তৃণমূলের জেলা সহ-সভাধিপতিকে ছাত্রের প্রশ্ন, ‘রাজনীতি করলে কি প্রচুর টাকা রোজগার করা যায়?’

শিক্ষাগত যোগ্যতা থেকে বেতন, বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা – পড়ুয়াদের প্রশ্নে জেরবার প্রশাসক

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্নের মুখে বিভিন্ন সময় বিব্রত হয়েছেন তাবড় রাজনৈতিক নেতানেত্রীরা, এই তালিকায় রয়েছেন প্রাক্তন এক মার্কিন প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত। এবার তাদের প্রশ্নের মুখে রীতিমতো বিব্রত হলেন পূর্ব বর্ধমান জেলার প্রাক্তন সভাধিপতি দেবু টুডু। তিনি এখন জেলা পরিষদের সহ-সভাধিপতি।

আপনিই যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার কি কোনও প্রমাণ আছে? ছাত্রছাত্রীদের এমন প্রশ্নের মুখে শুধু বিব্রতই হননি, তখন নিজেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলে নাকি প্রমাণই করতে পারেননি জর্জ বুশ (জুনিয়র)। এবার তেমনই ‘কঠিন’ সব প্রশ্নের মুখে পড়লেন দেবু টুডু। এক পড়ুয়া তাঁকে প্রশ্ন করে বসলেন, “আপনি কত টাকা মাইনে পান?” তিনি সমাজসেবী, তাই মাইনেটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয় – সহ-সভাধিপতির কাছ থেকে এমন উত্তর পেয়ে আর একজনের প্রশ্ন, “তাহলে গাড়ি চাপেন কী করে?” দেবু টুডু জানান, প্রশাসনিক পদে থাকলে গাড়ি-বাংলো-নিরাপত্তা দেওয়া হয়। তারপরে আরও কঠিন প্রশ্ন, “কী পড়াশোনা করলে এমন প্রশাসক হওয়া যায়, আপনি কতদূর পড়াশোনা করেছেন?”

রাজনীতি করতে হবে, ভোটে জিততে হবে, যে দলের হয়ে জয়ী হয়েছেন সেই দলকে ক্ষমতায় আসতে হবে এবং গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হবে, তবেই প্রশাসনিক পদ পাওয়া যায় বলে ছাত্রছাত্রীদের জানান দেবু টুডু। পড়াশোনা করাও যে দরকার সেকথাও বোঝান। তবে তার পরের প্রশ্নে তিনি দৃশ্যতই বিব্রত হয়ে পড়েন। তাঁকে এক পড়ুয়া প্রশ্ন করে, “প্রশাসক হলে কি অনেক টাকা রোজগার করা যায়?”

মক পার্লামেন্ট হয় বিভিন্ন স্কুল-কলেজে। পূর্ব বর্ধমানে অন্য ধরনের উদ্যোগ দেখা যায়। প্রশাসনের কর্মপদ্ধতির সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের পরিচয় ঘটাতে ‘এক্সপোজার ভিজিট’ কর্মসূচিতে প্রশাসককে সরাসরি প্রশ্ন করার সুযোগ পেয়েছিল কালনা ২ নম্বর ব্লকের ইছাপুর শ্রীগদাধর হাইস্কুলের ১২৫ জন পড়ুয়া। কী ভাবে প্রশাসন কাজ করে তা দেখান দেবু টুডু নিজে। তারপরে তাদের সুযোগ দেওয়া হয় প্রশ্ন করার। খোলামেলা পরিবেশ পেয়ে প্রথমে সরকারি নানা প্রকল্প নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকে ছাত্রছাত্রীরা। প্রকল্পের সুযোগ-সুবিধা জানার পরে তারা জানতে যায় কী ভাবে উন্নয়নমূলক প্রকল্প রূপায়ণ করা হয় সে ব্যাপারে। কয়েক জন তো এলাকার সমস্যার কথা তুলে ধরে প্রশ্ন করে বসে, কেন তাদের এলাকায় এই সমস্যা, তা মিটবে কী ভাবে?

এধরনের প্রশ্নের মুখে প্রায়ই জনপ্রতিনিধিদের পড়তে হয়, বিশেষ করে ভোটের মুখে। তাই অনায়াসেই সেই সব প্রশ্ন সামলে দেন দীর্ঘদিন প্রশাসক হিসাবে কাজ করে আসা দেবু টুডু। এইসব প্রশ্নের পরে এক এক করে বাউন্সার ধেয়ে আসে পড়ুয়াদের দিক থেকে। তাদের প্রশ্ন থেকে একটা ব্যাপার স্পষ্ট হয়ে গেছে, ছাত্রছাত্রীরা ক্রমেই সচেতন হয়ে উঠছে। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে নানা ব্যাপারে তারা ওয়াকিবহাল।

পড়ুয়াদের একটি দল বিজ্ঞানকেন্দ্রে গিয়েছিল। বাকিরা যায় জেলা পরিষদে। জেলা পরিষদের অঙ্গীকার হলে ঘরোয়া আলোচনায় মুখোমুখি হয়েছিল দেবু টুডু। সেখানেই জমে ওঠে প্রশ্নোত্তরপর্ব। নিজেও যে গ্রাম থেকেই উঠে এসেছেন সে কথা তিনি জানাতে ভোলেননি। প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হতে প্রথমে গ্রামোন্নয়ন ও রাস্তাঘাট নিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করেছিল ছাত্রছাত্রীরা।

দিনের শেষে ছাত্রছাত্রীরা খুশি কারণ প্রশাসনের অনেক খুঁটিনাটি তারা জানতে পেরেছে, সমস্যার কথা জানাতে পেরেছে, মনের মধ্যে যে সব প্রশ্ন ছিল তারও উত্তর তারা পেয়েছে জেলা প্রশাসসনের অন্যতম শীর্ষ জনপ্রতিনিধির থেকে।

“মহাভারতের রথিগণ মাত্র অষ্টাদশ দিবস যুদ্ধ করিয়া নাম কিনিয়া গিয়াছেন কিন্তু রক্ত-মাংসের দেহে জীবন্ত থাকিলে তাঁহারা বুঝিতে পারিতেন, যশোলাভের পথ ক্রমশই কিরূপ দুৰ্গম হইয়া পড়িতেছে। বালকের আকাঙ্ক্ষা নিবৃত্তি করিতে তাঁহারা মাসের পর মাস সমান ভাবে অস্ত্ৰচালনা করিতে পারিতেন কি ?” ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্ন শুনে পথের পাঁচালির এই উদ্ধৃতি দেবু টুডুর মনে পড়ে গিয়ে থাকতে পারে।

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.