সোমবার, অক্টোবর ১৪

রেকর্ড ভাঙল সিপিএম, ভোট কমলেও পুজোর স্টলে বই কেনার ধুম

দ্য ওয়াল ব্যুরো: বই পড়ার অভ্যেস, মতাদর্শ চর্চার রুটিন—এ সব প্রায় চুকিয়েই দিয়েছিল বঙ্গ সিপিএমের একটা বড় অংশ। সরকারে থাকার সময় এ সবে বিশেষ আমল দিতেন না নেতারাও। তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, স্কুল পরিচালন কমিটির নির্বাচন কিংবা সমবায় ব্যাঙ্কের বোর্ড গঠন। কিন্তু ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার পর সে সবেই মনোনিবেশ করতে চেয়েছিলেন সূর্যকান্ত মিশ্র, বিমান বসুরা। স্বাধীনতার পর এই প্রথম বাংলা থেকে বামেদের কোনও সদস্য নেই সংসদে। ভোট এসে ঠেকেছে ৭ শতাংশে। ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু এই অবস্থাতেও এ বার পুজোয় বই বিক্রিতে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিল সিপিএম। সিপিএম নেতাদের দাবি, সারা রাজ্যে প্রায় দেড় কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে শারোদৎসবে।

পুজোর সময় মার্ক্সীয় সাহিত্যের স্টল খোলা এ রাজ্যে বামেদের অনেক পুরনো রেওয়াজ। শুধু সিপিএম নয়। আরএসপি, সিপিআই, ফরওয়ার্ড ব্লক এমনকী এসইউসি’র মতো দলও যেখানে যেমন শক্তি সেখানে তেমন বইয়ের স্টল খোলে। দুর্গাপুজো তো বটেই, রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় কালী পুজোতেও বুক স্টল খোলে সিপিএম এবং তার গণসংগঠনগুলি। হুগলির চন্দননগর, নদিয়ার কৃষ্ণনগরের মতো এলাকাতে জগদ্ধাত্রী পুজোতেও স্টল খোলে বামেরা। রাজ্য সিপিএমের এক নেতার কথায়, জেলাগুলি থেকে সমস্ত হিসেব আসতে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ হয়ে যায়। তবু এখনও পর্যন্ত যা হিসেব, তাতেই রেকর্ড হয়ে গিয়েছে।

সিপিএমের কলকাতা জেলা সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য সুদীপ সেনগুপ্ত জানিয়েছেন, “যাদবপুর এইট বি-র বুক স্টলেই তিন লক্ষ টাকার বই বিক্রি হয়েছে। নারকেল বাগানের বুক স্টলে বই বিক্রি হয়েছে এক লক্ষ ৩৮হাজার টাকার বই। এক লক্ষ ৭৫ হাজার টাকার বই বিক্রি হয়েছে রানিকুঠির স্টল থেকে।” আর প্রায় সব স্টলেই বিক্রির তালিকায় শীর্ষে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নতুন বই, ‘স্বর্গের নীচে মহাবিশৃঙ্খলা।’

দলের পলিটব্যুরোর সদস্য মহম্মদ সেলিম বলেন, “এমনিতে এই স্টলগুলিতে অপেক্ষাকৃত বয়স্ক কর্মীরাই দায়িত্বে থাকেন। কারণ উৎসবের সময়ে তরুণ প্রজন্মের কর্মীরা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু এ বার সারা রাজ্যেই দেখা গিয়েছে বুকস্টলগুলিতে ছাত্র-যুবদের ভিড়।” সেলিম সাহেবের ব্যখ্যা, “দেশে এবং রাজ্যে যা চলছে, তাতে মানুষের মধ্যে উৎসাহ বাড়ছে বিষয়গুলির গভীরে গিয়ে জানার। সে কারণেই এই জায়গায় পৌঁছেছে বই বিক্রি।”

বাংলার দলীয়কর্মীদের মতাদর্শের মান যে ক্রমেই তলানিতে ঠেকেছে তা টের পেয়েছিল সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটিও। তাই দিল্লির নির্দেশেই বছরখানেক দু’য়েক ধরে সিপিএমের রাজ্য কমিটি দলের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পাঠচক্র (স্টাডি সার্কেল) সংগঠিত করছে। জেলায় জেলায় স্থায়ী পার্টি স্কুল গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও জোর দিয়েছে রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলী। কয়েকটি জেলায় তা তৈরিও হয়েছে। রাজ্য কমিটির যে স্থায়ী পার্টি স্কুল রয়েছে ভিআইপি রোডের ধারে বাগুইআটি জোড়া মন্দিরের কাছে, সেখানেও ধারাবাহিক জেলার নেতাদের ক্লাস করানো শুরু করেছে সিপিএম। সিপিএম নেতৃত্বের একটি অংশের বক্তব্য, সমগ্র প্রক্রিয়াতে কর্মীদের আগ্রহ বাড়ছে। বই বিক্রির উর্দ্ধমুখী গ্রাফ তারই বহিঃপ্রকাশ। কলকাতার এক যুব নেতার কথায়, “তৃণমূলের সঙ্গে লড়াই কোনও মতাদর্শের লড়াই নয়। এর থেকে অনেক কঠিন লড়াই বিজেপি, আরএসএস-এর বিরুদ্ধে। ওটাই আসল ব্যাটল অফ আইডিওলজি। এটা কর্মীরা বুঝতে পারছেন। তাই আরও বেশি করে নিজেদের মতাদর্শ চর্চা করতে চাইছে।”

সিপিএমের দাবি এ বার শুধু বই বিক্রি নয়। বেড়েছে স্টলের সংখ্যাও। ২০০৮-০৯ সালের সময় থেকে যে গোঘাট, খানাকুল, পুরশুড়াতে সিপিএমের স্টলের নাম নিশান দেখা যেত না, সেখানেও এ বার সাজিয়ে গুছিয়ে বুক স্টল খুলে বসেছিল তারা। কিন্তু এটা হল কী ভাবে? মহম্মদ সেলিম-সহ একাধিক সিপিএম নেতাই মেনে নিলেন, অন্যবার যেমন তৃণমূল ধমক দিয়ে বুক স্টল বন্ধ করে দিত, এ বার সে সব প্রায় একেবারেই হয়নি। ফলে কর্মীরাও ঘর থেকে বেরিয়ে স্টলে গিয়েছেন।

ভোটের গ্রাফ নিম্নমুখী হলেও, বই বিক্রিতে অন্য রেকর্ড গড়ল সিপিএম। যা সরকারে থাকতেও হয়নি।

Comments are closed.