বুধবার, জুন ২৬

এ ঘটনা প্রথম নয়, ডিএম ও তাঁর শ্বশুরবাড়ি নিয়ে ক্ষোভ ছিলই আলিপুরদুয়ারে

নিলয় দাস

ফালাকাটা: রবিবার রাতে ভাইরাল হয়েছে ভিডিও। গোটা রাজ্য তো বটেই, গোটা দেশের মানুষও দেখেছেন আলিপুরদুয়ারের জেলাশাসক নিখিল নির্মল এবং তাঁর স্ত্রী নন্দিনীর ‘তাণ্ডব’। ছি ছি পড়ে যায় সোশ্যাল মিডিয়ায়। দ্য ওয়াল-ই প্রথম প্রকাশ করেছিল থানার ভিতর ঢুকে এক যুবককে পেটাচ্ছেন সস্ত্রীক ডিএম। তোলপাড় পড়ে যায় রাজ্য প্রশাসনে। খানিকটা বাধ্য হয়েই জেলাশাসককে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠিয়ে দেয় নবান্ন।

কিন্তু এই কি প্রথম?

আলিপুরদুয়ারবাসী বলছেন, এই প্রথম সামনে এল ভিডিও। জেলাবাসীর একাংশের অভিযোগ, দিনের পর দিন প্রশাসনিক পদ ভাঙিয়ে ডিএম, তাঁর স্ত্রী, এমনকী তাঁর শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়রাও মৌরসিপাট্টা চালিয়েছেন গোটা জেলা জুড়ে। ফালাকাটার এক প্রবীণ নাগরিকের কথায়, ডিএম-এর শাশুড়িকেও এসকর্ট দিত পুলিশ।

অভিযোগ, পান থেকে চুন খসলেই জেলার বেশ কিছু সরকারি অফিসারকেও রীতিমতো ধমকাতেন ডিএম নিখিল নির্মল। এমনকী চাকরি খেয়ে নেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন বহুবার। এমনটাই অভিযোগ করেছেন, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অফিসারদের একাংশ। এখানেই শেষ নয়। দোকান-বাজারে ব্যবসায়ীদেরও একহাত নিতেন ডিএম-এর আত্মীয়রা। ব্যবসায়ীদের একাংশের অভিযোগ, জিনিসের দাম বেশি নেওয়া হচ্ছে এই অভিযোগ তুলে তাঁদের উদ্দেশে গালিগালাজও করতেন জেলাশাসকের শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়রা। ব্যবসায়ীদের কথায়, “ডিএম-এর আত্মীয়স্বজন। তাই আমরা ভয়ে মুখ খুলতাম না। যে কোনও সময় গ্রেফতার করার হুমকিও দিতেন ওঁরা।”

অভিযোগ, ডিএম-এর এক আত্মীয়া হাসপাতালের চিকিৎসক এবং এক নার্সের চাকরি কেড়ে নেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন। আলিপুরদুয়ার হাসপাতালের এক নার্সের কথায়, ওই জেলাশাসক এবং তাঁর আত্মীয়া যে ভাবে আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন তা মেনে নেওয়া যায় না। হাসপাতালের ওয়ার্ডে ডিএম-এর স্ত্রীকে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে বারণ করা হয়। এতেই চটে গিয়ে ডিএম-এর স্ত্রী এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ একজন নার্স ও চিকিৎসকের চাকরি কেড়ে নেওয়ার হুমকি দেন বলে অভিযোগ।

তবে এই সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জেলা শাসকের শ্বশুরবাড়ির লোকজন। তাঁদের কথায়, “জেলাশাসক হিসাবে নিখিলবাবু প্রশাসকের ভূমিকা পালন করেছেন মাত্র। অনেকে তা নিয়ে বাড়াবাড়ি করছেন। ডিএম বা আমরা কোনওদিন ক্ষমতার অপব্যবহার করিনি।” সরকারি গাড়ি বা নিরাপত্তারক্ষীও ব্যবহার করেননি বলে তাঁদের দাবি। কাউকে হুমকিও দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন তাঁরা। রবিবার যা ঘটেছে তা নিছকই রাগের মাথায় ঘটেছে বলে জানিয়েছেন, নিখিল নির্মলের শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়েরা। ওই ধরণের অশ্লীল মেসেজ কোনও মহিলাকে করা হলে কারও মাথা ঠিক থাকার কথা নয়। স্বার্থান্বেষীরা এখন নানান অভিযোগ ছড়াচ্ছেন।

মাথা ঠিক না থাকার যুক্তি ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন বনমন্ত্রী বিনয়কৃষ্ণ বর্মন। মন্ত্রীর কথায়, “এটা মধ্য যুগের রাজা বাদশার আমল নয়, তা বোঝা উচিত ছিল জেলাশাসকের। আইন কেউ নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন না।“

রাজ্যের দুই বিরোধী দলনেতা বামফ্রন্টের সূর্যকান্ত মিশ্র এবং বিজেপি-র রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন।

দিলীপ ঘোষের কথায়, “রাজ্যে মগের মুলুক চলছে। যে যার খুশি আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছেন। উপর থেকে নিচু তলা,  সর্বত্র একই অবস্থা। থানার ভিতর কীভাবে পুলিশের সামনে জেলাশাসক এবং তাঁর স্ত্রী পুলিশি হেফাজতে থাকা যুবককে মারধর ও হুমকি দিতে পারেন! দু’জনের শাস্তি হওয়া উচিত। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। এরপর তো যে কেউ থানায় ঢুকে এ ভাবে আসামিকে মারধর করতে পারে!” অন্য দিকে সূর্যবাবুর কথায়, “যে ভাবে জেলা শাসক ও তাঁর স্ত্রী ওই যুবককে মারধর করলেন, তা কোনও ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। দু’জনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।” ফেসবুকেও এই ঘটনার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সূর্যকান্ত মিশ্র।

কিন্তু কী বলছেন ডিএম-এর স্ত্রী নন্দিনী কৃষ্ণন?

রবিবার রাতে তো ফেসবুকে তিনি জোরালো ভাবে স্বামীর পাশে দাঁড়িয়েছেন। সোমবার বিকেলে, দ্য ওয়াল-এর তরফে ফের যোগাযোগ করার চেষ্টা হয়েছিল নন্দিনীর সঙ্গে। কিন্তু দ্য ওয়াল-এর নাম শুনেই ফোন কেটে দেন তিনি। তবে দ্য ওয়াল-কেই পিটুনি খাওয়া বিনোদ সরকারের বাবা রাজমোহন সরকার সোমবার জানিয়েছেন, কেন ছেলেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, সঠিক ভাবে কিছুই জানেন না তিনি। যা জেনেছেন,  সংবাদমাধ্যম থেকেই। তবে ডিএম এবং তাঁর স্ত্রীর কঠোর শাস্তির দাবি করেছেন রাজমোহন সরকার।

আলিপুরদুয়ার থাপ্পড় কাণ্ড

কী বললেন ডিএম-এর হাতে মার খাওয়া যুবকের বাবা রাজমোহন সরকার? দেখুন ভিডিও

The Wall এতে পোস্ট করেছেন সোমবার, 7 জানুয়ারি, 2019

Comments are closed.