রবিবার, অক্টোবর ২০

উনিশে আঠারো! সবটাই বিজেপি-র ভোট নয় কিন্তু

দ্য ওয়াল ব্যুরো: পুলওয়ামা পরবর্তী সময়ে একেই দেশজুড়ে টানটান মেরুকরণের বাতাবরণ। উপরি গত তিন বছর ধরে বাংলায় প্রায় খেলাই ছেড়ে দিয়েছে বাম-কংগ্রেস। তৃণমূল বিরোধিতার বিস্তৃত মাঠে দৃশ্যত একা বিজেপি। ফলে দেওয়াল লিখন ছিল স্পষ্ট। চোরা স্রোতের আশঙ্কা ছিল তৃণমূলেও। হলও তাই। বাংলায় ইতিহাস গড়ল বিজেপি।

আডবাণী-বাজপেয়ীর প্রজন্ম থেকে শুরু মোদী-অমিত শাহ পর্যন্ত, বিজেপি-তে বহুদিনের আক্ষেপ ছিল, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মাটিতে বিজেপি উত্থানের লক্ষণ নেই কেন! অবশেষে সেই সাধ পূর্ণ হল। বাংলায় ৪২টি আসনের মধ্যে ১৮টিই জিতে নিল বিজেপি। শুধু তা নয়, ২২টি আসনে দ্বিতীয় স্থানে রইল তারা। মাত্র তিন বছর আগে বিধানসভা ভোটে ১০ শতাংশ ভোট পেয়েছিল বিজেপি। তা থেকে এক ধাক্কায় বাংলায় তিরিশ শতাংশ ভোট বাড়িয়ে ফেললেন মোদী-শাহরা।

এ যেন অনেকটাই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পরবর্তী সময়ে বাংলায় বাম বিরোধিতার পরিবেশ যখন মজবুত, তখন কংগ্রেসের হাত ধরে ২০০৯ সালের ভোটে ১৯টি আসনে জিতেছিল তৃণমূল। দিদি-র দল তখন পেয়েছিল, ৩১ শতাংশ ভোট। কতকটা সে ভাবেই এ বার বাংলায় ১৮ আসনের দখল নিল বিজেপি। পরিসংখ্যানের দিক থেকে দেখলে তাদের সাফল্য বরং তৃণমূলের থেকেও বেশি। কোনও শরিক দলের সমর্থন ছাড়া একাই সেই সাফল্য পেল দিলীপ-মুকুলের দল।

অথচ তাৎপর্যপূর্ণ হল, বাংলায় বিজেপি-র সংগঠনের তাকতটুকুও ঠিক ঠাক নেই। মুখে দিলীপ ঘোষ যাই বলুন, লোকসভা ভোটে অন্তত ৫০ শতাংশ বুথে পোলিং এজেন্টও দিতে পারেননি তাঁরা। কারা তাঁদের ভোট দিয়েছেন, বলতে গেলে তাও ঠিকমতো চেনে না বিজেপি। কিন্তু তার পরেও রোখা যায়নি গেরুয়া ঝড়।

স্বাভাবিক ভাবেই ভোটের ফল প্রকাশের পরই বিশ্লেষণ শুরু হয়ে গেছে তা নিয়ে। পর্যবেক্ষকদের মতে, একটা বিষয় স্পষ্ট, ২০০৯ বা ২০১১ সালে তৃণমূল যেমন কেবল তাদের ভোটেই জেতেনি, বরং বামেদের নেগেটিভ ভোট তাদের সুবিধা পাইয়ে দিয়েছিল। এ বারও হয়েছে তাই। বাংলায় গত লোকসভা ভোটে ১৭ শতাংশ ভোট পেয়েছিল বিজেপি। তার থেকে বিজেপি-র নিজস্ব ভোট এ বার কিছুটা বেড়েছে ঠিকই। কিন্তু তাঁদের প্রাপ্ত চল্লিশ শতাংশ ভোটের হয়তো অর্ধেকটাই বিজেপি-র পকেট ভোট নয়।

বাম ও কংগ্রেসের সিংহভাগ হিন্দুভোট যেমন গিয়েছে বিজেপি-র দিকে। তেমনই তৃণমূলের ভোটেরও একটা ছোট অংশ তা নেগেটিভ ভোট গিয়েছে গেরুয়া ঝুলিতে। যে ভোটকে স্থানীয় স্তরে প্রতিষ্ঠান বিরোধী ভোট বলছেন বিশেষজ্ঞরা। স্থানীয় ভাবে তৃণমূলের উপর অসন্তোষের কারণে তাদের যে ভোট চলে গেছে বিজেপি-তে। অর্থাৎ শুধু ধর্মীয় মেরুকরণই ভোটে হয়নি, প্রতিষ্ঠান বিরোধী ভোটের মেরুকরণও হয়েছে বিজেপি-র দিকে।

এখন প্রশ্ন হল, বাংলায় এই ভোট কি টিকিয়ে রাখতে পারবে বিজেপি? নিচু তলায় সংগঠন ছাড়া আদৌ কী সাফল্য পাওয়া সম্ভব। এবং এই প্রশ্ন সামনে রেখেই বস্তুত এখনও ক্ষমতা ধরে রাখার আশা দেখছেন তৃণমূল নেতৃত্ব। লোকসভার ফল ঘোষণার পর ঘরোয়া আলোচনায় তৃণমূলের একাধিক নেতা বলেন, লোকসভা ভোটে বালাকোট ছিল মোদীর। বাংলার ভোটে তা থাকবে না। সংগঠন ছাড়া ভোটও করাতে পারবে না বাংলায়।

তবে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে মুকুল রায় এ দিন বলেন, এটা ঠিক যে বুথ স্তরে বিজেপি-র সংগঠন দুর্বল। মানুষ ভোট দিয়ে জিতিয়ে দিয়েছে। তবে এ-ও বাস্তব যে বাংলায় বিরোধী ভোটের জমানা শেষ। আগামী দিনে সংগঠনও মজবুত করবে বিজেপি। আর তার ধাক্কায় শুধু তৃণমূল হারবে তা নয়, তৃণমূল পার্টিটাই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।

Comments are closed.