বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ২৩
TheWall
TheWall

গুটখায় মিশছে রাজনীতি, ছোপ পড়ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

দ্য ওয়াল ব্যুরো: গুটখা-বিরোধী গর্জনে হঠাৎ করেই সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়াল ভরে উঠতে শুরু করেছে বৃহস্পতিবার সন্ধেবেলা থেকে। সঙ্গে একটি সরকারি নিষেধাজ্ঞা। গত ২৫ তারিখ একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে বলা হয়েছে, বাংলায় গুটখা ও তামাকজাত পানমশলা নিষিদ্ধ। আগামী ৭ নভেম্বর থেকে তা কার্যকর হবে বাংলায়।

এখন স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কি গুটখায় এর আগে নিষেধাজ্ঞা ছিল না? নতুন করে তা জারি করল বাংলার সরকার? তখন তৃণমূল সরকারের বয়স সবেমাত্র একবছর হয়েছে। ২০১৩ সালের মে মাসে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাংলায় নিষিদ্ধ হবে গুটখা। জারি হয়েছিল বিজ্ঞপ্তি। তাহলে এখন এত হইচই কেন? সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই নির্দেশিকার মেয়াদ একবছর। প্রতিবছর ওই মেয়াদ শেষের আগে ফের একবছরের জন্য নিষেধাজ্ঞার বিজ্ঞপ্তি জারি হয়।

পানমশলার সঙ্গে তামাক বা জর্দা মিশলে তবেই সেটা গুটখা হয়। ২০১২ সাল থেকেই সারা দেশের মতো বাংলাতেও পানমশলা আর তামাককে আলাদা করে দেওয়া হয়। ক্রেতারা ইচ্ছে করলে জর্দা নেন বা নেন না। অনেকেই বলছেন, এই নির্দেশিকায় নতুনত্ব কিছু নেই। তাহলে হঠাৎ এমন হইচই কেন? তাঁদের মতে, এর মধ্যে ভরপুর রাজনীতি রয়েছে।

গত বছর দেড়েক ধরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় বাঙালি জাতীয়বাদকে উস্কে দিতে বারবার করে গুটখার প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। শুধু তাই নয়। রাজ্যের একাধিক মন্ত্রীকে বিভিন্ন সময় বলতে শোনা গিয়েছে বিজেপি “গুটখাখোড়দের পার্টি।” মনে পড়ে, হালিশহর পুরসভার যে কাউন্সিলররা বিজেপিতে চলে গিয়েছিলেন, তাঁরা যেদিন তৃণমূলে ফিরলেন, সেদিন ফিরহাদ হাকিম কী বলেছিলেন? তাঁর বক্তব্য ছিল, “এঁরা বিজেপিতে গিয়ে ওই সংস্কৃতি মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। গুটখার গন্ধে গা গুলিয়ে উঠছিল। তাই আবার তৃণমূলে ফিরে এসেছেন।”

পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, গুটখা দিয়ে বিজেপিকে বোঝাতে চাওয়ার একটা প্রবণতা বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলির রয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, সেই বাঙালি সেন্টিমেন্টকে আরও একটু খুঁচিয়ে দিতেই সাম্প্রতিক হইচই। তবে অনেকে এও বলছেন, নেশা মাত্রই খারাপ। কিন্তু নির্দিষ্ট একটি নেশাকে রাজনৈতিক ভাবে দেগে দেওয়াও একধরনের প্রাদেশিক মনোভাব। তাঁদের অনেকেরই প্রশ্ন, যাঁরা গুটখা খান, তাঁরা সবাই বিজেপি? বা যাঁরা বিজেপি করেন, তাঁরা সবাই গুটখা খান? এটা কখনও হতে পারে?

মূলত গুটখা, খৈনি এই জাতীয় নেশার উৎপত্তি বাংলায় নয়। হিন্দিভাষী মানুষদের আধিক্য যেখানে, সেখানেই এই ধরনের নেশার প্রবণতা বেশি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বাঙালিদের মধ্যেও ঢুকে গিয়েছে। যদিও সরকারের বক্তব্য, রাজ্যের মানুষের স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করেই এই নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে এবং কঠোর ভাবে তা বলবৎ করা হবে।

এমনিতে গুটখার ক্ষতিকারক যে দিক, তা ভয়াবহ। মুখের ক্যানসার বৃদ্ধি তো আছেই। এর সঙ্গে গুটখার পিক যেখানে পড়ে, সেই জায়গাও ক্ষয়ে যায়। হাওড়া ব্রিজের পিলারের স্বাস্থ্য খারাপ হয়েছে এই কারণেই। দৃশ্যদূষণেও গুটখা সাংঘাতিক আকার নিয়েছে। সরকারি হাসপাতালের সিঁড়ির কোণ থেকে রেলস্টেশন-সর্বত্র তার ছাপ স্পষ্ট।

কিন্তু এসবের পরেও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, এটা শুধু বাঙালি জাতীয়তাবাদী সেন্টিমেন্ট ধরার কৌশল নয় তো? অনেকে এও প্রশ্ন তুলছেন, প্রতি বছরই তো নির্দেশিকা জারি হয়, কিন্তু কার্যকর হয় কই? তাঁদের মতে, বাংলায় এমন অনেক কেন্দ্র আছে, যেখানে অবাঙালি ভোট নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে সরকার কি এই নির্দেশিকাকে কঠোর ভাবে প্রয়োগ করার এত বড় ঝুঁকি নেবে? নাকি নির্দেশিকা জারি করে বাঙালি সেন্টিমেন্টকে জাগিয়ে রেখেই শুধু ক্ষান্ত থাকবে?

সব মিলিয়ে গুটখা নিষেধাজ্ঞার রুটিন বিজ্ঞপ্তি জারি হতেই একদিকে যেমন ‘বাঙালিত্বের হইচই’ শুরু হয়েছে, তেমনই উঠছে হাজারো প্রশ্ন। অনেকে আবার রসিকতা করে এও বলছেন, বাংলা বলেই সম্ভব। যেখানে গুটখাও রাজনীতির অংশ!

পড়ুন ‘দ্য ওয়াল’ পুজো ম্যাগাজিন ২০১৯–এ প্রকাশিত গল্প

Share.

Comments are closed.