কমিশনের কাছে স্পেশাল অবজার্ভার ও পুলিশ অবজার্ভার চাইলেন মুকুল, পার্থ বললেন বাংলায় সব ভাল, ওরা দাঙ্গা বাধাতে চাইছে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: উনিশের ভোটে জাতীয় নির্বাচন কমিশন যাতে বাংলায় আরও কড়াকড়ি করে সে জন্য গত কয়েক মাস ধরেই নয়াদিল্লিতে নির্বাচন সদনে গিয়ে দৌত্য চালাচ্ছেন বিজেপি নেতা মুকুল রায়। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সুনীল অরোরার নেতৃত্বে বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চ ছিল শহরে। বিজেপি-র তরফে মুকুলবাবু এ দিন তাঁদের কাছে দাবি জানান, লোকসভা ভোটে বাংলায় স্পেশাল অবজার্ভার ও পুলিশ অবজার্ভার নিয়োগ করা হোক। পঞ্চায়েত ভোট ও গত লোকসভা ভোটের অভিজ্ঞতাই বলছে নইলে বাংলায় অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট করানো সম্ভব হবে না।

    বিজেপি-র সেই মত কমিশনের সামনেই খন্ডন করেন তৃণমূল নেতৃত্ব। বাংলায় শাসক দলের তরফে রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সী, মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায়, পরিষদীয় প্রতিমন্ত্রী তাপস রায় ও পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমকে কমিশনের ডাকা বৈঠকে পাঠিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সূত্রের খবর পার্থবাবু কমিশনের কর্তাদের বলেন, বাংলায় পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ। গণতান্ত্রিক পরিবেশ রয়েছে। কিন্তু ভোটের আগে বাংলায় দাঙ্গা বাধিয়ে সম্প্রীতির পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা হতে পারে। কমিশন যেন সে দিকে খেয়াল রাখে। এবং তা রুখতে সবরকম ব্যবস্থা নেয়। এ ছাড়াও কমিশনের কাছে একটি স্মারকলিপি পেশ করেছে তৃণমূল।

    পর্যবেক্ষকদের মতে, সর্বশেষ পঞ্চায়েত ভোট হয়েছে। তা যে মোটের উপর শান্তিপূর্ণ হয়নি তা স্পষ্ট দেখা গিয়েছে। ফলে লোকসভা ভোট সুষ্ঠু ভাবে করানোটা কমিশনের সামনেও চ্যালেঞ্জ।

    এখন প্রশ্ন হল, কেন দু’ধরনের অবজার্ভার চাইছে বিজেপি? তাঁদের কী কাজ হবে?

    মুকুলবাবু পরে বলেন, বাংলায় মুখ্য নির্বাচন অফিসারের কাজকর্ম সন্দেহের উর্ধ্বে নয়। অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট তিনি করাতে পারবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। সেই কারণেই অন্য রাজ্য থেকে এক জন সিনিয়র আইএএস অফিসারকে এনে স্পেশাল অবজার্ভার হিসাবে নিয়োগ করার দাবি জানানো হয়েছে। উনি মুখ্য নির্বাচন অফিসারের উপরে থাকবেন। মুখ্য নির্বাচন অফিসারের দফতর যাতে নিরপেক্ষ ভাবে কাজ করে তা উনি সুনিশ্চিত করবেন। তা ছাড়া সব জেলার অবজার্ভারদের জেলা শাসক, পুলিশ সুপার এবং রিটার্নিং অফিসারদের কাজে নজর রাখার অধিকার দিতে হবে।

    বিজেপি-র এই পোড় খাওয়া নেতা আরও জানান, এরই পাশাপাশি অন্য রাজ্য থেকে এক জন আইপিএস অফিসারকে এনে পুলিশ অবজার্ভার হিসাবে নিয়োগ করার দাবি জানানো হয়েছে কমিশনের ফুল বেঞ্চের কাছে। তিনি পুলিশের যাবতীয় ট্রান্সফার, পোস্টিংয়ের উপর নজর রাখবেন। বিশেষ করে ডিরেক্টর জেনারেল অব পুলিশ এবং অন্য পুলিশ কমিশনার ও অফিসাররা কী ভাবে ফোর্স ডিপ্লয়মেন্ট করছেন, কোনও ফাঁক থাকছে কিনা তার উপর নজর রাখবেন তিনি।

    এ দিনের বৈঠকে তৃণমূল, কংগ্রেস এবং চার বাম দলের প্রতিনিধিরাও ছিলেন। তৃণমূলের তরফে একটি চিঠি কমিশনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। অন্য বিরোধী দলগুলি মোটামুটি ভাবে আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন ইত্যাদি ব্যাপারে আবেদন জানিয়েছে। তবে দাবি দাওয়ার তালিকা হাতে এ দিনের বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল মুকুলবাবুর।

