শুক্রবার, এপ্রিল ২৬

ডুয়ার্সকে পর্যটন মানচিত্রে তুলে ধরার মূল কান্ডারি যোগেশ বর্মন আর নেই

নিলয় দাস

মৃত্যুর পর মানুষের মূল্যায়ন হয়! যোগেশ বর্মনের ক্ষেত্রে তাই আবার নতুন করে মূল্যায়ন হচ্ছে মানুষজনের মধ্যে।

কেন না, নয়ের দশকের আগে পর্যন্ত ডুয়ার্সের যে চিত্র মানুষের মনে গেঁথে রয়েছে, সেই অবস্থা থেকে আজ তার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। তার পেছনে যে লোকটির নাম সবার প্রথমে উঠে আসে তিনি আর কেউ নন রাজ্যের প্রাক্তন বনমন্ত্রী যোগেশ বর্মন।

একটি সময় উত্তরবঙ্গের অর্থনীতি তিন “T” অর্থাৎ টি-টিম্বার–টোব্যাকোর উপর ভর করে চলত। তামাক আর কাঠ শিল্প নয়ের দশকে মুখ থুবড়ে পড়ে। কারণ সে সময় জাতীয় উদ্যান হিসাবে ঘোষণা হয় গরুমারা বনাঞ্চল। কাঠ ব্যবসা মুখ থুবড়ে পড়ে নানান সরকারি বিধি-নিষেধের ফলে।

আর তাতে রাতের অন্ধকারে ডুয়ার্স অবৈধ কাঠের চোরাকারবারিদের কাছে স্বর্গ রাজ্য হয়ে ওঠে। একের পর এক বনাঞ্চল ধ্বংসের মুখে পড়ার উপক্রম হয়। আর সে সময় পর্যটন শিল্পকে হাতিয়ার করে কাঠ চোরদের দৌরাত্ম্য বন্ধের পাশাপাশি পর্যটন শিল্পের জোয়ার আনেন যিনি, তিনি আর কেউ নন যোগেশ বর্মন।

২০০৫ সালে খয়েরবাড়ি চিতাবাঘ রেসকিউ সেন্টারে বুদ্ধবাবুর পাশে যোগেশ বর্মন

বাম আমলের চার বারের বিধায়ক। তিন দফার মন্ত্রী। ১৯৯৬ সাল থেকে টানা ১০ বছর বন দফতরের মন্ত্রী ছিলেন তিনি।

মন্ত্রী হওয়ার পর আজকের লাটাগুড়িকে পর্যটন মানচিত্রে তুলে ধরার দায়িত্ব নেন যোগেশবাবু। সে সময় বন দফতরের দায়িত্বে থাকা এক অফিসার জানিয়েছেন, নানান সরকারি বিধিনিষেধে বন্ধ হয়ে যায় চেরাই কলগুলি। গোটা এলাকার অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। অবৈধ কাঠ চোরাকারবারিরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

বিকল্প শিপ্প হিসাবে তিনি প্রথম পর্যটন শিল্পকে হাতিয়ার করেন। লাটাগুড়িতে প্রথম তিনি ইকো ট্যুরিজমকে কাজে লাগান। Saw-মিলগুলির কাঠের ঘরগুলিতে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি বনকে পর্যটকদের জন্য খুলে দেন। কোর এলাকা বাদে বনের বাকি এলাকাগুলি পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। বনকর্তারা প্রথম দিকে আপত্তি জানালেও তা মানেননি যোগেশ বর্মন।

প্রয়াত প্রাক্তন মন্ত্রী যে ভাবে ডুয়ার্সে পর্যটকদের টেনে আনার ব্যবস্থা করেছিলেন তার বিরোধিতা করেন দলের কিছু নেতাও। তাঁদের ধারণা ছিল, পর্যটকদের আনাগোনা শুরু হলে অনেক অসামাজিক লোকজনের আনাগোনা বাড়বে। তাতে পরিবেশ নষ্ট হবে। তবে সেই বাধা টপকে প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে লাটাগুড়িকে পর্যটন মানচিত্রে তুলে আনেন যোগেশবাবু।

উত্তরবঙ্গের ভ্রমণ সাহিত্যিকদের অন্যতম গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্যের কথায়, যোগেশবাবু বনমন্ত্রী হবার আগে পর্যন্ত এই গোটা অঞ্চল অবহেলিত ছিল। তিনি মন্ত্রী হবার পর এক একটি জায়গার উন্নতি হয়।

খয়েরবাড়ি পর্যটন কেন্দ্রে সার্কাস অ্যানিম্যাল রেসকিউ সেন্টারের উদ্বোধনে যোগেশ বর্মন

শুধু গৌরীশঙ্করবাবু নন, ডুয়ার্সের বেশ কিছু প্রবীণ ভ্রমণ পিপাসু জানিয়েছেন, নয়ের দশকের শেষ পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের এই অঞ্চলের মানুষ ঠিক মতো বন-জঙ্গলে ঘেরা মনোরম পরিবেশ চিনতেন না। লাটাগুড়ি, চালসা, মালবাজার, মাদারিহাট বলতে কয়েকটি কাঠের দোকান, টিমটিমে হ্যারিকেনের আলো আর সন্ধ্যে নামতে সুনসান গোটা চত্বর, এই ছিল চিত্র। হলং বা গরুমারার বন দফতরের বাংলোতে কালে-ভদ্রে কেউ বেড়াতে আসতেন। বাইরের পর্যটকরা শুধু দার্জিলিং বেড়িয়ে বাড়ি ফিরতেন। আজ গরুমারা থেকে বক্সায় পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়ের পেছনে ওই একটি মানুষের অবদান রয়েছে। মূর্তি নদীকে কেন্দ্র করে পর্যটন শিপ্ল গড়ে তোলার মূল কাণ্ডারি প্রাক্তন এই মন্ত্রী। মূর্তি ঘিরে আজ প্রচুর লজ, হোটেল গড়ে উঠেছে।

বহু চোরাকারবারি মূল স্রোতে ফিরে পর্যটন শিল্পে যুক্ত হয়েছেন ওই একটি মানুষের অবদানের কারণে। গরুমারা-জলদাপাড়া-চিলাপাতা বা বক্সার জিপ সাফারিতে বনভ্রমণের চাহিদা আজ তুঙ্গে। বহু বেকার গাইড বা গাড়ি চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। কুঞ্জনগর পর্যটন কেন্দ্র, খয়েরবাড়ি ব্যাঘ্র প্রকল্প, রসিকবিল, মায় দক্ষিণবঙ্গের মুকুটমনিপুর পর্যটকদের কাছে তুলে ধরার পেছনে ওই একজন।

মৃত্যুর কয়েক মাস আগে যোগেশবাবু বলেছিলেন, আজ লাটাগুড়ি-সহ বনাঞ্চল ঘেরা ডুয়ার্সের গঞ্জগুলি দেখে মন ভরে ওঠে। এই পর্যটন শিল্পকে যত্ন করা হলে গোটা ডুয়ার্সকে আর পেছন ফেরে তাকাতে হবে না। তবে তাঁর হাতে তৈরি কুঞ্জনগর বা খয়েরবাড়ি যে অবহেলার শিকার হয়ে পড়েছে তা নিয়ে ক্ষোভ চেপে রাখেননি তিনি।

আরও পড়ুন

‘খুনিরা শাস্তি পাবে’, কৃষ্ণগঞ্জের নিহত বিধায়কের স্ত্রীকে ফোন মমতার

Shares

Comments are closed.