতাংশ ভোট বেড়েছে ঠিক, তবে ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটের তুলনায় তৃণমূলের ভোট ২ শতাংশ কমেছে। প্রকৃত পক্ষে তৃণমূলের নিজস্ব ভোট কমে গেছে হয়তো আরও বেশি। কমপক্ষে চার থেকে পাঁচ শতা্ংশ। কিন্তু সিপিএমের সংখ্যালঘু ভোট তাদের দিকে যাওয়ার কারণেই নিট ক্ষতি মাত্র ২ শতাংশে এসে ঠেকেছে।

Comments are closed.