    বস্তুত নির্বাচন কমিশনের ব্যাপারটা মুকুল রায়ের গুলে খাওয়া। তৃণমূলে থাকার সময় থেকেই তিনি নিয়মিত কমিশনের দফতরে যাতায়াত করতেন। ভোটার তালিকায় কারচুপি বের করা, আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন, স্পর্শকাতর বুথ চিহ্নিত করা এবং সেই অনুযায়ী গুটি সাজানোয় বাংলার রাজনীতিতে তাঁর জুড়ি নেই। তার প্রমাণ অতীতে হাতেনাতে পেয়েছে তৃণমূলে। ইদানীং অনেকেই তাঁকে প্রয়াত সিপিএম রাজ্য সম্পাদক অনিল বিশ্বাসের শিষ্য বলে মন্তব্য করেন।

    এ দিন কমিশনের কাছে বিজেপি যে দাবি সনদ পেশ করেছে তা যে মুকুলবাবুরই সাজানো তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। বৈঠকের পর এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে মুকুলবাবু বলেন, কমিশনকে বলেছি ভোটার লিস্টে অনেক কারচুপি হয়েছে, অনেক গলদ রয়েছে সেগুলো দয়া করে বের করুন।

    তাঁর কথায়, স্পেশাল অবজার্ভার আগেও নিয়োগ হয়েছিল। ২০০৪ সালে কে জে রাওকে স্পেশাল অবজার্ভার হিসাবে নিয়োগ করেছিল কমিশন। ভোটের পর কে জে রাও কমিশনকে একটি রিপোর্ট দিয়ে বলেছিলেন, বাংলায় ভোট না হয়েছে অবাধ না হয়েছে সুষ্ঠু। দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, ২০০৪ সালে এনডিএ সরকারের পতন হয়। বামেরা ইউপিএ-র চালিকাশক্তি হয়ে যায়। ফলে রাওয়ের রিপোর্টের ভিত্তিতে আর পদক্ষেপ করেনি কমিশন। পরবর্তী কালে ২০০৯ এবং ১১ সালের ভোট সুষ্ঠু হয়েছে। কিন্তু ২০১৪ সালের লোকসভা ভোট থেকে যে কে সেই অবস্থা।

    বিজেপি এ দিন কমিশনে দাবি জানিয়েছে, ভোটের ৪৮ ঘন্টা আগে থেকে সংশ্লিষ্ট লোকসভা এলাকায় আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন করতে হবে। এবং তাদের শুধু দাঁড় করিয়ে রাখলেই চলবে না। মানুষের মধ্যে ভীতি কাটাতে হবে। কমিশনের উপর আস্থা তৈরি করতে হবে। তা ছাড়া ভোটের ৪৮ ঘন্টা আগে গোটা এলাকাকে এক প্রকার ‘সাইলেন্ট জোনে’ পরিণত করতে। কমিশনের অফিসারদের মুকুল রায় বলেন, সেটা কমিশন কী ভাবে করতে তাদেরই ঠিক করতে হবে। ১৪৪ ধারা জারি করে হোক বা অন্য ভাবে, ভোটের ৪৮ ঘন্টা আগে থেকে একসঙ্গে এক জায়গায় চার-পাঁচ জনের বেশি লোককে জড়ো হতে দেওয়া যাবে না।

    প্রসঙ্গত, বিরোধীদের অভিযোগ হল, ভোটের আগে থেকে শাসক দলের কর্মীরা বিরোধী দলের সমর্থক ও ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধমকায়। তাদের বুথ পর্যন্ত যেতে দেয় না। মূলত তারই বিহিত চাওয়া হয়েছে কমিশনের কাছে। তা ছাড়া বিরোধীদের এও বক্তব্য, কমিশন ভোটের আগের দিন থেকে আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন করলেও ওই বাহিনীর কম্যান্ডিং অথরিটি থাকে রাজ্যের পুলিশের কাছে। তারা ঠিক সময়ে ঠিক স্থানে বাহিনী পাঠায় না।

    গোটা দেশের মধ্যে এক মাত্র নির্বাচনী সন্ত্রাস এখনও বেঁচে রয়েছে। পঞ্চায়েত ভোটের সময় রাজনৈতিক হিংসায় প্রাণ গিয়েছে বহু মানুষের। এমনকী জীবন্ত পুড়িয়ে মারার অভিযোগ রয়েছে। গণনার সময় বুথে ঢুকে ব্যালট পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সেই সব রিপোর্ট ও ছবি এ দিন বিরোধীরা কমিশনের কর্তাদের কাছে পেশ করেছে। রাজনৈতিক সূত্রে বলা হচ্ছে, বিজেপি আগেই কমিশনের কাছে দাবি জানিয়ে রেখেছে যে বাংলায় অন্তত সাত দফায় ভোট হোক। যাতে প্রতিটা আসনে নির্বাচনে কমিশন সমস্তরকম ভাবে নজর রাখতে পারে এবং অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট সুনিশ্চিত করতে পারে।

    এ সব শুনে কমিশন এখন কী করে সেটাই দেখার।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More